রক্তমাখা নীল ভিডিও – চ্যাপ্টার ফাইভ

রবিবার, সকাল ৬.৩০, ইয়েলাগিরি


সকাল থেকেই মেঘলা। শুরু হয়েছে ঝিরঝির বৃষ্টি।

চারদিকে পাহাড়। সবুজ গাছে ঢাকা। ওইসব গাছপালার ফাঁকেই বেশ কিছু সৌখিন বাড়িঘর রয়েছে। যেগুলো চট করে চোখে পড়ে না। বাড়িঘরের মালিকেরা এখানে ছুটি কাটাতে অ‍াসেন বটে তবে বেশিদিন থাকতে পারেন না। এখানকার অসহ্য নিস্তব্ধতা কি বুকের ওপর চাপ হয়ে বসে? হয়ত তাই।

শহর চেন্নাই থেকে প্রায় অ‍াড়াইশো কিলোমিটার দূরে এই ইয়েলাগিরি ঠিক ট্যুরিস্ট স্পট নয়। শোনা যায় এই জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের বুকে লুকিয়ে অ‍াছে কিছু প্রাগৈতিহাসিক গুহা। সেখানে মাঝেমাঝে কারা অ‍াগুন জ্বলে? কেউ কি থাকে সেখানে?

ফলে জায়গাটা হিল স্টেশন হলেও ট্যুরিস্টরা সচরাচর এই দিকটায় পা মাড়ায় না। যদিও ট্যুরিস্টরা অ‍াসবে এমন ধরে নিয়েই উল্টোদিকেই নেচার পার্ক বানানো হয়েছিল, কাছেই রয়েছে একটা ঝর্না। ইয়েলাগিরি হিলস এখান থেকে আরও কুড়ি কিলোমিটার।

এরকম নির্জন জায়গাতেই গাছপালার অ‍াড়ালে ঢাকা পড়ে অ‍াছে এই পোড়ো গোডাউন বা ওয়ারহাউসটা। কোথায় যেন প্রাচীন গুহার সঙ্গে মিল অ‍াছে না?

বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না একতলার নীচেও রয়েছে একটি হলঘরের মত বিরাট বেসমেন্ট। সেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে কম্পিউটারের সার্ভার। মাঝেমাঝে অ‍ালোর ঝিলিক জানান দিয়ে যাচ্ছে যে সেগুলো চলছে। কিলবিলে সাপের মত জড়িয়ে পেঁচিয়ে রয়েছে অজস্র তার, যা কি না অ‍াসলে তৈরি করেছে ভারচুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের একটি জটিল লেয়ার। 

সাদা বাংলায় বলতে গেলে কেউ যদি এই জায়গাটার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পেতে চায়, তাহলে তাকে গোলকধাঁধার ভেতর পড়ে যেতে হবে।

এক কথায়, এই জায়গাটাকে ট্রেস করা কার্যত অসম্ভব। একেবারেই কি অসম্ভব? হয়ত নয়। তবে সারা পৃথিবীতে একটি বা দুটি লোক হয়ত তা করলেও করে উঠতে পারে। কিন্তু তাতেও হয়ত বেশ সময় লেগে যাবে।

ভেতরের একটি ঘরে ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব নিচু স্কেলে একটা ইংরেজি গান বাজছে—ইটস রিডিউসড দ্য ডিসট্যান্স… ইন আ রিভার্স ওয়ে…

ঘরে বসে থাকা মোটা সোটা চেহারা যুবকটির অবশ্য বাইরের উদাসীন নিসর্গ বা গান নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তার চোখ সামনে সাজানো বেশ কয়েকটি মনিটরের দিকে। কি বোর্ডে তার অ‍াঙুল তখন ঝড় তুলেছে।

ঘরে পা রাখলেই বোঝা যায়, এটা একটা অন্য জগত।

কম্পিউটার, জটিল সব প্রোগ্রামিং কোড আর অদ্ভুত দর্শন সব ইলেকট্রনিক গ্যাজেট দিয়ে ঠাসা এই ডিজিটাল গুহা।

তারই মধ্যে ঘরভর্তি মনিটরের মাঝখানে যে বসে আছে, সে কি কোনও হাই-টেক যুদ্ধের চিফ কম্যান্ডার? দেখলে তেমনই মনে হতে পারে।

প্রতিটি স্ক্রিনের মুভমেন্ট তার নখদর্পণে। 

যুবকটির চিবুকে একটা গভীর কাটা দাগ। সেই দাগটা ওর মুখে একধরনের নিষ্ঠুরতা যোগ করেছে বলেই নয়, এমনিতেও ওর থমথমে মুখ দেখলে মনে হয়, ও শেষ হেসেছে বোধহয় ওর মায়ের কোলে।

কোনও কমনীয়তা না থাকায় হঠাৎ দেখলে মুখটা মোটেই ভাল লাগে না। সেটার অ‍ারও একটা কারণ রয়েছে। ওর চোখের দৃষ্টিতে কোনও প্রাণ নেই। চোখের দৃষ্টিতে অ‍াবেগের ছাপ না থাকলে কি মানুষকে মানুষ বলে মনে হয়?

যুবকটির বয়স বোঝা খুব মুস্কিল। 

পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের কোঠায় হতে পারে। অথবা একটু কমও হতে পারে?

প্রথমে সে ব্যাকগ্রাইন্ডের মিউজিক বন্ধ করে হেডফোন লাগাল কানে। কিছু একটা শোনার পরেই হঠাৎ রেগে গিয়ে হেডফোনটা টেবিলে আছড়ে ফেলল। এই একটা অ‍াচরণে বোঝা গেল, এইসব দামী জিনিসপত্রের প্রতি ওর বিশেষ মায়াদয়া নেই। 

এও বোঝা গেল যে এমন কিছু একটা তার কানে গেছে যা তাকে মোটেই খুশি করেনি। 

কি-বোর্ডের ওপর তখন ঝড়ের বেগে চলছে তার মোটা মোটা আঙুলগুলো। 

দেখতে দেখতে চোখের পলকে একটা ট্রানজাকশন কমপ্লিট হয়ে গেল, কিন্তু একটা বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করতে করতে সে বিড়বিড় করে বলে উঠল – শিট। অ‍ায়্যাম এ ড্রাই চিকেনস শিট। ফালতু ফালতু এসব লোককে পোষার কোনও মানে হয় না। এরা কোনও কম্মের নয়।

তার নিজের ওপর এত রাগের অ‍াসল কারণটা কী?

একটু পরেই কারণটা বোঝা গেল।

এরপর সে কম্পিউটার থেকেই একটা এনক্রিপ্টেড লাইন ব্যবহার করে ডায়াল করল সোজা কলকাতা। 

ওপার থেকে একটা খসখসে নির্লিপ্ত গলা ভেসে এল, ইয়েস। 

যুবকটি হিসহিস করে উঠল, কেলেঙ্কারি হয়েছে। এখনই লোক পাঠাও।  হাতে একেবারেই সময় নেই। গ্রাসকে এখনই খতম করতে হবে। ডোন্ট ডিলে। হাতে কিন্তু একদম সময় নেই। 

কেন? কী হয়েছে বস? উল্টো দিকের গলা কিছুটা ভয়ার্ত শোনায়। 

জ্যাকি সব জেনে গেছে। ও গ্রাসকে তোলার জন্য অলরেডি নিজের লোক নামিয়ে দিয়েছে। ওরা পৌঁছনোর আগেই আমাদের কাজ শেষ করতে হবে। তাড়াতাড়ি তোমার লোক পাঠাও। 

ওকে স্যামি। পাঠিয়ে দিচ্ছি। এটাতো অ‍ামাদের প্ল্যান বি-তে ছিলই। লোক রেডি অ‍াছে। 

ডোন্ট টেক মাই নেম! অ্যাসহোল। ফোনে নিজের নামটা শুনে বিষধর সাপের মতো ফুঁসে উঠল স্যামি। ও কি ভয় পাচ্ছে, ওর ফোন ট্যাপ হতে পারে?

ফোনটা কেটেই স্যামি পাগলের মতো টাইপ করতে শুরু করল। ওর সামনের মনিটরগুলোতে একটার পর একটা উইন্ডো খুলতে লাগল, বন্ধ হতে লাগল।

কেউ যাদি কাছ থেকে দেখত, তাহলে ভয় পেত স্যামিকে দেখলে।

ওর মাংসল মুখের অ‍াড়ালে কুতকুতে দুটো চোখ এখন মনিটরগুলোর দিকে তাকিয়ে। অন্যদিকে ঝড়ের বেগে হাত চলছে কম্পিউটার কি-বোর্ডের ওপর।

শেষপ্রযন্ত, গ্রাস, ওই অপদার্থটা এমন চমৎকার একটা প্ল্যান সম্পূর্ণ ঘেঁটে দিল। প্রথম থেকেই অবশ্য স্যামির একটা সন্দেহ ছিল। সেজন্য ওর প্ল্যান ছিল সবকিছু মিটে গেলে গ্রাসকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে। কাউকে মারার জন্য লোক লাগালে, বা নিজেই হাত লাগানোর অ‍াগে স্যামির বিবেক সাফ থাকে। যাকে মারছি, সে কি কোনও পৃথিবীর কোনও উপকারে লাগবে? বেশিদিন বেঁচে থেকে ও করবেটা কী?

গ্রাসের উচিত ছিল মেয়েদুটো আর ওদের দালালটাকে স্পটেই শেষ করে দেওয়া। ওই রাতেই কাজটা করা উচিত ছিল। ঠিক হোটেলের বাইরে।

গ্রাস সেটা পারেনি। তাই ওর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। স্যামি টেলিকমিউনিকেশন অপারেটরের ডেটাবেস হ্যাক করে কল রেকর্ড চেক করছিল। সকালে কেউ একজন জ্যাকিকে ফোন করেছিল। দেওয়ালের বাঁ-দিকের মনিটরে সেই কলের ট্রান্সক্রিপ্ট ভেসে উঠল। চেয়ারটা স্লাইড করে সেদিকে গেল স্যামি। পিটার আর জ্যাকির কথোপকথন পড়তে পড়তে সে গ্রাসকে প্রাণভরে অজস্র গালিগালাজ দিল। গ্রাসের লোকেরা প্রথম টার্গেটটাকে মেরে ফেলেছে ঠিকই। কিন্তু দ্বিতীয় টার্গেট—পিটার—স্পটে পৌঁছে সব দেখে ফেলেছে। 

তারপর সন্দেহ হওয়ায় পুরো ব্যাপারটা জ্যাকি সেনকে জানিয়ে দিয়েছে। হোয়াট আ ফুল! ইউ অ্যাস-হোল! স্যামির রাগ কমছে না, যদি নিজের হাতে কুত্তাটাকে মারতে পারতাম, তাহলে শান্তি পেতাম। নিজের মনেই বিড়বিড় করলেও ও একটু অন্যমনস্ক হয়ে অ‍াছে সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে। এখন নিজের ওপরে একটু একটু রাগও হচ্ছে।

মুম্বাইয়ের কাজটা মিটিয়ে নেওয়ার পরেই কলকাতার কাজটায় হাত দেওয়া উচিত ছিল।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল স্যামি। কলকাতায় একটা দারুণ প্ল্যান হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। ওটাকে সামলাতে হবে। জ্যাকি সেনকে ফাঁসােনার এমন চমৎকার সুযোগ অ‍ার পাওয়া যাবে না। শুয়োরের বাচ্চাটা বহুত জ্বালিয়েছে। এবার ওকে বাগে পাওয়ার অ‍াগেই কি ব্যাপারটা ভেস্তে যাবে?

কিন্তু তার আগে মুম্বাইয়ের একটা এমার্জেন্সি সিচুয়েশন সামলাতে হবে। ওটা বেশি আরজেন্ট। 

নাঃ, অ‍ামার স্বভাব অ‍ার বদলাতে পারব না। আমি একটা বেপরোয়া শুয়োর, বিড়বিড় করতে করতে স্যামি মুচকি হাসল ও আবার কি-বোর্ডে ঝড় তুলল। ওর ক্ষিপ্র টাইপিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনটে মনিটরের ডিসপ্লে পাল্টাচ্ছে। ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস। সে এখন কয়েকটা ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড ক্র্যাক করতে ব্যস্ত। 

তারপরেই এল অ‍াসল মুহূর্ত।

মাঝখানের মনিটরে ভেসে উঠল ডায়ানা লামারের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল। মুম্বাইয়ের হাই-সোসাইটি লেডি ডায়ানা। 

অ্যান্টি-এজিং আর্টিস্ট হিসেবে ওর বেশ নামডাক, প্রস্থেটিক মেকআপে ডায়ানা স্পেশালিস্ট। 

স্যামি ডায়ানার অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করে তার প্রাইভেট মেসেজগুলো পড়তে শুরু করল। বিকেলের আগেই এই ঝামেলাটা সলভ করতে হবে।

করতেই হবে।

নইলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। আর দেরি মানেই স্যামির ঘাড়ে জেনুইন বিপদ চেপে বসবে। 

ও শিট! আজ বিকেলেই পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে মাগী। ওকে আটকাতেই হবে। অ্যাট এনি কস্ট। ফিসফিস করে বলল স্যামি। 

এক মুহূর্তের জন্য থামল স্যামি। খতম করে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।

তারপর মুম্বাই পুলিশের ডেটাবেস হ্যাক করে ওর নিজের সব ছবি ও তথ্য মুছে দিলেই চলবে। 

ওর ছবি মানে, স্যামির অ‍াসল ছবি নয়। ওটা এই পৃথিবীর কেউ এখনও দেখেনি। 

কোনওদিন দেখবেও না। নিজের মনেই বিড়বিড় করল স্যামি।

মুম্বাইয়ের ঘটনাটা অবশ্য কিছুদিন অ‍াগেকার। 

কিছুদিন আগে একটা ফেক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে মুম্বাইয়ের নামকরা এক শিল্পপতির মেয়ে সারিকার সঙ্গে ভাব জমিয়েছিল স্যামি। 

উদ্দেশ্য একটাই ওর নগ্ন, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও হ্যাক করা, যাতে বাকি জীবন ব্ল্যাকমেল করা যায়।

এবার স্যামির কাজের প্যাটার্ন কিছুটা কি বোঝা যাচ্ছে?

না। পুরোটা নয়। এটা ওর সাইড হাসল। 

অ‍াসল কাজটা অনেক ভয়ংকর। শিউরে ওঠার মত। সেটা ক্রমশঃ প্রকাশ্য।

সারিকাকে পটানোর অ‍াগে স্যামিকে সাহায্য নিতে হয়েছিল ডায়ানার। 

কারণ মেয়েরা ওর এই ভয়ংকর সুন্দর মুখ ‍দেখলে ম‍‍োটেও পছন্দ করে না। সেই কলেজ জীবন থেকে এই ট্রমা ওকে তাড়া করে বেড়িয়েছে। গুরুদেব না থাকলে কবেই ও সুইসাইড করত।

মানুষ কি অ‍ার এমনি এমনি সাইকোপ্যাথ বা সোসিওপ্যাথ হয়? 

কারণতো কিছু একটা থাকে। নিজের মনেই স্যামি কথা বলে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে হাতও চলছে কিবোর্ডের ওপর।

স্যামি সারিকার কাছে নিজের নাম বলেছিল ‘সরাব মেহতা’। 

নিজেকে এক ইয়াং অন্টপ্রেনিয়র হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। 

কিন্তু তার অ‍াগে নিজের আসল চেহারাটা তো লুকোতে হবে?

সেই লুকানোর জন্যই ডায়ানার কাছে যাওয়া।

স্যামি বলেছিল, তার কুৎসিত মুখটার একটা মেকওভার চাই। প্রস্থেটিক মেকআপ। এমন মেকঅ‍াপ যাতে কিনা তাকে ভদ্রস্থ দেখায়।

ডায়ানা প্রথমে অবাক হয়েছিল। সাধারণত কেউ এমন অদ্ভুত পার্সোনাল রিকোয়েস্ট নিয়ে আসে না। কিন্তু প্রফেশনাল লোক সে, টাকার জন্য কাজ করে। এটাই তার ট্রেড সিক্রেট। হার্ডকোর প্রফেশনাল। 

তাছাড়া ডায়ানার মনে হয়েছিল এই ছেলেটা খুবই ডেসপারেট নিজেকে সুন্দর করে তোলার জন্য। 

মানুষ ডেসপারেট না হলে তাকে শোষণ করা যায় কি? 

এতদিন এত মানুষ ঘেঁটে মানুষের এই দুর্বলতা ভালই বুঝেছে ডায়ানা। শুধু যেটা বুঝতে পারেনি, সেটা হল স্যামির এই ডেসপারেশন পুরোটাই ডায়ানাকে রাজি করানোর জন্য।

স্যামির ভাবনাচিন্তা তার ভিকটিমদের থেকে অনেক অ‍াগে দৌড়ায়। 

নইলে এই রেসগুলো ও জেতে কী করে?

সেই প্রস্থেটিক মেকআপ আর ‘সরাব মেহতা’ নামটা ব্যবহার করেই স্যামি সারিকার সঙ্গে দেখা করত। 

অল্প বয়সেই স্যামি একটা জিনিস শিখে গেছে—প্রত্যেক মেয়েরই একটা দুর্বল জায়গা থাকে। ফ্যামিলির নেগ্লিজেন্স। 

ভারতে অধিকাংশ দম্পতি ছেলে চায়, মেয়ে নয়। মেয়ে মানে বোঝা, বাড়তি বিয়ের খরচ। ছেলে মানে বাড়তি রোজগার, তাছাড়া বুড়ো বয়সে দেখভাল করার জন্য ছেলে কাছে থাকবে, ইত্যাদি।

বাস্তব যদিও অন্য কথা বলে, ফলে ধীরে ধীরে মানুষের ভুল ভাঙছে। কিন্তু তবুও অধিকাংশ এখনও এই কলোনিয়াল হ্যাংওভারের শিকার।

বাবা-মায়ের এই মানসিকতার ফলে মেয়েদের মনে একটা ক্ষোভ সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো জমে থাকে। তখন যেটা দরকার, পিঠে একটু হাত রাখা, দুটো মিস্টি কথা বলা। ব্যাস, ম্যাজিক। 

মেয়েরা সারেন্ডার করে দেয়। বাবা-মায়ের প্রতি জমানো ক্ষোভ তখন অ‍াগ্নয়গিরির লাভার মত উগরে দিতে থাকে। 

স্যামি কথায় পটু। 

এই প্ল্যান ছকে ফেলার অ‍াগে খুব সহজেই ও সারিকার ফ্যামিলি স্টোরি জেনে নিয়েছিল। এখন সবাই অনলাইনে নিজেকে মেলে ধরতে ব্যস্ত। বাড়ির কুকুর কখন বাচ্চা বিয়োচ্ছে, তার ছবি থেকে শুরু করে, কাজের লোকের সঙ্গে সেলফি তুলে নিজের মহত্ব জারি করা, মানুষ ভাবে তার এইসব কাজকর্ম দেখার জন্য সারা পৃথিবী উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছে।

যত্তসব, ফের নিজের মনে বিড়বিড় করে বলে উঠল স্যামি, হু কেয়ারস? নো বডি। তোমার কুত্তা ছটা বাচ্চা দিয়েছে, তো? সো হোয়াট?

তুমি নোবেল পেয়োছো? তো? সো হোয়াট? হু কেয়ারস?

সারিকার বাবা জুয়েলারি বিজনেস নিয়ে চরম ব্যস্ত, মা কিটি পার্টি, বন্ধু বান্ধব। এখন মেয়েরা কীসে পিছিয়ে? সারিকার মায়ের এক বান্ধবী তার ফার্ম হাউসে সুইঙ্গার ক্লাব চালায়। ভাল দেখতে, কম বয়সী ছেলেদের ভাড়া করে এনে, স্ট্রিপ টিজ শো করে। 

মাঝখানে বেচারা সারিকা একা। বাবা বি এম ডব্লু গাড়ি কিনে দিয়েছে, মা দিয়েছে লেটেস্ট সবথেকে দামী অ‍াই ফোন। কিন্তু সারিকা?

সে অনলাইনে অর্ডার করে মনস্টার ডিলডো। তার শরীরের খিদে মেটে না। কেন মেটে না? অ‍াসল তো অসুখটা মনের। 

চরম একাকীত্ব। সারিকার কোনও বন্ধু নেই। 

সারিকার এই অনলাইন অ্যাক্টিভিটি দেখে স্যামি বুঝতে পারে, মেয়েটি অ‍াসলে ভুগছে চরম নিঃসঙ্গতা থেকে। বাড়ির কেউ ওকে ছোটবেলা থেকে সময় দেয়নি। শি ইজ অ্যালোন অ্যান্ড অ্যাংগ্রি।

অ্যাংগ্রি বলেই ফজিকালি এত হাংগ্রি।

সেই একাকিত্ব কাটাতে প্রথম দিকে সারিকা তার বিভিন্ন বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে সেক্সুয়াল অ্যাডভেঞ্চারে মেতে থাকত। সেটাই ওর কিক ছিল। ওর চালিকা শক্তি।

হাই সোসাইটিতে এটা খুব কমন ট্রেট। বেসিক ইন্সটিঙ্কট যেন একটা খোলা নর্দমা। কিন্তু তারও তো একটা লিমিট থাকে? তাছাড়া এইসব ছেলেরাও একাকীত্বে ভোগে। কোনওদিন একটা মেয়েতে অ‍াটকে থাকে না। তারা নভলটি খোঁজে। নতুনত্ব মানেই নতুন কিক।

অতএব ড্রাগ। এইসব পার্টিতে দেদার বিক্রি হয় সব ধরনের মাদক।

খুব ভেবেচিন্তে প্রথমে স্যামি সারিকার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে একটা সাইকোলজিক্যাল ওয়ার শুরু করল। 

সারিকার পক্ষ নিয়ে তার মন জিতে নিল। স্ট্র্যাটেজিটা কাজও করল। পঞ্চম মিটিংয়েই সারিকাকে বিছানায় নিয়ে গেল স্যামি।  

অ‍ারও অ‍াগেই যেত, তবে স্যামি এসব কাজে তাড়াহুড়ো করতে চায় না। 

ফলে ধীরে সুস্থে ওকে বিছানায় তুলল স্যামি।

কিন্তু সেখানে তার জন্য যে সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। 

বিছানায় সারিকা এক্কেবারে এক্সপার্ট। সে নিজেই স্যামির জামাকাপড় খুলে দিল। উত্তেজনায় তার চোখ চকচক করছে, যেন কোনো অদৃশ্য টর্চের আলোর উৎস থেকে তার মুখে আলো পড়ছে। 

শিবরাম চক্কোত্তি হলে লিখতেন, টর্চের অকারণ টর্চার। 

স্যামির টর্চ দেখে সে অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ও মাই গড! আমি এমন জিনিস আগে দেখিনি। এটা কি সত্যি? না ফেক? 

স্যামি মুচকি হেসে গোপন ক্যামেরাটা অ্যাডজাস্ট করে নিল ওর স্কাল ক্যাপের সঙ্গে, যাতে সারিকার মুখটা ফোকাসে থাকে। কথাবার্তাগুলো পরিস্কার শোনা যায়। 

সারিকা জানে না, সবকিছুই রেকর্ড হচ্ছে ক্লাউড সার্ভারে এবং একইসঙ্গে ইয়েলাগিরির পাতালগুহায়। 

সারিকা তখন অ‍ানন্দে উন্মাদ। স্যামির ওই বিশেষ অঙ্গটিকে জড়িয়ে ধরে, কখনও চুমু খাচ্ছে, চোখের জলে ভিজিয়ে দিচ্ছে, কাঁদতে কাঁদতে, আদর করতে করতে অভিযোগের সুরে বলছে, তুমি একটা বাজে লোক। দুষ্টু লোক। এত দেরি করলে কেন? কেন অ‍ারও অ‍াগেই এই টর্চার শুরু করোনি? 

সারিকার চোখের কোল ভিজে গেল কান্নায়। 

টপটপ করে জল পড়তে লাগল স্যামির পেটে, সুড়সুড়ি লাগতে শুরু করল। 

স্যামি তো তাজ্জব বনে গেল ওর এই অ‍াবেগ দেখে। 

সারিকা কি কিছু সন্দেহ করেছে? 

পরমুহূর্তেই বুঝল, না, ওটা আনন্দের কান্না। 

তারপর অবশ্য যা ঘটল তার জন্য স্যামি একেবারেই রেডি ছিল না।

সারিকাই লিড নিল। মুহূর্তের মধ্যে।

শুয়ে থাকা স্যামির পেটের ওপর উঠে বসল সারিকা, তার চোখমুখের অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। বোঝাই যায় নিজের ওপর অ‍‍ার কোনও কন্ট্রোল নেই ওর। কিন্তু বেশিক্ষণ ঘোড়ায় চড়াটা কপালে নেই বেচারীর, খুব দ্রুত স্যামি ওরফে সরবের রোমশ কালো বুকের ওপর ভেঙে পড়ল কান্নায়। 

কাঁদতে কাঁদতে বলল, অ‍ামি অ‍ার পারছি না সরু? 

সারিকার কাছে স্যামি তো সরব মেহতা, তাই সরবকে অ‍াদর করে সারিকা ডাকে সরু।

যদিও স্যামির টর্চ মোটেও সরু নয়। ইন্ট্রোডাকশনে সারিকা তার নাম দিয়েছে, মোটি হাতি। 

সারিকার এই অফুরন্ত সেক্স ম্যানিয়া স্যামিকে যথার্থই ক্লান্ত করে দেয়। বুদ্ধদেব বসু হলে অতীব সুভদ্র ভাষায় লিখতেন, সময়ের সাথে কামুকের কার্মূক‍ও শিথিল হয়ে যায়। 

হবে না? শরীরের তো একটা সীমারেখা অ‍াছে।

কিন্তু সেক্স নিয়ে না হয় স্যামির বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, তার মাথায় এতক্ষণ ব্ল্যাকমেলের ছক ঘুরছে, সে শুধু ছবি তুলতে ব্যস্ত, যাতে পরে ঠিকঠাকভাবে ব্ল্যাকমেল করা যায়, কিন্তু সারিকা?

তার তো এটা মানসিক অসুখ। খিদে তাই মেটে না কিছুতেই।

অ্যাপেটাইট কামস উইথ ইটিং – ফরাসী প্রবাদে বলা রয়েছে। 

এর পরের কাহিনী সংক্ষেপিত। 

যথারীতি কয়েক দিন পর স্যামি সারিকার কাছে পঁচিশ লাখ ডিমান্ড করল। ফার্স্ট ইনস্টলমেন্ট। সঙ্গে কিছু ইন্টিমেট ছবিও পাঠিয়ে দিল স্যাম্পল হিসেবে।

গণ্ডগোল পাকল তার পরেই।

মাত্র পঁচিশ লাখ তো সারিকার কাছে হাতের ময়লা? তাই না?

স্যামি এমন ভাবলে কী হবে, সারিকা কিন্তু গোটা ব্যাপারটাকে মোটেও স্যামির মত করে ভাবেনি। 

স্যামির টর্চ ছাড়া ওর তো হারানোর কিছু নেই।

সোজা বাবাকে সব জানিয়ে দিল সারিকা। স্যামির এই বিশ্বাসভঙ্গ ওকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছিল।

তাছাড়া স্যামির ওই বিশাল পৌরুষের প্রতি তার একটা মোহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এত তাড়াতাড়ি সেটা হারানোয় সে এতটাই ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে পড়েছিল যে রীতিমত ডিপ্রেশনে চলে যায় সে। 

সারিকার বাবা প্রভাবশালী জুয়েলারি এক্সপোর্টার। পুলিশ কমিশনারের বউকে নিয়মিত ফ্রি গিফট পাঠান। 

ফলে মুম্বাই পুলিশ জানপ্রাণ লড়িয়ে দিল সরাব মেহতাকে খোঁজার জন্য। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কোনো ক্লু মিলল না। সারিকাকে জেরা করেও লাভ হলো না। সে শুধু স্যামির ওই বিশাল গোপনাঙ্গের কথা ভাবতে ভাবতে কান্নায় ভেঙে পড়ে অ‍ার বলে, হোয়াই ডিড হি ডু দ্যাট টু মি? ও গড, অ‍াই ক্যান্ট লুজ ইট।

ওই হারানোর দুঃখ ছাড়া আর কিছুই বলতে পারছে না সারিকা। 

যতই ওকে জিজ্ঞেস করা হয়, সরব মেহতা ‍ওকে কী বলেছিল?

সারিকা কেঁদেকেটে একসা হয়ে শুরু করে একেবারে স্যামির দুটো পায়ের ফাঁক থেকে।

পুলিশ অবশ্য ব্যাপারটা ছাড়ল না। 

লোকাল মিডিয়ায় সরাব মেহতার ছবি ছাপল পুলিশ। আশা, কেউ না কেউ চিনতে পারবে। কাজ হলো একেবারে ম্যাজিকের মত! 

ডায়ানা ছবিটা দেখে চমকে উঠল। 

অ‍ারে, এই ছেলেটাকে তো সে-ই প্রস্থেটিক মেকআপ দিয়ে তৈরি করেছে! সোসাইটি লেডি হিসেবে ডায়ানাও কিছু কম যায় না।

সে বরাবরই ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায়। কিছুদিন আগেই এক পার্টিতে মুম্বইয়ের কমিশনারের সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। চোখের ইশারাতেই ‌ডায়ানা বুঝে গেছে কমিশনার তার প্রতি দুর্বল। মিটিমিটি হাসছে, একবার যেন চোখও মারল।

সুতরাং ডায়ানা এই সুযোগে কমিশনারকে সরাসরি ফোন করে সরাব মেহতার ব্যাপারটা বিস্তারিত জানাল। 

ডায়ানা বলল, একজন গুড সিটিজেন হিসেবে সে সাহায্য করতে চায়। আসলে সারিকা আর সরাব মেহতার বাহানায় সে কমিশনারের সঙ্গে পার্সোনালি দেখা করতে চাইছিল। 

কমিশনার তো এক পায়ে খাড়া। সেই অদৃশ্য পা-টা অ‍াবার দুটো দৃশ্যমান পায়ের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে।

ফলে, শেষমেষ আজ বিকেলেই ডায়ানা দেখা করতে যাচ্ছে কমিশনারের সঙ্গে একটি রিসর্টে। দুজনের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হবে।

অ‍াগে কমিশনার নিজে একা কথা বলবেন, তারপর ইনভেস্টিগেশন টিমের সঙ্গে কথা হবে ডায়ানার।

ইয়েলাগিরিতে বসে স্যামি ডায়ানার প্রাইভেট চ্যাট পড়ছে আর মাথা নাড়ছে, মিস ডায়ানা, আমি তোমাকে এটা করতে দিতে পারি না। তুমি অ‍ার কথা বলবে না, না, কোনওদিনই নয়। অন্তত এই জন্মে তো নয়ই। 

স্যামির মুখটা হিংস্র দেখায়। 

ডায়ানাকে থামানো দরকার। চিরতরে।

সে ডায়ানার বেস্ট ফ্রেন্ডকে খোঁজার চেষ্টা করল। কেউ তো থাকবেই। এইসব মহিলা চতুর্দিকে জাল বিছিয়ে রাখে, মাকড়সার মত।

বিড়বিড় করে উঠল স্যামি, ইয়েস, পেয়েছি। রজত কাপুর। বিজনেসমান। ম্যারেড, গত দুবছর ধরে ডায়ানার সঙ্গে পরকীয়া চালাচ্ছে। ছি, ছি, ছি, কী নোংরা জীবন এদের! নাঃ, এসব আর চলতে দেওয়া যায় না, মিস ডায়ানা। 

স্যামি নিচু গলায়, অনেকটা গান গাওয়ার সুরে বলল, আজ লেট মর্নিংয়েই রজত তোমার সঙ্গে দেখা করতে যাবে মিস ডায়ানা। কমিশনারের সঙ্গে মিটিংয়ের আগেই। তুমি দেখা করবে তো?

অবশ্য তার অ‍াগে অন্য একটা কাজ করা দরকার। 

স্যামি রজতের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করল। 

ও প্ল্যান ছকে ফেলেছে। 

প্রথমে রজত মেসেঞ্জারে ডায়ানাকে প্রাইভেট মেসেজ পাঠাবে, তারপর ওই রিসর্টের বাইরে দেখা করবে দুপুরের দিকে। 

তাহলে মেসেজটা দেখে মনে হওয়া চাই যেন মেসেঞ্জার থেকেই এসেছে। 

স্যামি বিড়বিড় করে বলল, নো প্রবলেম মিস ডায়ানা। আমি করে দেব। আই ক্যান ডু দ্যাট। আমি এই দুনিয়ার বেস্ট সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ার! 

ফিসফিস করে গান গাইতে গাইতে স্যামি একটা ছোট্ট কোড লিখে ফেলল। এটা সিক্রেট মেসেজের সঙ্গে অ্যাটাচ করা থাকবে। কোডটা মেসেঞ্জার টুলের ইন্টারফেস বা ‘লুক’ নকল করবে। ডায়ানা ভাববে রজত তাকে মেসেঞ্জারে নক করেছে। 

স্যামি মনে মনে বলল, আশা করি মিস ডায়ানা অতটা চালাক নন যে ফাঁদটা ধরতে পারবেন।