রবিবার, সকাল ৭.০৯, কলকাতা
ঘণ্টাখানেক আগের কথা।
খারাপ খবরটা সবে গ্রাসের কানে এসে পৌঁছেছে।
ওর ছেলেরা কাজ হাসিল করেছে ঠিকই, কিন্তু পুরোটা নয়।
রাহি আর পিটার খতম। কিন্তু যমজ বোনদের অন্যজন, রাহেলা—সে বিলকুল হাওয়া।
মাঝরাতেই সে নাকি কলকাতা ছেড়েছে।
কাণাঘুষোয় গ্রাস শুনেছে, রাহেলার জন্য দিল্লির কোন মিনিস্টারের ছেলে পাগল।
তাহলে এখন সে কোথায়? দিল্লি?
দিল্লি কি হাতের মোয়া যে চাইলেই খুঁজে বের করা যাবে?
খুনখারাপি গ্রাসের খুব একটা পছন্দের বিষয় নয়। ও ব্যবসায়ী লোক। খুব প্রয়োজন না হলে ও ছেলেদের ফিল্ডে নামাতে চায় না।
ও সাপ্লাই আর ডিমান্ডের খেলায় বিশ্বাসী। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়। কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী তিন নম্বর টার্গেটকেও শেষ করতে হবে। কিন্তু পাখি তো উড়ে গেছে। দিল্লি গিয়ে গ্রাস ওই মাগীকে কোথায় খুঁজে বের করবে?
তবে একটা বিষয়ে গ্রাস বেশ খুশি।
মনটা ফুরফুরে করে দিয়েছে টাকা।
প্রচুর টাকা।
বাস্তবিকই টাকার অনেক গুণ। একটা প্রধান গুণ হল, মন ভালো করে দেয়।
ভোররাতে পিটারকে যে পঁচিশ লাখ ক্যাশ বুঝিয়ে দিয়েছিল, পিটারের ডেডবডি থেকে সেটা আবার ওর পকেটে ফেরত এসেছে পুলিশ মারফত। যদিও হারামজাদারা হাফেরও বেশি মেরে দিয়েছে।
বলছে দশ লাখের বেশি পাওয়া যায়নি।
ওরা তো জানে না, পুরোটাই জালি নোট।
গ্রাস ফিকফিক করে হাসতে শুরু করল।
সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না। একেই বলে বিজনেস। তবে পুলিশকে কিছু মাল খাওয়াতে হবে হয়তো।
শুধু একটাই ভয়। কেসটা যদি মতিলাল মিস্ত্রি নিজে টেক অাপ করে, তাহলে গ্রাস গেল। পুলিশের এই নতুন টিকটিকিটাকে সরানোর জন্য জ্যাকি সেন নাকি জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে।
কিন্তু কাজ হচ্ছে কই?
অাপাতত ওই সিক্রেট ভিডিওটা আননোন কলারের ইমেলে পাঠিয়ে দেওয়ার পর ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেহারাটাই পাল্টে গেছে। যেন ভায়াগ্রা খেয়ে একলাফে দাঁড়িয়ে গেছে গ্রাফটা। একরাতেই গ্রাস সুপার রিচ!
কিন্তু গ্রাস তখনও পর্যন্ত জানে না, ওর মাথার ওপর দিয়ে এখন শকুনেরা চক্কর কাটছে। মাটির নীচে লাশ পোঁতা থাকলেই একমাত্র শকুনেরা চক্কর কাটে।
গ্রাস তখনও পর্যন্ত এও জানে না যে ওর লাশ পোঁতার ব্যবস্থাও হয়ে গেছে।
ও এখন স্যামির লেজিটিমেট টার্গেট। অার স্যামি কখনও টার্গেট মিস করে না।
পিটার মরার আগে জ্যাকি সেনকে ফোন করে সব বলে দিয়ে গেছে সেটা ওর জানার কথা নয়।
ও এটাও জানে না যে মুস্তাফা যমদূতের মতো ওর দিকেই এগিয়ে আসছে দলবল নিয়ে।
আর ইয়েলাগিরি থেকে সেই মোটা কম্পিউটার-উইজার্ড স্যামি যে ওর ডেথ ওয়ারেন্টে সই করে দিয়েছে, সেটা তো ওর কল্পনারও বাইরে।
এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
গ্রাসেরা অ্যানালগ যুগের মানুষ। টেপ রেকর্ডার, রেকর্ড প্লেয়ারে গান শুনে বড় হয়েছে। তখন অার কোথায় ইউ টিউব কোথায় ছিল?
অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল, এই বিবর্তন অনেকটা মানুষের চাকা অাবিষ্কারের মত।
হঠাৎ মারাত্মক গতি যোগ হয়ে গেছে জীবনে।
যে গ্রাস এখনও ঠিকমত স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনই হ্যান্ডল করতে পারে না, সে কী করে বুঝবে যে স্যামি কলকাতার লোকাল এজেন্টকে অর্ডার দিয়ে দিয়েছে ওকে ওড়ানোর জন্য?
শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে গ্রাসের ল্যাপটপের পুরো দখল নিয়ে নিয়েছে স্যামি।
দুটো ছেলে অলরেডি লোডেড গান নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। অজ্ঞতা কি সবসময় আশীর্বাদ? কে জানে!
আকাশের দিকে তাকিয়ে মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল গ্রাসের। মেঘলা আকাশ। বৃষ্টির তোড়জোড় চলছে। সকাল থেকেই বেহালা বাজাতে শুরু করেছে অাকাশ। সকালেই এই হাল, শালা, এখনও সারাদিন পড়ে অাছে।
বৃষ্টি নামলে সোনাগাছির ব্যবসায় মন্দা যায়। বৃষ্টি মাথায় করে খদ্দের আসতে চায় না।
কাদা, প্যাচপ্যাচে রাস্তা পেঁচিয়ে ধরে এশিয়ার বৃহত্তম রেড-লাইট এরিয়া সোনাগাছির গলা।
আর গ্রাস?
এখানকার লোকাল গার্জেন হিসেবে ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকিয়ে গ্রাস তখন অভিশম্পাত দেয় অাকাশকে।
এখানকার মেয়েগুলোর রোজগার না হলে ওর পেটও যে সেদিনের মত খালি থাকে। এটা কি ভাল?
এটা ঠিক, রোজগারের একটা বড় অংশ জ্যাকি সেনকে আর পুলিশকে হপ্তা হিসেবে দিতে হয়, কিন্তু বাকিটা তো ওরই থাকে।
সত্যি বলতে কি, জ্যাকি সেনের দাদাগিরি আর ওর সহ্য হচ্ছিল না। অনেকদিন ধরেই ভাবছিল কীভাবে কেটে পড়া যায়?
তবে ভাবলেই তো অার নিজের এম্পায়ার বানানো যায় না।
ঠিক এই সময় অাশীর্বাদের মত ফোনটা এল।
অফারটা এমনই গ্রাস না করতে পারেনি। যদিও প্রথম ধাক্কায় ও বিশ্বাসই করতে পারেনি।
সেদিন গ্রাস সোনাগাছির এক ঠেকে বসে মদ গিলছিল। বেশ চড়ামাত্রায় ছিল নেশা।
হঠাৎ ফোনটা এল ওর মোবাইলে। কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তির পর, এক চ্যালাকে বলল, এই গাণ্ডু দ্যাখ তো কোন বিসি ফোন করছে।
সেই চ্যালা অাবার এক কাঠি সরেস।
সে বলল, বেল্যাঙ্ক কল গুরু। ধোরো না। সব টাকা চোট হয়ে যাবে।
গ্রাস একটি ছাপার অযোগ্য খিস্তি দিয়ে তাকে বলল, তুই কোন রাঁড়ের বাড়ির কার্তিক রে, অামার ফোন শালা অামি ধরবো কী পুরব, সেটা অামার ব্যাপার। তুই ধরে শুধু হ্যালো বল। না, বল যে, বস ব্যস্ত। মাল খেতে ব্যস্ত। ওহো, না, না, মাল খাওয়ার কথা বলিস না, বল, বস মিটিং করছে কমিশনারের সঙ্গে।
ছেলেটা গলাটা কাঁপিয়ে, কমল মিত্রকে নকল করে আননোন কলারকে খবরটা জানাল।
উল্টোদিক থেকে হিন্দিতে চোস্ত খিস্তি দিয়ে কেউ একটা বলল, দেখছি শুয়োরের বাচ্চাটা মদ খাচ্ছে সামনে বসে। দে, ফোনটা দে হারামজাদাকে।
দেখছে? ফোনের ভেতর দিয়ে অাবার দেখা যায় নাকি? এটাতো ভিডিও কল নয়।
চ্যালা এদিক ওদিক টাল খেয়ে গ্রাসের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ধরো, ধরো, কমিশনারই ফোন করেছে।
গ্রাস শশব্যস্ত হয়ে ফোন ধরে বলল, ইয়েস স্যার।
ওপার থেকে প্রশ্ন ভেসে এল, তুই-ই কি জ্যাকি সেনকে স্কুলগার্ল সাপ্লাই করিস?
গ্রাস তখন ফুল টাল। নেশার ঝোঁকে চেঁচিয়ে উঠল, তুই কে রে মাদার ফাকার? আমাকে জেরা করছিস?
ওপার থেকে গলাটা শান্ত, কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা শোনাল, একবারে পঞ্চাশ লাখ কামাতে চাস? পঞ্চাশ লাখ? ভেবে দ্যাখ।
গ্রাস জড়িয়ে যাওয়া গলায় হেসে উঠল, পঞ্চাশ লাখ? হাঃ! কে রে তুই? বিল গেটস? তোর কি বাড়িতে টাকা ছাপানোর মেশিন আছে? আমাকে পঞ্চাশ লাখ দিবি?
উল্টোদিকের লোকটা শান্ত গলায় ভদ্রভাবে বলল, প্রথমত, তুই এখন মাতাল। দ্বিতীয়ত, কোনও কিছু বোঝার মতো অবস্থায় তুই এখন নেই। আমি রাতে আবার ফোন করব। তখন কথা হবে।
লাইনটা কেটে গেল। গ্রাস গ্লাসটা শূন্যে তুলে দুলতে দুলতে চেঁচাতে লাগল, শালা আমাকে পঞ্চাশ লাখ দেবে বলছে! পঞ্চাশ লাখ দেখেছিস কোনোদিন? অ্যাঁ? পঞ্চাশ লাখ! যত্তসব সিস্টার, মাদার, ব্রাদার, ফাদার, অার কী কী অাছে রে, সব ফাকার!
নেশা চড়লে গ্রাস খিস্তিগুলোর ইংরেজি সংস্করণ ঝাড়ে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। শুধু ওর ভোকাবিউলারি ফুরিয়ে গেল।
সে রাতেই আবার এসেছিল ফোনটা।
নেশা কেটে যাওয়ার পর গ্রাস যখন প্ল্যানটা শুনল, না করতে পারল না। অফারটা সত্যিই লোভনীয়। শুধু কাজটা মিটে গেলে কয়েকজনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে। পিটার-সহ। তারজন্য গ্রাসের পঞ্চাশ হাজার খরচ হবে কি না সন্দেহ।
কাজটা তো হয়েই গেছিল প্রায়। শুধু রাহেলাটা ফসকে গেল। ঠিক অাছে, ফের যদি ফোন অাসে, গ্রাস সত্যি কথাটাই বলবে। সত্যিতো ওর কী করার অাছে? কলকাতায় রাহেলা এলে ও যদি খবর পায়, তখন না হয় ব্যবস্থা করবে।
সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের যেখান থেকে পেট্রল পাম্পের দুদিক থেকে দুটো সরু গলি ঢুকছে সোনাগাছিতে, যেখানে রাস্তায় সার দিয়ে মুখে রঙ মেখে অল্পবয়সী মেয়েরা দাঁড়িয়ে থাকে পাথরের মত চোখ নিয়ে, তারই একপাশে গ্রাসের বিল্ডিং মেটেরিয়াল সাপ্লাই দেওয়ার অফিস। তার সামনে একটা চেয়ারে বসে সবে খবরের কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরেছে, এমন সময় হঠাৎ একটা বাইক এসে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ব্রেক কষল ঠিক ওর সামনে।
বাইকে দুটি কমবয়সী ছেলে। কলেজ স্টুডেন্ট বলেই মনে হয়।
কাগজ থেকে চোৰ তুলে গ্রাস মনে মনে বলল, এসো বাবা, এসো, লক্ষী সোনারা, তোমরাই তো সােনাগাছিকে বাঁচিয়ে রেখেছো।
একজন বাইক থেকে নেমে খুব ইনোসেন্ট মুখে এগিয়ে এল গ্রাসের দিকে। হাতে একটা কাগজের টুকরো।
আঙ্কল, এই রাস্তাটা কোনদিকে একটু বলে দেবেন?
ধুস শালা, খদ্দের নয়? গ্রাস বিরক্তি নিয়ে ছেলেটার বাড়িয়ে দেওয়া কাগজের দিকে তাকাল। পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু একি! কাগজটা তো সাদা! ব্ল্যাঙ্ক!
অবাক হয়ে মুখ তুলে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, দেখল ছেলেটার হাতে একটা কালো রিভলবার। সোজা ওর মাথা লক্ষ্য করে তাক করা। আঙ্কল ডাকার মধ্যে যে এতবড় ফাঁদ ছিল, সেটা বোঝার আগেই ট্রিগার টিপে দিল ছেলেটা। খুব কাছ থেকে। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ। মিস হওয়ার কোনও চান্সই নেই।
বুলেটটা সোজা এসে বিঁধল অাঙ্কল গ্রাসের বাঁ চোখে। গ্রাসের বাঁ চোখটা ছিল মাইওপিক। দূরের জিনিস ঝাপসা দেখত। চশমা লাগত।
বুলেটটা এসে সেই ঝাপসা ভাবটা চিরকালের জন্য কাটিয়ে দিল। পাথরের মূর্তির মতো উল্টে পড়ল গ্রাস। দু-একটা মেয়ে রঙিন ছাতা নিয়ে রাস্তায় বেরনোর তোড়জোর করছিল, তারা – ও মা, এ কী কাণ্ড – বলে চোঁ চাঁ করে ঢুকে গেল নিজেদের গর্তে।
ছিটকে গেল গ্রাসের হাতের খবরের কাগজ। ছেলেটা কোনো চান্স নিল না। ম্যাগাজিন খালি করে দিল গ্রাসের নিথর শরীরের ওপর। পরপর গুলির আওয়াজ বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিশে গেল।
সবকিছু নিখুঁতভাবে অ্যারেঞ্জ করার সময় গ্রাস একবারও ভাবেনি, যে ফাঁদ ও অন্যের জন্য পেতেছিল, বেনামী খুনিরা এসে সেই ফাঁদেই ওকে শুইয়ে দিয়ে যাবে। রাস্তার জমা জলে তখন গ্রাসের রক্ত মিশে একটা অদ্ভুত লাল নকশা তৈরি করছে।
