রক্তমাখা নীল ভিডিও – চ্যাপ্টার থ্রি

দিনের এটা খুব অ‍াশ্চর্য সময়। বাইরে অ‍ালো ফুটব ফুটব করেও ফোটেনি।

এতক্ষণে পিটারের চোখ গেল অ‍াকাশের দিকে।

ওরে ব্বাস, এত মেঘ। বৃষ্টি নামবে নাকি?

লিফটের জন্য ওয়েট করা পোষাল না পিটারের। ও লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যখন চার তলায় রাহিদের ফ্ল্যাটের সামনে এল, ততক্ষণে ও হাঁফিয়ে গেছে।

ফ্ল্যাটের দরজা অ‍াধ-খোলা।

দমবন্ধ হয়ে গেল পিটারের। এতজোরে বুকের ভেতর অ‍াওয়াজ হচ্ছে যে মনে হচ্ছে কেউ শুনতে পাবে।
দরজা খোলা কেন?

ও কি নীচে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ড ডেকে নিয়ে অ‍াসবে?

কী ভেবে চিন্তাটা বাতিল করে দিল পিটার।

দরজার বাইরে থেকে একবার ডাকল, রাহি।

অ‍ারেকবার ডাকল।

সাড়া নেই।

পিটার ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখল। লবি ফাঁকা। যারা সকালে হাঁটতে যায়, তারা অ‍াগেই বেরিয়ে গেছে।

দরজা অ‍ালতো করে ঠেলে ঢোকার অ‍াগে কোমরের পেছনে গোঁজা অটোমেটিক রিভলবারটা শক্ত মুঠোয় ধরল পিটার। রাহির যদি কেউ কোনও ক্ষতি করে, তাহলে পৃথিবী ওলোটপালোট করে দেবে ও।

রাহিকে নিয়ে ওর অনেক স্বপ্ন। সেগুলো যদি কেউ ব্যর্থ করে দেবে বলে ভেবে থাকে, তাহলে সে পিটারকে চেনে না।

অ‍ালতো ঠেলায় দরজা খুলে যেতেই গড়িয়ে অ‍াসা রক্তের দাগ চোখ টেনে নিল পিটারের। থমকে দাঁড়িয়ে গেল পিটার।

অ‍াধো অন্ধকারে চোখটাকে সেট করে নেওয়া দরকার। ওর মন বলছে কেউ যেন এখনও ভেতরে অ‍াছে।
দেওয়ালের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে চুপ করে যাবতীয় শব্দ নিজের শরীরে শুষে নিল পিটার।

অনেক দূরে একটা গাড়ি সমানে হর্ন দিচ্ছে। এছাড়া অ‍ার কোনও অ‍াওয়াজ নেই।
নিঃশব্দে দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে, পিঠ ঘষতে ঘষতে খুব ধীরে ধীরে রাহির বেডরুমের দিকে এগলো পিটার।

বেডরুমের দরজা খোলা।

রাহি যে মাটিতে পড়ে অ‍াছে, তা দূর থেকেই দেখতে পেল পিটার। ওখান থেকেই রক্ত গড়াচ্ছে। রাহির পড়ে থাকার ধরন বলে দিচ্ছে ওর শরীরে প্রাণ নেই।

কম লাশ দেখেনি পিটার। ও মৃতদেহ চেনে। দূর থেকে মৃত্যুর গন্ধ পায়।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়েই ভেতরে ঢুকে এল পিটার। ওর শরীর শক্ত হয়ে গেছে, মাথা কাজ করছে না।

এই ঘরটায় অ‍ালো বেশি। ফাঁকা ঘর। পিটার দেওয়াল ঘেঁষেই রাহির মাথার কাছাকাছি এল। কোঁকড়া চুল পিঠের ওপর ছড়ানো।

অ‍ার ঠিক তখনই ওর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে উঠল।

মেঝেতে এটা কী লিখেছে রাহি?

মেঝেতে যেন ও কিছু একটা লিখতে চেয়েছিল ও?

প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার অ‍াগে নিজের রক্ত দিয়ে মেঝেতে যে নামটা লিখেছে রাহি, তার কাছ থেকেই তো একটু অ‍াগে পঁচিশ লাখ ক্যাশ গুনে নিয়ে এসেছে পিটার।

তাহলে গ্রাসের মনে এই ছিল?

এদের দুই বোনকে ব্যবহার করে খতম করে দেওয়া? ভাগ্যিস রাহেলা গত রাতেই দিল্লি চলে গেছিল, নইলে তো দুই বোনের লাশ পাশাপাশি এখানে পড়ে থাকত।

এত জোরে দাঁতে দাঁত চাপল পিটার যে মনে হল ওর চোয়াল গুঁড়িয়ে যাবে। ‍

ওর স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে গ্রাস।

ও অ‍াসার অ‍াগেই লোক পাঠিয়ে দিয়েছে দুজনকে মেরে দেওয়ার জন্য। ও কি ভেবেছে, পিটার টাকা পেয়ে সব ভুলে যাবে? খুব ভুল ভেবেছে গ্রাস। পিটার কি সোনাগাছিতে চুরি করে অ‍ানা বাচ্চা মেয়ে? যা খুশি করবে।

পিটারের বুকের ভেতরটা ওলোটপালোট খেতে লাগল।

রাহির সঙ্গে কাটানো সেইসব অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো কেউ যেন প্রোজেক্টরে ওর চোখের সামনে চালিয়ে দিয়েছে।

রাহি বলত, অ‍ার কয়েকটা বছর। তারপর দুজন ঘর বাঁধব। এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাব। তবে তার অ‍াগে অনেক টাকা জমিয়ে ফেলতে হবে। অ‍ার নয়, এসব অনেক হয়েছে।

পিটার বলত, দিদিকে সঙ্গে নেবে না?

রাহি কাচের চুড়ি ভাঙার মত হাসত, তুই শালা রাহেলাকে অ‍ামার থেকেও বেশি ভালবাসিস।

পিটার বলত, না, না, ও অন্যরকম। তুমি বুঝবে না।

রাহি হো হো করে হেসে উঠে ওর মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলত, এই তুই এত সিরিয়াস হোস না। একদম যায় না তোর সঙ্গে। মজা করছিলাম। ও অ‍ামাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।

কে কোথায় যায়, কে খোঁজ রাখে?

রাহি যে এভাবে চলে যাবে, তা কি কেউ ভেবেছিল?

সবাই ওকে মাথামোটা বলে। কিন্তু জীবনের সবথেকে স্মার্ট সিদ্ধান্তটা ও গতসন্ধ্যাতেই নিয়েছিল। জ্যাকি সেন হোটেলে পা রাখা মাত্রই ও বলেছিল, স্যার অ‍ামার নম্বরটা রাখুন, যে কোনও দরকারে কল করবেন।

জ্যাকি তখন অল্প চড়িয়েই ছিল, মৌতাত জমে উঠছে। টুসকি মেরে সিগারের ছাই হোটেলের লবিতেই ফেলে ওর মোবাইলে একটা মিসড কল দিয়ে বলেছিল, সেভ করে রাখো। নইলে তো বুঝবে না কে ফোন করছে।

পিটার জ্যাকিকে ফোন করল।

ফোনটা বাজছে। বাজতে বাজতে একবার কেটে গেল।

পিটার অ‍াবার রিং করল।

এবার জ্যাকির হেঁড়ে গলা ভেসে এল, ঘুমজড়ানো গলায় জ্যাকি বলল, কী হয়েছে?

পিটার কোনও ভণিতা না করে হেডলাইনটা পেশ করল, স্যার, গতরাতে লুকিয়ে অ‍াপনার ভিডিও তোলা হয়েছে। ওই দুটো মেয়ের পোশাকে বডি ক্যাম ছিল। ক্যামেরা এখন‍ও রয়েছে গ্রাসের কাছে। ও অ‍াপনাকে ব্ল্যাকমেল করবে।

জ্যাকি হেঁকে জিজ্ঞেস করল, তুই এতসব জানলি কী করে?

পিটার বলল, অ‍ামাকে এই কাজের জন্য তিরিশ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মেয়ে দুটোর একটাকে গ্রাস লোক লাগিয়ে খুন করেছে। অ‍ামি স্পট থেকেই অ‍াপনাকে ফোন করছি। অ‍াপনি এখনই গ্রাসকে ধরুন। নইলে দেরি হয়ে যাবে।

জ্যাকি চিন্তিত গলায় বলল, বুঝব কী করে তুই যে মিথ্যা কথা বলছিস না।

পিটার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, গ্রাস অ‍ামার সঙ্গে বিট্রে করেছে। অ‍ামি যাকে ভালবাসতাম তার লাশ অ‍ামার পায়ের কাছে পড়ে অ‍াছে। অ‍ামি মিথ্যা কথা বলব এই সাত সকালে?

জ্যাকি বলল, এটা তোর নম্বর তো? ঠিক অ‍াছে, অ‍ামি দেখছি। তুই রাখ।

জ্যাকি ফোন কেটে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিটার রাহেলাকে ধরল দিল্লিতে।

একবার রিং হতেই রাহেলার ঠাণ্ডা গলা ভেসে এল, বলো। কী হয়েছে?

পিটারের গলা ছিল ভয়ার্ত। খুব তাড়াতাড়ি ‍ও বলেছিল, দিদি, অ‍ামাদের খুব বিপদ। রাহিকে কেউ খুন করে দিয়ে গেছে। অ‍ামি এইমাত্র ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখলাম। তুমি, তুমি, দাঁড়াও একটা পায়ের অ‍াওয়াজ পাচ্ছি।

কয়েক সেকেন্ড পরেই পিটার খুব তাড়াহুড়ো করে বলেছিল, তুমি কোথাও পালিয়ে যাও। নইলে গ্রাস তোমাকেও মেরে দেবে।

অ‍ার কিছু জিজ্ঞেস করার অ‍াগেই পিটার ফোন কেটে দিয়েছিল। কারণ ও সত্যিই বাইরে একটা পায়ের অ‍াওয়াজ পেয়েছে।

দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়েই ও বেডরুমের দরজার দিকে এগল, দরজাটা বন্ধ করা দরকার সবার অ‍াগে।
দরজাট বন্ধ করার জন্য পিটার যখন ঘুরেছে, ঠিক তখনই বাথরুমের দরজা খুলে একটি ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসে সাইলেন্সার লাগানো লম্বা পিস্তলের নল তাক করল পিটারের পিঠের দিকে।

এসব ক্ষেত্রে মুহূর্তের ভুলচুকে অনেক হিসেব নিকেষ উল্টে যায়।

অ‍াততায়ী গুলি যখন চালাল, ততক্ষণে পিটার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ওকে দেখেই মাথা নামিয়েছে।
গুলিটা পিটারের ডানকাঁধ ঘেঁষে দরজায় লাগল।

পিটারের অটোমেটিক গর্জে উঠল। অ‍াততায়ী জানত না পিটার ঠিক কতটা ভাল বন্দুকবাজ।
ফলে তিনটে গুলি পেটে হজম করে ছেলেটা হাঁটুভেঙে পড়ে গেল মেঝেতে।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দ্বিতীয় অ‍াততায়ী। মাথামুখ গামছা দিয়ে মোড়া থাকলেও পিটারের চিনতে ভুল হল না গ্রাসের দলের ছেলেকে। এর নাম শ্যামল। শার্প শুটার।

পিটার তিন লাফে পৌঁছে গেল শ্যামলের কাছে। কিন্তু তার অ‍াগেই শ্যামলের তিনটে বুলেট পিটারকে ফুঁড়ে দিয়েছে।

সেই অবস্থাতেই পিটার ধরে ফেলল শ্যামলকে। ঠিক যেভাবে সিংহ কামড়ে ধরে শিকারের গলা, সেভাবেই ও কামড়ে ছিঁড়ে নিল শ্যামলের গলার নলি। প্রায় একইসঙ্গে ওর শরীরের সমস্ত রাগ

বেরিয়ে গেল ওর প্রাণের সঙ্গে।

পিটার অ‍াছড়ে পড়ল রাহির ওপর, জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল ওকে শেষবারের মত।

ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল চারটে লাশ। বাইরের লবিতে ততক্ষণে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে।

বারবার গুলির অ‍াওয়াজে কেঁপে কেঁপে উঠেছে সোসাইটির থার্ড ফ্লোর।

ঘনঘন ফোন যাচ্ছিল নীচের সিকিউরিটি ডেস্কে।

কলকাতায় এই ধরনের শুট অ‍াউট খুব নিয়মিত হয় না। ফলে ঠিক অ‍াধ ঘণ্টার মধ্যে জায়গাটা পুলিশ অ‍ার মিডিয়ার ক্যামেরায় ছয়লাপ হয়ে গেল।

ভোরবেলায় রক্তে রাঙা কলকাতা – শুরু হয়ে গেল লাইভ টেলিকাস্ট। সারাদিনের ভূরিভোজ।