রবিবার, সকাল ৭.৩২, কলকাতা
জায়গাটার চেহারাটা এখন সব মিলিয়ে বেশ সকরুণ। ভয়ার্ত।
অনেকটা ভ্যান গখের সেই চিৎকার করার ছবিটার মত।
ছেলেগুলো গুলি চালিয়ে সব ঘুলিয়ে দেওয়ার পর থেকেই গত পনেরো মিনিট ধরে সমানে বৃষ্টি চলছে। যেন আকাশ ফুটো হয়ে গেছে। রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে। ধুয়ে যাচ্ছে গ্রাসের এতদিনের রক্তাক্ত অত্যাচারের ইতিহাস।
কালো মেঘের দল এসে শহরের রোদ ঝলমলে সকালটাকে যেন ছোঁ মেরে নিয়ে গেছে অার তার বদলে দিয়ে গেছে দমবন্ধ করা, চারদিকে ছড়িয়ে পড়া এক গুমোট অন্ধকার, আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা হাওয়া।
বৃষ্টির ধরনধারণ দেখে মনে হচ্ছে, এই বদখত আবহাওয়া আপাতত কিছুদিন এই তিনশো বছরের বিবর্ণ শহরে আস্তানা গাড়তে এসেছে।
কিছুক্ষণ অাগেই সোনাগাছিতে ঢোকার মুখের পেট্রল পাম্পে তেল ভরার ছলে গাড়ি থামিয়েছে মুস্তাফা।
মুস্তাফার মুখে দাড়ি, চোখেমুখে একটা সুপ্রিম কম্যান্ডারের ভাব। বয়সের ভারে এখন আর সে খুব একটা ফিল্ডে নামে না।
কিন্তু জ্যাকি সেনের রিকোয়েস্ট ফেলা মুশকিল, তাই আজ দলবল নিয়ে নিজেই এসেছে।
কুড়ি মিনিটের মধ্যেই ঠিক স্পটে পৌঁছে গেছে সে।
কিন্তু এসে বুঝল, তাও বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
রাস্তার মাঝখানে পড়ে থাকা ডেডবডিটা ঘিরে রাস্তার লোকের ভিড়। অদ্ভুত ব্যাপার! ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, কারো মাথায় ছাতা নেই, রেইনকোট নেই, তবু লোকগুলোর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে কীসের এত আনন্দ?
একটা লোক মরে গেছে চোখে গুলি খেয়ে, একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেল, কত লোকের চোখের দরকার। অথচ এই লোকগুলোর কোনও বিকার নেই?
ভিড় করে ঘিরে রেখেছে লাশটাকে।
যেন কোনও তামাশা দেখতে এসেছে তারা।
মুস্তাফা একবার উঁকি মেরে দেখেই বুঝে গেল পরিস্থিতি সুবিধের নয়। ওর অাগেই কেউ পৌঁছে গেছে এবং মালটাকে সাবাড় করে দিয়ে চলে গেছে।
বৃষ্টির জলে গ্রাসের রক্ত ধুয়ে নর্দমায় মিশছে। গ্রাসের সাঙ্গপাঙ্গরা এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে।
যেন এক-একটা মাথা কাটা মুরগি। হঠৎ লিডার চলে গেলে দলের অবস্থা এমনই হয়।
একজন চেঁচিয়ে বলল, পুলিশে খবর দিয়েছিস?
আরেকজন উত্তর দিল, বড়বাবু আসছেন। কেউ বডিতে হাত দিবি না। শুনে মনে হলো যেন কোনো ধর্মগুরুর বাণী শোনাল ও।
পাবলিক যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে বুকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে পচা গ্যাংস্টারটার লাশ ! এবার শুধু প্রার্থনা করার পালা।
অবশ্য পাড়ার ভদ্রলোকেরা, যাদের বাড়ির দেওয়ালে – এটি গৃহস্থ বাড়ি – লেখা রয়েছে, তারা এখনও ঘুমোচ্ছে।
একে রবিবার, তায় এই অঝোর বৃষ্টি।
এমন ওয়েদারে ঘুমটাও জাঁকিয়ে বসে।
যে কোনও মুহূর্তে পুলিশের সাইরেন শোনা যাবে। এখানে বেশিক্ষণ থাকা সেফ নয়। মুস্তাফা ফিরে এসে ড্রাইভারকে ইশারা করল গাড়ি এগিয়ে নেওয়ার জন্য। গ্রাসের লাশ কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার কোনো অর্ডার তার ওপর নেই।
কিন্তু জ্যাকিকে কী জবাব দেবে? চিন্তাটা মুস্তফার মাথায় শকুনের মত চক্কর কাটতে লাগল।
আসার পথেই সে তার তিনজন স্পেশাল লোককে গ্রাসের বাড়িতে পাঠিয়েছিল।
তারা ফুল পুলিশ ইউনিফর্মে গেছে রেড করতে।
আমরা ওর ল্যাপটপ, ফোন সব পেয়ে গেছি বস। একটু আগেই একজন ফোন করে জানাল।
যাক, অন্তত খালি হাতে ফিরতে হবে না।
খবরটা শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল মুস্তাফা।
জ্যাকির নম্বরে ডায়াল করল সে।
ইয়েস, মুস্তাফা। ওপাশ থেকে জ্যাকির খিটখিটে গলা ভেসে এল। গ্রাস ইজ ডেড স্যার। খতম।
হোয়াট? জ্যাকি তার বিরক্তি আর আতঙ্ক লুকোতে পারল না।
সে কিছুটা কনফিউজডও বটে।
কে মারল? পুলিশ? জ্যাকির মাথায় সঙ্গে সঙ্গে নতুন টিকটিকি মতিলাল মিস্ত্রির মুখটা ভেসে উঠল। লোকটা কিন্তু এভাবেই হুটপাট মেরে দেয়। একটা ওয়ার্নিং পর্যন্ত দেয় না।
মুস্তাফা বলল, না স্যার। মনে হয় আমাদের আসার কয়েক মিনিট আগেই কাজটা হয়েছে। দুটো ছেলে এসেছিল। একজন বাইকে স্টার্ট দিয়ে বসেছিল। অারেকজন নেমে গুলি চালিয়েছে। কেউ একজন নিশ্চয়ই জানত আমরা আসছি।
কিন্তু তারা কারা? কারা হতে পারে মুস্তাফা? এনি আইডিয়া? জ্যাকির গলায় স্পষ্ট টেনশন।
মুস্তাফার গলাতেও চিন্তার সুর ধরা পড়ল, কে কন্ট্রাক্টটা নিয়েছিল আমি খুঁজে বের করব স্যার। তবে আমার একটা ডাউট হচ্ছে।
কী?
আমার মনে হয় আপনার ফোন কেউ ট্যাপ করছে স্যার। প্লিজ চেক ইট ফার্স্ট।
জ্যাকি কোনও উত্তর দিল না। এই চিন্তাটা তার মাথাতেও আগে এসেছে। মুস্তাফা বলল, আমরা ওকে না পেলেও ওর ল্যাপটপ, পেন ড্রাইভ, মোবাইল সবই পেয়েছি। ফিরে আসছি।
জ্যাকি শুধু বলল, ওকে।
ঠিক তখন কলকাতা থেকে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার দূরে, ইয়েলাগিরির এক নির্জন পাহাড়ে, গুহার মত লুকোন ওয়্যারহাউসে বসে সেই মোটা যুবকটি ছোট ছোট পিটপিটে চোখ নিয়ে ওদের কথোপকথন মন দিয়ে শুনছিল।
ওদের কথা শুনে তার কুৎসিত মুখে একটা ক্রুড হাসি খেলে গেল। ওরা ল্যাপটপটা পেয়েছে। বেশ তো, ওটা নিয়েই এখন খেলাধুলো করুক। মারামারি করুক। খুললে দেখবে ওটা পুরো ব্ল্যাঙ্ক। আমার কোনো ট্রেস ওরা পাবে না। হ্যাঁ, ওই ব্ল্যাঙ্ক মেশিনে অামার গন্ধ পেতে পারে এই বিশ্বের দু-একজন, কিন্তু তারা কেউ এ দেশে থাকে না।
ডায়ানার ল্যাপটপে ঢোকার জন্য ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড টাইপ করতে করতে সে নিজের মনেই কথা বলছিল। এটা ওর পুরোন অভ্যাস। যারা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে অাঠারো, ঊনিশ ঘণ্টা কম্পিউটারে কাটায়, এটা তাদের অনেকেরই অভ্যাস।
স্যামি ভাবল, কলকাতার ব্যাপারটা পরে দেখা যাবে। অাপাতত ওটা ভালই সামলানো গেছে।
আপাতত মুম্বাই পাজলটা সলভ করতে হবে। ওটা বেশি আরজেন্ট। আজ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করাটা তোমার একদম উচিত হবে না, মিস ডায়ানা।
সে বিড়বিড় করে ক্যালকুলেট করছিল, ওকে মারতে ঠিক কতটা সময় লাগবে। ডায়ানাই একমাত্র সাক্ষী যে তার আসল মুখটা দেখেছে।
এত সুন্দর একটা মুখ! ও কি কখনও ভুলতে পারে? স্যামি নিজের মনেই হাসছে।
হাসিটা আরও ভয়ংকর করে তুলেছে তার মুখের কাটা দাগটাকে।
এমন নয় ও হাঁদার মত সরাসরি গিয়ে ঢুকে পড়েছে ডায়ানার চেম্বারে।
ঢোকার আগে সে চেক করে নিয়েছিল কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কি না। ভাগ্যিস ছিল না। থাকলে আবার সেই ফুটেজ ডিলিট করার ঝক্কি পোহাতে হতো এখন। কিছুটা সময় বেঁচে গেছে এর ফলে।
কিন্তু স্যামি ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে ওই প্রস্থেটিক মেকআপ আর্টিস্ট নিজেই স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে গিয়ে সব উগরে দিতে চাইবে।
এমনিতেও হয়ত ডায়ানাকে মারতেই হত। কিন্তু তার জন্য এত তাড়াহুড়োর দরকার ছিল না।
মুম্বাইয়ের মর্নিং ফ্লাইটের টিকিট বুক করতে করতে স্যামি বলল, এটা তোমার জীবনের সবথেকে জঘন্য ভুল, মিস ডায়ানা। অারও কিছুদিন থাকতে পারতে এই বিশ্রী, স্বার্থপর প্ল্যানেটে, যেখানে কেউ কাউকে ভালবাসে না। তোমার নিজের দোষেই তোমাকে মরতে হচ্ছে।
সরব মেহতার নাম অার ব্যবহার করা যাবে না। সম্পূর্ণ অন্য একটা অন্য নামে মুম্বাইয়ের টিকিটটা বুক করল স্যামি।
তারপরেই লাফিয়ে উঠল। হাতে বিশেষ সময় নেই।
এয়ারপোর্টে যেতে হবে। তারপর, মুম্বাইয়ে গিয়েও কয়েকটা কাজ রয়েছে। দেখা গেল, মোটাসোটা চেহারার তুলনায় স্যামি যথেষ্ট ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস।
