রক্তমাখা নীল ভিডিও – অ‍াগের কথা

ফোনটা ফের নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। ওটা সাইলেন্ট মোডে রয়েছে। কোনও শব্দই অ‍ার ওর ভাল লাগছে না। সামান্য শব্দেই কেন ও এখন ভয়ে চমকে উঠছে?

মেয়েটি ভয়ার্ত চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ফোনটা অ‍াবার কাঁপতে থাকে ও তার অ‍ালো ছিটকে পড়ে অন্ধকার ঘরে। সেই অ‍ালো ওকে ভেতর থেকে হঠাৎ কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।

মৃত্যুভয়?

এত কাছ থেকে অ‍াগে তো কখনও মৃত্যুকে দেখেনি। এতটা নগ্নভাবে। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু এমন এলোমেলো হয়ে গেল। কী করে হল?

ফিনফিনে, হাঁটু অবধি ঝুলে থাকা ওর রাতপোশাকের ওপর ফের ফোনের অ‍ালো এসে পড়ে। ফের ফোনটা বাজছে।

দেওয়ালের ছায়া বলে দিয়ে যায়, মেয়েটির শারীরিক গঠন ছিপছিপে, লম্বা, সুগঠিত। অন্ধকারে ওর মুখ দেখা যায় না।

কম পুরুষের মাথা তো খারাপ হয়ে যেতে দেখেনি ও, এই তেইশ বছরের জীবনে। এখনও অনেকটা জীবন পড়ে থাকার কথা। কিন্তু তা অ‍ার থাকবে কি?

অ‍াপাতত ও পালিয়ে এসে লুকিয়ে রয়েছে একটি গোপন অ‍াস্তানায়।

কিন্তু কতদিন?

মেয়েটি ঠিক করেই রেখেছিল, কোনও কাস্টমারের ফোন এলে ও ধরবে না। সে যত বড় পয়সা‍ওলা বান্দাই হোক।

কিন্তু এই ফোনটা তো কোনও কাস্টমারের নয়।

একটা অদ্ভুতুড়ে ফোন, যেখানে স্ক্রিনের ওপর লেখা রয়েছে – নাথিং, সেটা ধরা কি ঠিক হবে?

বিশেষ করে এমন একটা দিনে, যখন কিনা ওর যমজ বোন, দেড় মিনিটের ছোট, রাহি খুন হয়ে গেছে অ‍াজকেই ভোরবেলায়, নিউ টাউনে, ওদের সদ্য কেনা ফ্ল্যাটে। এতক্ষণে ওখানে সবাই নিশ্চয়ই জেনে গেছে।

অথচ অ‍াজ, সেই ভোরবেলায়, যখন সবে অ‍ালো ফুটছে, ও তখন ছিল দিল্লিতে। ৬৩-তলার ওপর একটি বিশাল ফ্ল্যাটের মাস্টার বেডরুমে দেওয়াল জোড়া জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের ছড়িয়ে থাকা পুরোন দিল্লি শহরটাকে দেখছিল খুব অন্যমনস্কভাবে। চোদ্দজন শুতে পারে, এমন একটি মস্ত বিছানার এককোণে লটকে, গুটিশুটি মেরে শুয়ে অ‍াছে মনোজ টিক্কা। ওর বাবা এম পি, কোন একটি দপ্তরের মন্ত্রীও।

ওর অজস্র গুণমুগ্ধের ভেতর একজন এই মনোজ। একেবারেই ক্যাবলা ছেলে। প্রথমদিন দেখেই বুঝতে পেরেছিল ও বধ হয়ে গেছে।

মনোজের জন্য অন্তত মাসে একবার ওকে দিল্লি ঘুরে যেতে হয়। বিজনেস ক্লাসের টিকিট মনোজই পাঠায়। ভাল মুর্গী।

এখন মনোজ বায়না ধরেছে এবার দিল্লিতেই থেকে যেতে হবে। দুবাইতে ও ফ্ল্যাট পর্যন্ত কিনে ফেলেছে। বিয়ের পর ওখানেই ও থাকবে। ব্যবসা চালাবে ওখান থেকে।

কাল ওর পা পর্যন্ত ধরেছিল মনোজ। মাল খেয়ে চুর হয়ে যখন মনোজ কাঁদতে শুরু করল, ও তখন ঠিক মা যেমন সন্তানকে ঘুম পাড়ায়, ঠিক সেভাবে মনোজের মাথাটাকে কোলে টেনে নিয়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মনোজ তলিয়ে গেছিল ঘুমের অতলে।

সেই সময়েও, সেই কাকডাকা ভোরে একইভাবে এই ফোনটা বেজেছিল। নিঃশব্দে। চেনা ফোন। পিটার ফোন করছে কলকাতা থেকে।

ও ফিসফিস করে বলেছিল, বলো। কী হয়েছে?

পিটারের গলা ছিল ভয়ার্ত। খুব তাড়াতাড়ি ‍ও বলেছিল, দিদি, অ‍ামাদের খুব বিপদ। রাহিকে কেউ খুন করে দিয়ে গেছে। অ‍ামি এইমাত্র ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখলাম। তুমি, তুমি, দাঁড়াও একটা পায়ের অ‍াওয়াজ পাচ্ছি।

কয়েক সেকেন্ড পরেই পিটার খুব তাড়াহুড়ো করে বলেছিল, তুমি কোথাও পালিয়ে যাও। নইলে গ্রাস তোমাকেও মেরে দেবে।

অ‍ার কিছু জিজ্ঞেস করার অ‍াগেই পিটার ফোন কেটে দিয়েছিল।

ওর মনে হয়েছিল, বিপদের মধ্যে রয়েছে পিটারও। তারপর ‍ও যতবার পিটারের ফোনে ট্রাই করেছে, তা ভয়েস মেলে ঢুকে গেছে। তারপর একটা সময় অ‍ার তাও কাজ করেনি।

খুব স্বাভাবিকভাবে রাহির ফোনও কাজ করছিল না।

এক ঝটকায় রাহেলা বুঝে গিয়েছিল এসবের জন্য দায়ী গতকালের ভিডিও। সিক্রেট ভিডিও, যেটা করার ব্যাপারে অ‍াগাগোড়া অ‍াপত্তি জানিয়েছিল ও।

কিন্তু ওর বোন রাহি অ‍ার পিটার এত পীড়াপিড়ি করল যে ও অ‍ার না বলতে পারেনি। টাকাটা সত্যি মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতই ছিল। কারণ ও যা চেয়েছিল তা যে পাওয়া যাবে, তা ও নিজেও ভাবতে পারেনি।

কিন্তু রাহি অ‍ার নেই?

ওর শিরদাঁড়া বেয়ে হিমস্রোত নেমে অ‍াসে।

ঠিক সেই মুহূর্তে রাহেলা বুঝতে পারে ঠিক কতটা একা ও। একটা মানুষের নামও মনে পড়ছে না যাকে ও সবকথা বলতে পারে।

মনোজকে বলবে?

নাঃ।

ওই হাফ মাতাল ওকে দিল্লি থেকে অ‍ার বেরতেই দেবে না। তাছাড়া গ্রাসকে ও এভাবে ছেড়ে দিতে পারে না। কলকাতায় ওকে ফিরতেই হবে।

এখনই।

সবার অ‍াগে মাথাটাকে ঠাণ্ডা রাখা দরকার।

পিটারের ফোনের কথা মনোজকে ও কিচ্ছু বলেনি। বলেছিল, বোন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, ওকে এখনই কলকাতায় ফিরতে হবে।

এসব শুনে মনোজের মুখ ভার হয়ে গেলেও প্রভাব খাটিয়ে ভিঅ‍াইপি কোটায় প্লেনের টিকিট বুক করে দিয়েছিল। বলেছিল, টাকার দরকার হলে বলো।

টাকা? টাকা ছাড়া এরা কি অ‍ার কিছু বোঝে না?

কলকাতা ফিরে ঢুকে পড়েছিল ওর গোপন ডেরায়। তিলজলায় এই ডেরার কথা কেউ জানে না, রাহি অ‍ার পিটার ছাড়া। কিন্তু এখানে অ‍াসার পর মনে হল, একটা ভুল বোধহয় করে ফেলেছে ও। যারা রাহিকে মেরেছে, তারা যদি টর্চার করে এই ডেরার কথাও জেনে নেয়? অ‍ার পিটার? পিটারের কী হল? ও কেন ফোন ধরছে না অ‍ার?

ফের ফোনটা কাঁপতে শুরু করল। স্ক্রিনে লেখা – নাথিং।

খুব পয়সা‍‍ওলা ক্লায়েন্টদের যখন ফোন অ‍াসে, তখন ও দেখেছে তাতে নাম থাকে না। লেখা থাকে – প্রাইভেট।

কিন্তু – নাথিং?

মনে মনে নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধের পর, কাঁপা কাঁপা হাতে ‍ও ফোনটা ধরল অবশেষে। ঠিক যেভাবে বানের জলে ভেসে যাওয়ার অ‍াগে মানুষ খড়কুটো অ‍াঁকড়ে ধরে।

হ্যালো বলতে গিয়ে ওর গলা ফের কেঁপে গেল।

উল্টোদিক থেকে ভেসে এল একটি যান্ত্রিক গলা, কাইন্ডলি ফোনটা কাটবেন না। যা বলছি, মন দিয়ে শুনুন। এখনই এই জায়গা ছেড়ে অ‍াপনাকে পালাতে হবে। ওরা অ‍াপনার লোকেশন ট্র্যাক করে ফেলেছে। ওরা এখন অ‍াছে রবীন্দ্রসদন এক্সাইডের কাছে। অ‍াপনার হাতে অ‍াছে ঠিক মিনিট দশেক। ওরা অ‍াপনার বোনকে, পিটারকে অ‍ার গ্রাসকে মেরে দিয়েছে। এখন অ‍াপনি ওদের একমাত্র লেজিটিমেট টার্গেট। মন দিয়ে শুনুন, এখনই বেরিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরুন। চলে অ‍াসুন চায়না টাউনের হোটেল ডে-নাইটে। অ‍ামি সেখানে থাকব।

রাহেলা কিছু একটা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু উল্টোদিকের যান্ত্রিক পুরুষ কণ্ঠ ওকে থামিয়ে দিল, কথা বলার জন্যই অ‍াপনাকে ডাকছি। তখন যা বলার বলবেন। এখন অ‍ার কথা নয়। বেরিয়ে পড়ুন। ফোনটাকে এখানেই ছেড়ে যান। অ‍াবার বলছি, ফোন এখানে ফেলে যান। ফোন থাকলেই ওরা অ‍াপনাকে রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করে ওই হোটেলেও চলে অ‍াসবে। কুইক। অ‍ার দেরি নয়। এরপর অ‍াপনাকে অ‍ার অ‍ামি বাঁচাতে পারব না। এটাই লাস্ট চান্স।

ফোন কেটে গেল।

অবাক বিষ্ময়ে নিজের ফোনটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল রাহেলা। এতগুলো খুন। পরপর হয়েছে অ‍াজ? কে করাচ্ছে? জ্যাকি সেন? এমনকী গ্রাসকেও? কিন্তু ও তো জ্যাকিরই ডানহাত। তাহলে? সব গুলিয়ে গেছিল ওর।

লাফিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল রাহেলা। একটানে রাতপোশাক খুলে ফেলল। নগ্ন অবস্থায় দৌড়ে গেল অ‍ালমারির দিকে। পোশাক নিয়ে ভাবার সময় নেই। হোটেল ডে-নাইট।

হাতে অ‍াছে দশ মিনিট।

একটু থমকাল। এটা অ‍াবার নতুন কোনও ট্র্যাপ নয়তো?

এক মুহূর্ত ভেবে অ‍ালমারির কোণ থেকে ছুরিটা বের করে ব্যাগে ঢোকাতে গিয়ে দেখল ফের ফোনটা কাঁপছে।

সেই – নাথিং – লেখাটা ভাসছে স্ক্রিনের ওপর।

ফোনটা ধরতেই উল্টোদিকের গলা ঠাণ্ডা গলায় বলল, ছুরি রেখে দিন। ওটা অ‍াপনাকে বাঁচাতে পারবে না। বেরিয়ে পড়ুন। কুইক।

ফোন কেটে গেল।

এক সেকেণ্ডের জন্য ফোনটার দিকে একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল রাহেলা।

মনে হল, কেউ একটা ভেতরে বসে অ‍াছে। তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে।

রাহেলা দামী অ‍াই-ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল বিছানার ওপর। জীবনে যে অনুভূতির কথা ও বিলকুল ভুলে গেছে, সেই লজ্জা এক নিমেষের জন্য ওকে মনে করিয়ে দিল ও একটা মেয়ে। উল্টোদিকের লোকটা কি জাদুকর? ম্যাজিক জানে? এই প্রথম ওর মনে হল, লোকটা ওকে সত্যি বোধহয় হেল্প করতে চাইছে।

কিন্তু কেন?

#বিক্রমদার_গোয়েন্দাগিরি