চ্যাপ্টার এইট – রক্তমাখা নীল ভিডিও

রবিবার, সকাল ১১.১৯, মুম্বাই

নাঃ, ডায়ানা ঘুণাক্ষরেও কিছু সন্দেহ করেনি। 

ওর নিজের জগতের বাইরে মাত্র দুটি ব্যাপারেই ওর অ‍াগ্রহ রয়েছে। একটা হল সোসাইটির গসিপ, অ‍ারেকটি হল একাকী বিবাহিত পুরুষ। বিভিন্ন পার্টিতে ডায়ানা ঘুরে বেড়ায় সরু চোখ করে। ও শিকার খোঁজে। কোনও টেবিলে মদ নিয়ে একাকী পুরুষ বসে থাকতে দেখলে ও অ‍াশেপাশে রাউন্ড মারতে শুরু করে, দৃষ্টি অ‍াকর্ষণের জন্য নানা চেষ্টা চালায়। সব সময় যে সফল হয়, তা নয়। তবে এভাবেই রজতের সঙ্গে ওর অ‍ালাপ জমে গিয়েছিল।

সেবার রজত তার এক পুরুষ বন্ধুকে বলছিল, কী বলব মাইরি, এই বয়সেই যে বউ এত ঠাণ্ডা মেরে যাবে, তা ভাবতেও পারিনি। ব্রথেলে যেতেও শালা ভয় করে। যে হারে এডস বাড়ছে। কী অ‍ার করব, হাত বউই ভরসা।

এটা ওভারহিয়ার করার পর ডায়ানা রজতকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করে ও এক সময় বঁড়শিতে গেঁথে ফেলে শিকারকে। 

অন্যদিকে গসিপ করার লোকেরও অভাব নেই। এ ওর অ‍াড়ালে সব সময়েই কিছু না কিছু বলে বেড়াচ্ছে। কে কার বউকে নিয়ে কোথায় গেল, কার মেয়ে কোথায় পেট বাঁধিয়েছে বা গর্ভপাত করিয়েছে, সবই দেখা যায় লোকে জানে।

মানুষের জীবনে গোপন বলে কিছু রইল না। গাড়ি চালাতে চালাতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ডায়ানা।

সাধারণত, রবিবারের দিনে রজত ওর সঙ্গে দেখা করতে চায় না। লুকিয়ে প্রেম করার জন্য রবিবার দিনটা মোটেই সুবিধার নয়। একবারই মাত্র রবিবার দেখা হয়েছিল। রজতের মনে আছে সেটা? 

এদিন সকালে ডায়ানার মোবাইলে যে মেসেজটা এসেছিল, তা ওকে সেই দিনটার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

এই স্মার্ট ফোনটাও রজতেরই প্রেজেন্ট করা। লেটেস্ট অ‍াই ফোন।

ডায়ানা দেখল, রজতের মেসেজ সেই কথাই বলছে, মনে আছে, প্রিন্সেস ডি? আমরা একবার লং ড্রাইভে গেছিলাম?

মেসেজটা পড়ে ডায়ানা হাসল। 

হ্যাঁ, মনে থাকবে না আবার? ওই দিনই তো রজত ওকে এই রোলেক্স ঘড়িটা দিয়েছিল। ঘড়িটার দিকে তাকাল ডায়ানা। হীরে বসানো রোলেক্স। 

ডায়ানা ফিসফিস করে বলল, লাভ ইউ রাজু। আজ কী গিফট আনবে তুমি?

গিফটের কথা ভাবতেই ডায়ানার শরীর চিড়বিড় করে উঠল। রজত বিছানায় দুর্দান্ত। ডায়ানা ওর লাইফে যত পুরুষের সঙ্গে শুয়েছে, তার মধ্যে রজতই সেরা। 

ও জানে মেয়েদের শরীরটাকে কীভাবে বাজাতে হয়। ঠিক যেন কি বোর্ডের মত করে ও ডায়ানার শরীরকে হাই নোট থেকে লো নোটে ওঠায়, নামায়। 

ডায়ানার মনে পড়ল রজতের বউয়ের কথা। হাড় জিরজিরে, খিটখিটে একটা মহিলা। সবসময় যেন ঝগড়া করার জন্য মুখিয়ে অ‍াছে। মুখে একরাশ বিরক্তি। একটা পায়ে জন্ম থেকে ডিফেক্ট থাকলে কী হবে, মহিলার টাকা অ‍াছে অফুরন্ত। বাবার নাকি তিনটে জাহাজ। এক মেয়ে। সুতরাং, রজতকে অ‍ার পায় কে?

গাড়ি চালাতে চালাতেই নিজের মনে বলল ডায়ানা, ওই বউয়ের পক্ষে কোনো স্বামীকে খুশি করা সম্ভব? বেচারা রজতই বা আর কী করবে?

ডায়ানা গিয়ার চেঞ্জ করল।

আজ ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে ডায়ানা। 

এসব সিক্রেট ডেটিংয়ে ও একাই গাড়ি চালিয়ে আসে। কারণ একটাই, ড্রাইভারদের থেকেই গসিপ ছড়ায়। ডায়ানা শুনেছে, অনেকে নাকি অন্যদের ড্রাইভারকে পয়সা দিয়ে এসব খবর কেনে। 

সত্যি, এসব কীর্তিকলাপ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। পরনিন্দা পরচর্চা ছাড়া মানুষ কি অ‍ার কিছু জানে না? 

ডায়ানা গাড়ি চালাতে চালাতে মাথা নাড়ল। নিজের মনেই হাসল। এসব ক্ষেত্রে সাবধান থাকা ছাড়া উপায় কী? তাছাড়া রজতও পছন্দ করে না কেউ ওদের আশেপাশে থাকুক। ডায়ানার সঙ্গে দেখা করতে এলে রজতও তাই নিজের গাড়ি নিজেই চালায়।

মুম্বাইয়ের এই হাই-সোসাইটি বড্ড ছোট জায়গা। সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখার জন্য কান বড় করে ঘুরে বেড়ায়। গসিপ মঙ্গারে ভর্তি চারপাশ। দেওয়ালেরও কান আছে এখানে। 

অ‍ার অ‍াছে কিছু পারভার্ট নারী পুরুষ। তারা শিকার ধরার জন্য ঘুরে বেড়ায়। ঠিক ডায়ানার মতই দূর থেকে শিকার দেখলে তাদের চোখ সরু হয়ে যায়। মুখে ফুটে ওঠে একটি বিশেষ হাসি।

কার যে কীসে তৃপ্তি, তা অবশ্য বোঝা মুস্কিল। 

খুব ছোটবেলায় ডায়ানার গোপন জায়গায় হাত দিয়েছিল ওর বাবারই এক বন্ধু। ওরা গোয়া বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে সেই অ‍াঙ্কল ওকে চ্যাংদোলা করে সমুদ্রে চান করাতে নিয়ে গিয়েছিল। 

প্রবল অ‍াপত্তিতে ডায়ানা প্রথম দিকে হাত পা ছুঁড়লেও পরে মজাটা টের পেয়ে চুপ করে গেছিল। সেই থেকে বিবাহিত পুরুষ দেখলেই ডায়ানার ভেতর কে যেন ওকে প্রতিশোধ নেওয়ার কথাটা বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে।

গাড়ি চালাতে চালাতে ডায়ানা বিকেলের মিটিংটার কথা ভাবছিল। অ‍াজ বিকেলে ওর কমিশনারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। অ‍ারও একটি মাঝবয়েসি, সেক্স-স্টার্ভড একাকী লোক। 

কয়েক মাস আগে এক চ্যারিটি শো-তে আলাপ হয়েছিল। ডায়ানাই যেচে অ‍ালাপ করেছিল।

সেই থেকেই লোকটা ডায়ানার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ডায়ানা ফের মুচকি হাসল। ও পুরুষ মানুষ চেনে। এদের চোখের ভাষা পড়তে ওর ভুল হয় না। 

সব বিবাহিত পুরুষই বউতে বিরক্ত হয়ে যায় একটা সময়ের পর। উল্টোটাও হয়। 

ডায়ানা স্টিয়ারিংয়ে তাল ঠুকতে ঠুকতে গান ধরল। খুব নিচু গলায়। সারিকাকে সাহায্য করাটা ওর আসল উদ্দেশ্য নয়। ওটা তো জাস্ট একটা বাহানা। 

ডায়ানা জানে সারিকা আসলে কী। একটা সেক্স-হাংগ্রি বিচ। যার তার সঙ্গে শুয়ে বেড়ায়। ওর বাবারও তো মাল্টিপল অ্যাফেয়ার্স। আর মা তো কিটি পার্টির নামে অরজি অর্গানাইজ করে। মেল মডেল এনে স্ট্রিপটিজ করায়। পুরো ফ্যামিলিটাই যেন একটা পর্নো ইন্ডাস্ট্রি। 

অবশ্য কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার পেছনে ডায়ানার একটা অন্য মতলব আছে। 

ব্যান্দ্রাতে ও একটা নতুন বিউটি পার্লার খুলতে চাইছে। কিন্তু লোকাল থানা কিছুতেই পারমিশন দিচ্ছে না। নানা টালবাহানা করছে। 

আজকের পর, ওই থানার ওসির বাপের সাধ্যি নেই পারমিশন আটকায়। উল্টে ডায়ানার বাড়ি এসে চাকরির জন্য ভিক্ষে চাইতে হবে ওকে। হারামজাদা কোথাকার।

আমি জানি বলটা কীভাবে গড়াতে হয়, ডায়ানা গুনগুন করে গাইল।

হঠাৎ সেই মোটা কুৎসিত ছেলেটার কথা মনে পড়ল। যে ওর কাছে এসে বলেছিল, আমাকে হ্যান্ডসাম বানিয়ে দাও। প্রস্থেটিক মেকআপ দিয়ে একদম বদলে দাও বদখত থোবড়াখানা। 

টাকা ভালোই দিয়েছিল ছেলেটা। না দেওয়ার কী অ‍াছে? নিশ্চয়ই কোনো বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে। 

বাবা-মা সময় দেয় না, তাই টাকার গরমে যা খুশি করে বেড়ায়। মুম্বাইয়ে এমন ছেলের অভাব নেই। নাম-না-জানা পার্টিতে তারা ঘুরে বেড়ায়, মেয়েমানুষ আর ড্রাগসের পেছনে দেদার টাকা ওড়ায়। 

ওই ছেলেটাই সারিকাকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করেছিল, খবরটা জেনে ডায়ানা অবশ্য একটুও অবাক হয়নি। ওই মেয়েকে যে অ‍াগেই কেউ ব্ল্যাকমেল করেনি, সেটা ওর বাপের ভাগ্য ভাল।

যদিও ডায়ানা এসব সাপোর্ট করে না। দুজনেই অ্যাডাল্ট, মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে শুয়েছে, ব্যাস। ভুলে যাও। ফের শোও অন্য কারও সঙ্গে। মিঞা বিবি রাজি তো কেয়া করেগা কাজী?

কিন্তু ব্ল্যাকমেল কেন? এটা ঠিক নয়।

গাড়িটা পার্কিং লটে ঢোকাল ডায়ানা। 

রিসর্টটা একটা কৃত্রিম জঙ্গলের মধ্যে তৈরি। বেশ নির্জন। লুকিয়ে দেখা করার জন্য আইডিয়াল। 

পার্কিং লটটা প্রায় কানায় কানায় ভর্তি। 

মুম্বাইতে কত সিক্রেট কাপল রে বাবা! বাড়িতে লুকিয়ে কত লোক যে প্রেম করে, তা এইসব জায়গায় না এলে জানা যায় না।

গাড়ি লক করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ডায়ানা। পৃথিবীটা যেন উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। 

গাড়ি লক করার অবশ্য দরকার ছিল না। এখানকার সিকিউরিটি গার্ডরা ওকে চেনে। ফ্যাশন ম্যাগাজিন আর পেজ থ্রিতে ওর ছবি তো হামেশাই বেরোয়। সিনেমার হিরোইনদের সঙ্গে। এখন কে অ‍ার অরিজিনাল? সবই তো সিনথেটিক।

রিসর্টের ভেতরে পা রাখতেই মেসেঞ্জারে বিপ শব্দ। 

রজতের মেসেজ ভেসে উঠল স্ক্রিনে – তোমায় আজ খুব সুন্দর লাগছে, মন আমুর।

ডায়ানা হাসল। রজত প্রায়ই এই ফ্রেঞ্চ শব্দগুলো ব্যবহার করে। 

মন আমুর মানে মাই লাভ। 

তার মানে রজত কি দূর থেকে ওকে দেখেছে? 

ডায়ানার খুব ইচ্ছে হলো জানতে। কিন্তু ওদের নিয়ম হলো ওয়ান-ওয়ে কমিউনিকেশন। 

ডায়ানা কখনো রিপ্লাই দেবে না। সম্পর্ক শুরুর সময় থেকেই এই নিয়ম। রজত বলেছিল, ওর বউ নাকি ওর ফোন চেক করে। সব সময় সন্দেহের চোখে দেখে। 

কী সন্দেহবাতিক মহিলা রে বাবা! এইসব মহিলারাই স্বামীদের পেছনে প্রাইভেট গোয়েন্দা লাগায়। কে জানে রজতের পেছনেও লাগিয়ে রেখেছে কি না। তাতে অবশ্য ডায়ানার কিছু অ‍াসে যায় না। রজতের বিয়ে ভাঙলে ডায়ানার কী? এমন দু-চারটে বিয়ে ও অ‍াগেও ভেঙেছে। 

ডায়ানা ভাবল, আজ কি রজত বউয়ের জন্য কোনো গিফট কিনবে? নাকি সব আমার জন্য?

উত্তেজনায় ডায়ানার বুক দপদপ করছে। গিফট পেতে ওর খুব ভাল লাগে।

আগের সব দামী গিফটের কথা মনে পড়ছে। 

আজ কী অপেক্ষা করছে ওর জন্য? 

হীরের নেকলেস? নাকি সলিটায়ার? 

আবার ফোনটা বেজে উঠল। ফের ভেসে উঠল মেসেজ – ফরেস্ট সাইডে এসো। আমি সেখানে ওয়েট করছি। কিস। 

টিপিক্যাল রজত-মার্কা মেসেজ। শেষে ওই একটা শব্দ – কিস। 

রজতের মেসেজ দেখলেই চেনা যায়।

রিসর্টের পেছনের দিকটায় ঘন জঙ্গল। লম্বা লম্বা গাছ। কেমন গা ছমছম করে।

গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ডায়ানা সেই জঙ্গলে পা রাখল। কোথায় লুকিয়ে রয়েছো বাবা তুমি? উফ, লোকটা রহস্য জমাতেও জানে।

জায়গাটা একদম জনমানবহীন। 

ডায়ানা হাসল, রজত কি আজ ওপেন-এয়ার সেক্স চাইছে নাকি? কিছু বিশ্বাস নেই। ওর মাথায় নিত্য নতুন সব অ‍াইডিয়া খেলে।

বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। বুক ভরে শ্বাস নিল ডায়ানা। ফ্রেশ অক্সিজেন। 

রজত কোথায়? 

হঠাৎ ডায়ানার মনে হলো গাছের অ‍াড়ালে, পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। 

এই নির্জনতাটা যেন একটু বেশিই থমথমে। 

ও ঘাড় ঘোরাতে গেল। কিন্তু পারল না। 

তার অ‍াগেই গ্লাভস পরা, দুটো শক্তিশালী, পেশীবহুল হাত ওর গলাটা এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরল যে মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। বেশি সময় লাগল না। 

ডায়ানা বাঁচার জন্য অ‍াপ্রাণ হাত-পা ছুঁড়ল। কিন্তু বৃথা গেল সেই চেষ্টা।

আততায়ীর শক্তি ওর চেয়ে অনেক বেশি। 

কিছুক্ষণের মধ্যেই ডায়ানার নিথর দেহটা একটা বিশাল বটগাছের নিচে লুটিয়ে পড়ল। রজতের দেওয়া সেই দামী রোলেক্স ঘড়িটা ধস্তাধস্তির সময় হাত থেকে ছিঁড়ে গেছিল। সেটা পাশে পড়ে রইল। 

ঘড়ির কাঁটা তখন থমকে আছে এগারোটা বত্রিশে। 

ডায়ানার জীবনের শেষ সময়টা যেন ফিক্স করে রেখে দিল ওটা। চিরকালের জন্য।

গল্পটি ভালো লাগছে? পরের পর্ব পড়ুন:

পরবর্তী পর্ব: চ্যাপ্টার ১: দ্য রেড লাইট সিক্রেট →

Leave a Comment