রবিবার, সকাল ৬.২৫, কলকাতা
জ্যাকি সেন কাজপাগল লোক।
ওর ফেবারিট স্লোগান হল, হাত থাকতে মুখ কেন?
জ্যাকির চেহারায় একটা কলোনিয়াল হ্যাংওভার আছে। সেই ব্রিটিশ আমলের বাঙালি সাহেবদের মতো দেখতে। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন, নোয়াপাতি ভুঁড়ি।
চুলে টকটকে লাল রঙের কলপ, কখনও সখনও সেটা কালো হয় ওর মুড বুঝে।
ঠোঁটের ওপর একজোড়া খোঁচা গোঁফ সমান করে ছাঁটা।
নিজের সার্কেলে ও ফেমাস একটা কারণেই, প্রয়োজনে যে কোনো ড্রাস্টিক স্টেপ নিতে ও দুবার ভাবে না। ওর একটাই মোটো, হোয়াটেভার ইট টেকস।
যে কোনও মূল্যে কাজ হওয়া চাই।
পিটারের ফোনটা পাওয়ার পর জ্যাকি লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠল। যাক, অাজকের মত একটা কাজ পাওয়া গেছে।
সারাটাদিন ব্যস্ত না থাকলে সন্ধ্যার মৌতাত ঠিক জমে না।
বেডরুমের জানলা দিয়ে জ্যাকি বাইরে তাকাল, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, মেঘলা অাকাশ। বেশ রোম্যান্টিক ওয়েদার। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ কালকের যমজ মেয়েদুটোর কথা ভাবা যেত।
তা নয়, শালা, যত রুখু ঝঞ্জাট।
গতরাত থেকেই ওর সিক্সথ সেন্স জানান দিচ্ছিল, কোথাও একটা বড়সড় গোলমাল পেকেছে।
এই সিক্সথ সেন্সই ওকে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হিসেবে এত কম সময়ে এত ওপরে তুলেছে। ওর মেন ইন্ডাস্ট্রিটা অবশ্য ওপেন সিক্রেট – মেয়েমানুষ ও মাদক পাচার। বাইরে দেখানোর জন্য রয়েছে মিডিয়া, সফটওয়্যার, স্টিল – এই সমস্ত।
শাসক দলের নেতা মন্ত্রীদের সঙ্গে ওঠাবসা করার খাতিরে ও বেশ কয়েকজনকে ওর পকেটে পুরে ফেলেছে।
জ্যাকি বিশ্বাস করে যে সবাই ঘুষ খায়। কেউ কেউ অবশ্য সতীপনা দেখায় শুরুতে। কিন্তু একটা অ্যামাউন্টের ওপরে উঠলেই তারাও তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে বিক্রি হয়ে যায়।
গতরাতে মনের ভেতরটা কেমন খচখচ করছিল। সেটার অবশ্য কারণও ছিল।
রুটিন অনুযায়ী, মেয়ে পাঠানোর আগে গ্রাস ওকে একটা কনফার্মেশন কল করে। কাল কিন্তু করেনি।
এমনকি ঘণ্টা খানেক পর সব মিটে গেলে যে ‘কার্টেসি কল’ করার কথা, সেটাও আসেনি।
ঘড়ির দিকে তাকাল জ্যাকি। প্রায় সাড়ে ছটা বাজে।
আজ অাবার রবিবার। এই সময়টা ও গলফ ক্লাবে কাটায়। শহরের সব প্রভাবশালী লোক, মন্ত্রী-সান্ত্রীরা ওখানে আসে। নেটওয়ার্কিং করার এটাই সেরা জায়গা। কিন্তু আজ গলফ, নেটওয়ার্কিং, সব মাথায় উঠল।
সামনেই ইলেকশন। এমপি হওয়ার দৌড়ে জ্যাকি বেশ এগিয়ে। টিকিট প্রায় কনফার্ম।
এই মুহূর্তে ওর পলিটিক্যাল ক্যারিয়ারের বারোটা বাজার উপক্রম। ওই মেয়েগুলোর বডিগার্ড ছেলেটা, পিটার, ও যা বলল তা যদি সত্যি হয়, তাহলে এমপি হওয়া তো দূর-অস্ত, এই দেশেই অার থাকা যাবে না।
হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল জ্যাকির। রাগ আর টেনশনে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সবার আগে এই প্রবলেমটা ফিক্স করতে হবে। আর শুরুটা করতে হবে অবশ্যই গ্রাসকে দিয়ে।
এতবড় নেমকহারাম? গ্রাসের গরাস চিরকালই বড়। দৈত্যের গ্রাস।
কিন্তু ওকে তো কম টাকা দেয় না জ্যাকি। এখন তো অারও বেড়েছে।
অাগে যেসব কচি মেয়েরা পাচার হয়ে অাসত, তারা প্রথম ভোগে লাগত জ্যাকির। তারপর প্রসাদ পেত গ্রাস। তারও পর অাছে। কিছু মেয়ে থাকে যারা এরপরেও লাইনে নামতে চায় না। এমনকী দশজনকে দিয়ে পরপর রেপ করালেও নয়।
এখন এনজিওগুলো খুব অ্যাকটিভ। তার ওপর চিফ ডিটেকটিভ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে একটা গোঁয়ার অাইপিএস – মতিলাল মিস্ত্রি। ট্রিগার হ্যাপি কপ।
জ্যাকির সঙ্গে ওর অলরেডি ঠোকাঠুকি লেগে গেছে। ওর অ্যাসিট্যান্ট রাকেশ চৌধুরিকে তবু বাবা-বাছা বলে ছাড় পাওয়া যায়। কিন্তু মতিলাল মারাত্মক টেঁটিয়া।
ফলে কোনওকিছুই অার অাগের মত নেই। অনেক জায়গায় টাকা ছড়াতে হচ্ছে, যাতে যে কোনও রেডের অাগেই খবরটা চলে অাসে।
এমনিতেই দেখেশুনে পা ফেলতে হচ্ছে। তার মধ্যে এইসব রুখু ঝামেলা।
প্রাইভেট নম্বর থেকে ফোনটা লাগাল জ্যাকি। ওপার থেকে একটা ভরাট, ব্যারিটোন গলা ভেসে এল, ইয়েস স্যার।
জ্যাকি কোনো ভনিতা করল না, মুস্তাফা, কোথায় তুমি?
মুস্তাফা শান্ত গলায় বলল, কলকাতাতেই আছি বস। তবে আজ রাতে দুবাই বেরোব।
জ্যাকি সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল বুক চিরে, প্ল্যান ক্যান্সেল করো। একটা সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে। তোমার হেল্প দরকার।
বলুন স্যার, কী করতে হবে?
জ্যাকি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, একটা আইটেম তুলতে হবে। ইমিডিয়েটলি।
ডেড অর অ্যালাইভ?
মুস্তাফার গলায় কোনো আবেগ নেই, যেন পানের দোকানে জর্দা পানের অর্ডার দিচ্ছে।
জ্যাকির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল রাগে, অ্যালাইভ। জ্যান্ত চাই হারামজাদাকে। ওর চামড়া আমি নিজের হাতে ছাড়াব।
জ্যাকির বলার ধরন দেখে এতদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী মুস্তাফা বুঝে গেল কেস খুবই কিচাইন হয়ে অাছে।
ও শান্ত গলায় বলল, নাম, ছবি আর অ্যাড্রেসটা পাঠিয়ে দিন স্যার। আমার টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট এখুনি সব ডিটেলস পাঠাচ্ছে তোমাকে।
চিন্তা করবেন না স্যার। ও যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, পাতাল থেকেও খুঁজে বের করব।
জ্যাকি বলল, রাগে কাঁপতে কাঁপতেই বলল, হারামজাদার নাম গ্রাস। সোনাগাছি এরিয়াতে থাকে।
ওকে স্যার। চিন্তা করবেন না।
ফোনটা রেখে জ্যাকি উঠে দাঁড়াল। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে, গ্রাস শেষমেশ ওর সঙ্গেই বেইমানি করল?
উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভালো, তাই বলে বসের পিঠে ছুরি? লুকিয়ে ভিডিও তুলে ও ভেবেছিল জ্যাকি সেনকে ব্ল্যাকমেল করবে? কতবড় সাহস?
এত বছরের সম্পর্ক। ক্রাইম সিন্ডিকেটের হিউম্যান ট্রাফিকিং সেল-এর পুরো দায়িত্বটাই গ্রাসের ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে ছেড়ে দিয়েছে জ্যাকি। নেপাল, বিহার বর্ডার দিয়ে মেয়ে সাপ্লাই দেয় ও। এমনকী ইস্ট ইউরোপ থেকেও মাল আসছে আজকাল। এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল র্যাকেট। আর গ্রাস ভেবেছে ওকে ব্ল্যাকমেল করে এক্সট্রা পয়সা কামাবে?
ঘরের ভেতর অস্থিরভাবে পায়চারি করতে শুরু করল ও। জ্যাকির মাথায় নানা ধরনের চিন্তা খেলে বেড়াচ্ছে।
শুধু টাকার জন্য গ্রাস এটা করেছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো বড় খেলা আছে?
হয়ত জ্যাকি জানে না, ওর অজান্তে ওর রাজনৈতিক শত্রুরা গ্রাসকে কিনে নেয়নি তো?
এই চিন্তাটা মাথায় আসতেই শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এমপি হওয়ার স্বপ্নটা কি তাহলে চোখের সামনে চুরমার হয়ে যাবে?
দেরি না করে ফিলিপকে ফোন লাগাল জ্যাকি। ফিলিপ ওর টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। বাধ্য ছেলে, কম্পিউটার সায়েন্সে মাস্টার্স করে এসেছে অামেরিকার ক্যাল টেক থেকে।
বেশ কয়েক বছর হল, সিস্টেম ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে ফিলিপ।
ওর একটা ভাল গুণ হল, যখনই ফোন করা হয়, ও ফোন ধরে চটপট একটা কথাই বলে, ইয়েস স্যার।
জ্যাকি বলল, ফিলিপ, কনফিডেন্সিয়াল ফাইলের কথা মনে আছে? ইয়েস স্যার। আমি ওটার জন্য একটা সেপারেট ডেটাবেস মেইনটেইন করছি। সব অ্যালফাবেটিকালি সর্ট করা আছে… উল্টোদিকে ফিলিপ যখন ওর কাজের ফিরিস্তি দিতে ব্যস্ত, জ্যাকি ধমকে উঠল, ডোন্ট ইউজ দোজ ব্লাডি টেকনিক্যাল ওয়ার্ডস! কতবার বলেছি ওসব অাজেবাজে কথা আমাকে শোনাবে না। আমি ইম্প্রেসড নই। একটা নাম নোট করো, গ্রাস। ওর নাড়ি-নক্ষত্রের সব ডিটেলস এক্ষুনি মুস্তাফাকে পাঠাও। রাইট নাও।
শিওর স্যার। উইদাউট এনি ডিলে।
ফিলিপ আর কোনো জ্ঞান দেওয়ার আগেই জ্যাকি ফোন কেটে দিল। মাথাটা দপদপ করছে। একটু ভোদকা খেলে হত।
হঠাৎ আবার মোবাইলটা বেজে উঠল। মুস্তাফা।
গট ইট? জ্যাকি অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
স্যার, আমার লোকাল সোর্স কনফার্ম করেছে। ও এখন বাড়িতেই আছে। সাতটা নাগাদ অফিসের দিকে বেরোবে। আমরা তুলে নেব। এক ঘণ্টার মধ্যে আপনার কাছে পৌঁছে যাব। কিন্তু স্যার, অারকটা খবর অাছে – জানি না এই ঘটনাটার সঙ্গে কোনও কানেকশন অাছে কি না।
জ্যাকির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, অাবার নতুন কি ফ্যাকড়া বেরল?
দমবন্ধ করে জ্যাকি বলল, কী বলো তো?
মুস্তাফা বলল, নিউ টাউনের একটা ফ্ল্যাটে গুলি চলেছে। গ্রাসের ছেলেরাই ইনভলবড, যতদূর খবর পেলাম। ইনার ক্ল্যাশও হতে পারে। চারটে ডেডবডি রিকভার করেছে পুলিশ।
জ্যাকি উত্তেজনা চেপে বলল, খোঁজ নিয়ে দেখো তো, ওদের মধ্যে পিটার নামে কোনও ছেলে অাছে কি না?
মুস্তাফা বলল, খোঁজ পেলেই অাপনাকে জানাচ্ছি স্যার।
জ্যাকি একটু ভাবল। তারপর বলল, ভাল কথা, গ্রাসকে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ওর মোবাইল, ল্যাপটপ সব চাই। ওর ল্যাপটপটা বিশেষ করে। ওটা সম্ভবত বাড়িতেই থাকবে।
মুস্তাফা সঙ্গে সঙ্গে বলল, ওকে স্যার। আমি সেকেন্ড টিম পাঠাচ্ছি। ওরা পুলিশ সেজে ওর বাড়ি রেড করবে। যা কিছু ডিজিটাল গ্যাজেট আছে, সব কনফিসকেট করে নিয়ে আসবে।
গুড মুস্তাফা। কাজটা হলে তোমার রিওয়ার্ড তুমি পেয়ে যাবে।
থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।
ফোনটা কাটার অাগে শেষ নির্দেশ দিল জ্যাকি, শুয়োরটাকে সোজা আমার ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে নিয়ে এসো।
ডোন্ট ওরি স্যার। এক ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে যাবে।
ফোনটা পকেটে রেখে জ্যাকি দ্রুত অঙ্ক কষতে শুরু করল। পিটারের কথা যদি সত্যি হয়, গতরাতের শেষে ও গ্রাসের হাতেই মেটেরিয়াল হ্যান্ড ওভার করেছে। তার মানে, ওই ভিডিও ফুটেজ এখনও গ্রাসের কাছেই থাকার কথা।
জ্যাকি জানলার দিকে তাকাল। বাইরে আকাশ মেঘলা। ওয়েদার অারও খারাপ হবে কিনা, জানা নেই।
ভিডিওটা জ্যাকিকে পেতেই হবে।
যে কোনও মূল্যে।
