রবিবার, দুপুর ১২.১২, কলকাতা
জ্যাকির অফিসে পিজি পৌঁছেছে মিনিট দশেক আগে। অফিসটা বড্ড বেশি জমকালো।
দশ তলা নীলচে কাচে ঢাকা বিল্ডিংয়ের বাইরে বড় করে লেখা – জ্যাকিস টাওয়ার।
টাকার গরমটা ইন্টেরিয়রেও উপচে পড়ছে।
যদিও প্রয়োজনের তুলনায় মানুষ কম।
তার মধ্যেও পিজি যে কটি মানুষ দেখল, তাদের সবাই মেয়েমানুষ। জ্যাকি লোকটা দেখা যাচ্ছে, নারী পরিবৃত হয়ে থাকতেই বেশি ভালবাসে।
পিজি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল, একেই বলে ওভারবেয়ারিং অপুলেন্স।
অাদতে কাজটা পাঁচ মিনিটের, কিন্তু এখানে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর ইচ্ছে অাছে পিজির। শুয়োরটার সব ঘাঁতঘোঁত না জানা অবধি এই জায়গা ছেড়ে নড়া যাবে না।
সাড়ে চার লাখ ওর বিদেশি ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে ঢুকে গেছে। ক্যাশ পঞ্চাশ হাজার একটি ব্যাগে ভরে ড্রাইভার তুলে দিয়েছে ওর হাতে।
জ্যাকি ওকে একটা সস্তা, সাধারণ দেখতে ল্যাপটপ থেকে একটা ভিডিও রিট্রিভ করতে বলেছে। কাজটা পিজির কাছে চাইল্ডস প্লে।
কিন্তু তার অাগে পুরো ব্যাপারটা ভালো করে বুঝে নিতে হবে।
পিজি একজন বয়স্ক মানুষের মতো গলার ভেতর থেকে হালকা একটা ঢেঁকুর তুলল।
এখানে আসার আগে নিজের ভোল পাল্টাতে ওর পাক্কা কুড়ি মিনিট সময় লেগেছে। মুখে হালকা মেক-আপ। মাথায় ধপধপে সাদা পরচুলা, ঠোঁটের ওপর পুরু সাদা গোঁফ।
ছিপছিপে শরীরের ওপর জ্যাকেটের নিচে এক্সট্রা প্যাড গুঁজে নিজেকে বেশ হৃষ্টপুষ্ট, থলথলে বানিয়েছে পিজি।
দেখলে মনে হবে সাড়ে চুয়াত্তরের কোনও বৃদ্ধ, যে একটা পা একটু টেনে হাঁটে।
পিজি ঠিকই করে এসেছে, কিছুক্ষণ অন্তর অন্তর ও ঢেঁকুর তুলবে আর অদ্ভুত সব শব্দ করবে যাতে জ্যাকি সেনের মতো ‘হাই-প্রোফাইল’ লোক বিরক্ত হয়।
শব্দ করে জ্যাকির মুখের ওপর বাতকর্ম করতে পারলে পিজি খুব খুশি হত।
কিন্তু ওটাতো যখন তখন অাসে না।
যাক, অাপাতত ঢেঁকুর তুলেই লোকটাকে ব্যতিব্যস্ত করে মারা যাক।
কী করতে হবে বল্ তো? পিজি বেশ বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল। একদম খিটখিটে বুড়োদের মতো গলা।
জ্যাকি ভুরু কুঁচকে বলল, ডিলিট হয়ে যাওয়া ডেটা রিকভার করতে পারবেন?
বোঝাই যাচ্ছে, জ্যাকি এমন একজন খিটখিটে বুড়ো হ্যাকারকে আশা করেনি।
ও হয়তো ভেবেছিল কোনো কমবয়েসি স্মার্ট ছেলে আসবে।
ঢেঁউ ঢেঁউ করে দুটো ঢেঁকুর তুলে পিজি বলল, আশা তো করি। দেখা যাক। তবে কাজ হয়ে গেলে অারও পাঁচ চাই। ওটা অামার অ্যাকাউন্টে না ঢুকলে যা ডেটা রিট্রিভ হবে, সব ফের এনক্রিপটেড হয়ে যাবে। পিজি আবার একটা ঢেঁকুর তুলল। এবার একটু বেশি শব্দ করে।
জ্যাকির চোখে পরিস্কার খুন দেখল পিজি। যাক মালটাকে যথেষ্ট রাগিয়ে দেওয়া গেছে।
ঠিক অাছে, তাই দেব। কাজটা কি এখনই করা সম্ভব? জ্যাকি রুক্ষভাবে জিজ্ঞেস করল।
পিজি একজন পাড়ার প্লাম্বারের মতো ঠোঁট উল্টে বলল, পেমেন্ট নিয়ে চিন্তা নেই রে। আগে রোগটা ধরতে দে। হার্ড ড্রাইভ যদি ব্যাডলি ড্যামেজড হয়, তাহলে আমার টুলস লাগবে। যন্ত্রপাতি ছাড়া তো হবে না।
ঢেঁউ ঢেঁউ ঢেঁউ করে এবার তিনটে ঢেঁকুর তুলল পিজি।
জ্যাকি ইন্টারকমে ফিসফিস করে কিছু বলল। একটু পরেই একটি সুন্দরী মেয়ে ঘরে ঢুকল। তার হাতে ল্যাপটপটা এমনভাবে ধরা যেন সে এই মাত্র কোনও ট্রফি জিতে ফিরেছে।
জ্যাকি মেকি ভদ্রতা মাখানো সন্দেশের মত গলায় বলল, তনুজা, এঁর সঙ্গেই তুমি কথা বলেছিলে। উনি এসেছেন।
তনুজা হেসে বলল, হ্যালো স্যার।
পিজি উত্তরে একটি ঢেঁকুর তুলে বলল, হ্যালো সিস্টার।
তনুজা অবাক হয়ে পিজির দিকে তাকিয়ে রইল। ফোনে সে যার সঙ্গে কথা বলেছিল, তার গলার সঙ্গে এই লোকটার চেহারার তো কোনো মিল নেই।
ফোনে গলাটা ছিল ইয়াং, আর এ তো রীতিমতো দাদু!
জ্যাকি তনুজার দিকে তাকিয়ে ভদ্রস্থ হাসি হেসে বলল, তনুজা, এই জেন্টলম্যানের জন্য একটু কফি আর স্ন্যাকসের ব্যবস্থা করো তো। জেন্টলম্যান? ইয়ার্কি হচ্ছে?
পিজি এবার ইচ্ছা করেই বিকট শব্দে একটা ঢেঁকুর তুলল।
ইস এর সঙ্গে যদি একটা বিকট শব্দে বাতকর্ম যোগ করা যেত?
পিজির পেছনটা নিশপিশ করতে লাগল।
তনুজা আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। ওদের এই অসহায় চাউনিটা পিজি বেশ এনজয় করছে।
মেয়েটা আড়চোখে বারবার পিজির অগোছালো পোশাকের দিকে তাকাচ্ছিল। পিজি সুযোগ বুঝে তনুজার দিকে তাকিয়ে একটা চোখ মারল।
তনুজা চমকে গেল। অার যাই হোক, একজন সত্তর বছরের বুড়োর কাছ থেকে সে এই দুষ্টুমি আশা করেনি।
সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, হয়তো মনে মনে এখনও মেলাতে চেষ্টা করছে সকালের সেই অল্পবয়সী গলার সঙ্গে এই বুড়ো হাবড়াটাকে।
জ্যাকি সেন অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, সময় লাগবে?
স্পষ্টতই জ্যাকি লোকটাকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। পিজি ঠিক এটাই চেয়েছিল। সকালের ওই ফোনটার পর থেকে ওর নিজের জ্যাকিকে সত্যি সহ্য হচ্ছে না। বিরক্তিটা মিউচুয়াল হওয়া দরকার।
পিজি ঘোলাটে চোখে জ্যাকির দিকে তাকিয়ে বলল, ঘণ্টা দুয়েক তো লাগবেই—যদি সব ঠিক থাকে। আর যদি ফেল করি, তাহলে বাড়ি গিয়ে যন্ত্রপাতি নিয়ে আসতে হবে। শোন্, এইসব কাজে তাড়াহুড়ো করলে হয় না। বলে সে আবার একটা লম্বা ঢেঁকুর তুলল।
একদম আনাড়ি প্লাম্বারের মতো অ্যাক্টিং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ও। আসলে পিজির কিচ্ছু লাগবে না। ও যা চেয়েছিল, পেয়ে গেছে। ল্যাপটপটা ওর হাতে। ডেটা বের করা ওর কাছে বাঁয়ে হাত কা খেল। কিন্তু তার পরের কাজটাই তো অাসল।
জ্যাকি এবার একটু নরম সুরে বলল, ওকে, ওকে, আপনি সময় নিন। আর কিছু লাগবে?
একটা ভালো ইন্টারনেট কানেকশন চাই। তোর ডেস্কটপ পিসি থেকে লাইনটা নিতে পারি?
শিওর, নিতে পারেন। বাট মিস্টার পিজি… জ্যাকি সেনের গলার স্বর হঠাৎ বদলে গেল। মুখে একটা শুকনো হাসি।
বল্। অাবার কী হল?
একটা কথা মনে রাখবেন। জ্যাকি থামল। শব্দ চয়ন করছে। জ্যাকি চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, পুরো ব্যাপারটা যেন সিক্রেট থাকে।
পিজি মাথা নাড়ল, ওটাই তো আমাদের রুল। আমরা ক্লায়েন্টের ডেটা দেখি না।
জ্যাকি বলল, ওর মধ্যে একটা ভিডিও থাকার কথা। আমি শুধু ভিডিওটা চাই। ওটা আমাকে হ্যান্ড ওভার করবেন আর সব ভুলে যাবেন। প্লিজ, এটা কিন্তু অ্যাসিওর করতে হবে।
পিজি হাসল, অামি পারফেক্ট জেন্টলম্যান। আমি টাকা পাব, আর পোঁদ ঘোরালেই সব ভুলে যাব।
মিথ্যা কথা বলল পিজি।
জ্যাকি সেনের মতো লোককে ধোঁকা দেওয়ায় কোনো মরাল অবলিগেশন বা নৈতিক দায়বদ্ধতা ওর নেই। কারও থাকার কথা নয়।
ও মনে মনে বলল, আমরা সব দেখিরে শুয়োর। সব ঝেড়ে দিই। আর এটা করি একটাই কারণে। আমরা রিস্ক নিতে পারি না। নিজের পশ্চাদ্দেশ বাঁচানোটাই আমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি। কাল যদি কোনও গন্ডগোল হয়, তখন আমি কী করব? ব্যাকআপ তো রাখতেই হবে, বাছাধন। এটা কালোধন, মানে ব্ল্যাক মানির যুগ।
পিজি ল্যাপটপটা বুট করল।
হঠাৎ ওর শরীরের ভেতর দিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। ঘোস্টলি সেনসেশন। কেন?
ইন্টারনেটে কানেক্ট করতেই ল্যাপটপের স্ক্রিন কেঁপেছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। তারপরেই স্থির হয়ে গিয়ে কালো হয়ে যাচ্ছে।
ল্যাপটপটা কি কোনও গোপন কথা বলতে চাইছে ওর সঙ্গে?
ঠিক প্রেতাত্মার মত ল্যাপটপের ভেতরে যেন কেউ বসে অাছে, যে কিনা ইন্টারনেটের কানেকশন পেলেই সক্রিয় হয়ে উঠছে। ল্যাপটপের মেন সিস্টেমকে অাড়াল করে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছে।
পিজির মনে পড়ল ও অনেকক্ষণ ঢেঁকুর তুলতে ভুলে গেছে। ঢেঁউ ঢেঁউ করে দুটো ঢেঁকুর তুলে অাপাতত ক্ষান্ত দিল পিজি।
মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, গণ্ডগোল, বিরাট গণ্ডগোল।
জ্যাকি হতাশ গলায় বলল, হবে না তাহলে?
পিজি বলল চিবিয়ে চিবিয়ে, হবে। তবে এই ল্যানের কানেকশনে হবে না। একটা মোবাইল চাই, তার ডেটা ইউজ করতে হবে। একটা মোবাইল পাওয়া যাবে?
জ্যাকি নিজের মোবাইল বাড়িয়ে দিল, এটা নিন, স্যার। এতে হবে?
যেন এটা কোনও ইস্যু নয়, এভাবে পিজি ব্যাপারটাকে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে জানাল, যা হোক একটা হলেই হল।
ঢেঁউ ঢেঁউ। দুটো খুশির ঢেঁকুর তুলল পিজি। জ্যাকির মোবাইলটা এত সহজে পাওয়া যাবে, তা ও ভাবতেই পারেনি।
এবার পিজি নিজের ল্যাপটপ বের করল ও জ্যাকির মোবাইল ডেটার সঙ্গে তা কানেক্ট করল।
এবার জমবে অাসল খেলা। জ্যাকি সেন, এবার থেকে তোমার ওঠা, বসা, হাগা মোতা, সব রেকর্ড হবে অদৃশ্য একটি জায়গায়।
তখনও পর্যন্ত পিজি জানে না, দু-হাজার কিলোমিটার দূরে একটি জঙ্গল ঢাকা পাহাড়ের অাড়ালে, একটি ওয়্যারহাউসে বসে অারও একজন ওই একই কাজ শুরু করে দিয়েছে কয়েকদিন অাগে থাকতেই।
