রক্তমাখা নীল ভিডিও – চ্যাপ্টার ওয়ান

খুব জোরে ব্রেক কষে বাইকটা থামাল পিটার। মাথা ঝাঁকিয়ে যতগুলো খিস্তি জানে সেগুলো সব এক-এক করে যার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করল, সে ততক্ষণে রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিটারের দিকে তাকিয়ে করুণ কণ্ঠে ডেকে উঠেছে, মিয়াও।

পিটার হাঁকল হেঁড়ে গলায়, ভাগ শালা, রাস্তা কাটার অ‍ার সময় পেলি না। হারামজাদা, শুয়ার।

বেড়ালটা পিটারের রাগকে একটুও ভ্রূক্ষেপ না করে লেজটাকে ওপরে সোজা তুলে পতাকার মত করে তুলে, নাড়িয়ে, একলাফে উঠে গেল কাছের একটি পাঁচিলে। ওখানে বসে বসে থাবা চাটতে থাকল।

পিটার সংস্কারবশত শূন্যে একবার অ‍াঙুল দিয়ে ক্রসচিহ্ন অ‍াঁকল, থুতু ফেলল, এবং নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল অন্তত একটি গাড়ি অ‍াসার জন্য যে কিনা সব অ‍াসন্ন অমঙ্গলকে প্রতিহত করে দিয়ে যাবে।

একটা ট্যাক্সি এল উল্টোদিক থেকে। ঝড়ের বেগে চলেও গেল।

পিটারের মধ্যে নড়ার লক্ষণ দেখা গেল না। ও তখন পকেট থাবড়াতে ব্যস্ত।

মোবাইলটা কোথায় গেল?

হঠাৎ মনে হল, মোবাইলটা তো পিঠের ব্যাগে অ‍াছে। টাকার বাণ্ডিলের তলায়। প্রথমে টাকায় হাত দিতে পেরে ও বেশ সুখ পেল। একসঙ্গে ৩০ লাখ টাকা, একটা রাতের জন্য। অ‍াগে পাঁচ পেয়েছে। এখন পঁচিশ। সব হাজারের বাণ্ডিল। তবে কাজটায় রিস্ক ছিল বিরাট। মোবাইল বের করে পিটার রাহির নাম্বার টিপল।

রাহি ফোনটা এর অ‍াগের বারেও ধরেনি। কিন্তু রাহির ঘুম তো খুব পাতলা।

কোনও কাস্টমারের সঙ্গে থাকলেও রাহি সবসময় পিটারের ফোন ধরে।

এই ব্যাপারে পিটারের মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব কাজ করে। সত্যি তো, রাহি না থাকলে অ‍াজ ও কোথায় পড়ে থাকত।

নাঃ, ফোনটা বেজেই যাচ্ছে।

বাবা, এত ঘুমিয়ে পড়ল? নিজের মনেই বিড়বিড় করে পিটার ফের বাইক চালু করল। গ্রাসের ওখান থেকে মিনিট দশেক অ‍াগে বেরিয়ে‍ ও প্রথম ফোনটা করেছিল রাহিকেই। ও ফোন ধরেনি।

পিটার খেয়াল করল না, মাথার ওপর অ‍াকাশে মেঘ জমছে। গতকালের সন্ধে বা রাতের খবর দেখা হয়নি। দেখলে পিটার জানত এখন দুদিন কলকাতায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হবে। অ‍াকাশ থাকবে মেঘলা।

গতরাতে পিটার পাহারায় ব্যস্ত ছিল হোটেল ট্যামারিন্ডের বাইরের রিসেপশনে। ভেতরের একটি দামী স্যুইটে তখন হাফ-বুড়ো জ্যাকি সেনের সঙ্গে ডাক্তার-নার্স খেলতে ব্যস্ত রাহি ও রাহেলা, দুই যমজ বোন। ওদের অ‍াসল কাজটা ছিল অবশ্য অন্য।

বাইকের স্পিড বাড়িয়ে দিল পিটার।

রাহি কেন ফোন ধরছে না? হঠাৎ ওর মনে কেমন কু ডাকল। রাহির শরীর খারাপ হয়নি তো?

গতরাতে ট্যামারিন্ডে যখন জ্যাকি পুরো বেহেড মাতাল হয়ে গেছে, তখন রাহিকে সেখানে রেখে রাহেলা চলে গেছিল এয়ারপোর্টে। ও দিল্লির ফ্লাইট ধরবে। পিটারই ক্যাব বুক করে দিয়েছিল।

যাওয়ার সময় রাহেলা বলেছিল, রাহিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে তবে যাবি। দ্যাখ, ভেতরে যা, বুড়োটাকে এবার বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি পাঠা। চুলে কলপ করলেই তো অ‍ার কচি পাঁঠা হওয়া যায় না।

রাহেলার কথাবার্তা এমনই কাঠ কাঠ।

পিটার হাত তুলে বলেছিল, তুমি চিন্তা করো না দিদি, ম্যায় হুঁ না।

রাহেলা হেসে মাথা ঝাঁকিয়েছিল, ঠিক অ‍াছে। চললাম। ওর খেয়াল রাখিস।

মানে, রাহির খেয়াল রাখিস। যমজ বোনের ব্যাপারে খুবই দুর্বল রাহেলা। সেটা পিটার জানে।

কবে ফিরবে তুমি? পিটার জিজ্ঞেস করেছিল ঠিক বাড়ির লোকের মত।

রাহেলা ক্যাবের কাঁচ তুলতে তুলতে বলেছিল, দেখি ক্যাবলাটা অ‍াবার কী বলে।

রাহেলা চলে যাওয়ার পর হোটেলের রিসেপশনে সোফায় বসে কিছুক্ষণ মিনিস্টারের ছেলে মনোজ টিক্কার কথা ভেবেছিল পিটার। শাঁসালো খদ্দের। হাত ঝাড়লেই টাকা ঝরে। বাবা মন্ত্রী।

সরকারের টাকা চুরি করে ফাঁক করে দিচ্ছে, অ‍ার ছেলে ক্ষেপে উঠেছে রাহেলাকে বিয়ে করবে বলে। দুবাইতে ফ্ল্যাট কিনে ফেলেছে পর্যন্ত। কিন্তু রাহেলা রাজি হচ্ছে না কেন?

এই লাইনে কম মেয়ে নিয়ে তো কারবার করল না পিটার। কিন্তু রাহেলাকে একেবারেই ও চিনতে পারে না। পাগল করা রূপ অ‍ার অসম্ভব বুদ্ধি নিয়ে এই মেয়েটা যেন সব হিসেবনিকেষের বাইরে।

একমাত্র বোন রাহি ছাড়া পৃথিবীর অ‍ার কোনও কিছুর প্রতি ওর মায়া, দয়া, মোহ, ভালবাসা অ‍াছে বলে মনে হয় না।

এসব গতরাতের কিস্যা। এখন ভোরবেলায় অন্য নখড়া। রাহির দুটো ফোনই বেজে যাচ্ছে কেন?

নাঃ, চিন্তা হচ্ছে তো মেয়েটার জন্য।

পিটার ফের অ্যাকসিলারেটর ঘোরাল। খুব বিপজ্জনকভাবে একটা চার মাথার মোড় পেরলো। তারপর কী ভেবে স্পিড কমাল পিটার।

বলা যায় না, রাস্তার মোড়ে অন্ধকারে মামারা ঘাপটি মেরে থাকে। ফট করে ওকে যদি ধরে ফেলে, এতগুলো টাকা সব যাবে। এছাড়া কোমরের পেছনে মেসিন রয়েছে। ওটা পিটার কখনও কাছছাড়া করে না। ওর অনেক শত্রু।

যদিও সোনাগাছির লোকাল পুলিশের সঙ্গে ওর ভাল দোস্তি অ‍াছে, কিন্তু সে তো অ‍ার নিউ টাউনে চলবে না।

রাহি অ‍ার রাহেলা বহুদিন হল সোনাগাছি ছেড়ে দিয়েছে। দুই বোনই দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছে। ফরফরিয়ে ইংরেজি বলে। মাঝেমাঝেই ক্লায়েন্টের সঙ্গে বিদেশে চলে যায়। দুই বোন যেসব বিষয়ে কথা বলে, সেসবও পিটারের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

ওদের কাছেই শুনেছে, সুইঙ্গার ক্লাব নাকি বিদেশের লেটেস্ট ক্রেজ। সেখানে একসঙ্গে কুড়ি, তিরিশটা দম্পতি যে যার সঙ্গে পারে, যা তা করে।

পৃথিবীটা কি রসাতলে চলে যাচ্ছে?

যাক না শালা, ওর কী?

নিউ টাউনের যে সোসাইটিতে ওরা ফ্ল্যাট কিনেছে, সেখানে কেউ কারও খোঁজ রাখে না।

পিটার শুনেছে ওখানে নাকি অনেক ফিল্ম স্টারও থাকে যাদের কেউ পোঁছেও না। কে কার খবর রাখে?

পিটার দুই বোনের বডিগার্ড কাম সেক্রেটারি।

সে অ‍াজ অনেকদিন হয়ে গেল।

গল্পটি ভালো লাগছে? পরের পর্ব পড়ুন:

পরবর্তী পর্ব: রক্তমাখা নীল ভিডিও - চ্যাপ্টার টু →