ভোর ৫.১৫
শব্দটা কোথা থেকে আসছে?
অ্যালার্ম ক্লক?
অাধো-অন্ধকার ঘরে শুয়ে মতিলাল মিস্ত্রী হাতের আন্দাজে স্নুজ বাটনটা খোঁজার চেষ্টা করলেন।
কিন্তু কম্বলের ওম ছেড়ে হাতটা বাইরে বের করতেই যেন মন চাইছে না।
উফ, কী ঠাণ্ডা রে বাবা? শেষ কবে কলকাতায় এমন ঠাণ্ডা পড়েছে?
ভোরের দিকে ঠাণ্ডাটা অারও জাঁকিয়ে পড়ে।
একটু পরেই মতিলাল বুঝলেন, ওটা অ্যালার্ম নয়, ফোনের রিংটোন। স্বপ্নের ভেতর নয়, অাসলে বাস্তবিকই ফোনটা বাজছে।
ফোনটা রিসিভ করলেন মতিলাল।
ঘুমজড়ানো গলায় বললেন, বলছি, মতিলাল মিস্ত্রী।
ওপাশে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইন্সপেক্টর রাঘব। গলাটা কাঁপছে উত্তেজনায়, স্যার, ফের একটা মেয়ের ডেডবডি পাওয়া গেছে। তিলজলা লেনের কাছে।
রাঘবের গলার কাঁপুনি মতিলালের ঘুমটা পুরোপুরি উড়িয়ে দিল।
বাইরে এত কুয়াশা যে বোঝা মুস্কিল এটা ভোর নাকি রাত এখনও কাটেনি?
তার মধ্যে শহরের বুকে আরও একটা লাশ?
খবরটার ধাক্কা সামলাতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিলেন মতিলাল।
বিড়বিড় করে বললেন, একটা ডেডবডি দেখতে হবে! এই ভোরে! কী কপাল করেছি রে ভাই।
মতিলাল সাধারণত এই সময় মর্নিং ওয়াকে বেরোন।
ফলে এমনিতেই ঘুমের শেষ স্তরে ছিলেন তিনি।
সেই করাণে রিংটোনটা প্রথমে মনে হয়েছিল অন্য কোনও গ্যালাক্সি থেকে আসছে।
আসলে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কোনও একটা অচেনা জায়গা, অদ্ভুত কিছু মানুষ, মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
বয়স বাড়লে ভোরে এই ধরণের হিজিবিজি স্বপ্ন রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। সেই স্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে রাঘবের গলাটা যেন তাঁর স্নায়ুর ওপর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল।
রাঘব বরাবরই কাজ-পাগল। ক্রিমিনালদের পেছনে দৌড়ানোই ওর একমাত্র নেশা, ফলে সে যে এই সাত সকালে কলকাতা শহরে একটা লাশ পেয়ে এতটা এক্সাইটেড হবে, তাতে অার অাশ্চর্য কী?
মতিলাল উঠে পড়লেন। হাত কাঁপছে না, গলার স্বরও এখন একদম স্বাভাবিক। ডিটেকটিভ চিফ হিসেবে তিনি নিজের কাজটা জানেন। ফোনটা রাখার আগে রাঘবকে ইনস্ট্রাকশন দিলেন, বাবুলালকে লোকেশনটা শেয়ার করে দাও। ওকে বলো দাও দশ মিনিটে রেডি হতে। দশ বললে ও বিশ মিনিট নেবে। আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে ওখানে পৌঁছাচ্ছি।
রাঘবের ফোনটা রেখেই মতিলাল এবার মতিলাল অন্য একটি মোবাইল বের করলেন। এটি বিক্রমের জিনিয়াস হ্যাকার ফ্রেন্ড পিজি ওরফে প্রকাশ গুপ্তের তৈরি করা। এন্ড টু এন্ড এনক্রিপটেড। নট ট্রেসেবল।
মতিলাল ফোন করতেই বিক্রম ধরে নিল।
মতিলাল বললেন, ভায়া, খুব খারাপ খবর অাছে।
বিক্রম বলল, কেন মতিবাবু, কী হয়েছে?
ফের শহরে লাশ পাওয়া গেছে। এবারেও ভিকটিম কিশোরী। কলেজ স্টুডেন্ট। অামি স্পটে যাচ্ছি। অাসবে নাকি?
বিক্রম বলেছিল, অবশ্যই।
মতিলাল বলেছিলেন, তাহলে তোমাকে যাওয়ার পথে তুলে নিচ্ছি।
বিক্রম বলেছিল, তার দরকার নেই মতিবাবু, অাপনাকে অনেকটা ফালতু ঘুরতে হবে। অামি পৌঁছে যাচ্ছি। লোকেশনটা বলুন।
মতিলালের ড্রাইভার বাবুলাল পার্ক স্ট্রিটের পুলিশ কোয়ার্টারের গ্রাউন্ড ফ্লোরেই থাকে। খাতায়-কলমে সে মতিলালের বডিগার্ডও বটে। যদিও দু-বছর পর রিটায়ার করতে চলা বাবুলাল আজও একটা রিভলভার ঠিকমতো ধরতে পারে না।
ডিটেকটিভ চিফ হিসেবে মতিলাল চাইলে আরও বেশি সজাগ, স্মার্ট বডিগার্ড পেতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজেই সেটা রিফিউজ করেছেন। বাবুলাল মানুষটি ভাল। নেহাতই ভুল করে পুলিশ ফোর্সে এসে পড়েছে।
গাড়ি চালাতে চালাতে বাবুলাল সারাক্ষণ তার সংসারের কথা বলে।
তার স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে, কাজের দিদি। বিশেষ করে বাবুলালের বাড়ির পরিচারিকা মনুদির গল্প মতিলাল যত শোনেন, ততই মুগ্ধ হয়ে যান। ভদ্রমহিলার স্বামী নাকি সরকারি চাকরি করে। কিন্তু লোকের বাড়ি ঘুরে ঘুরে কাজ করাটা নাকি ওই মহিলার নেশা। সারাদিন এক বাড়ির খবর অারেক বাড়িতে সরবরাহ করে বিভিন্ন বাড়ির মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি লাগানোটা হচ্ছে ওই মহিলার একমাত্র কাজ।
সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ।
এ জীবনে মতিলালের অার সংসার করা হল না। তিনি তাই বাবুলালের কাছে বাঙালির সংসার করার টেকনিকগুলো জানার চেষ্টা করেন।
একজন ডিটেকটিভ হিসেবে মতিলাল বিশ্বাস করেন, সব ইনফরমেশনই কখনও না কখনও কাজে লেগে যায়।
তাছাড়া মতিলাল ফ্রি মুভমেন্টে বিশ্বাস করেন। এমন কিছু ব্যক্তিগত কারণ আছে যা তিনি সবার কাছে ডিসক্লোজ করতে চান না। ফলে এই ধরণের এমার্জেন্সি ছাড়া বাবুলালকে তাঁর লাগে না। বাকি সময় তিনি নিজের মতো ট্যাক্সি বা বাসে যাতায়াত করেন। এখন তো অাবার অনলাইনে ক্যাবও বুক করে নেওয়া যায়।
টয়লেটে গিয়ে মতিলাল ফ্রেশ হয়ে নিলেন দ্রুত। ভেবেছিলেন দশ মিনিট লাগবে, কিন্তু কনকনে ঠাণ্ডা জলের জন্য পনেরো মিনিট পার হয়ে গেল সময়টা।
বাইরে তখনো অন্ধকার। পাখিদের কিচিরমিচির কেবল শুরু হয়েছে মাত্র।
ডিসেম্বরের সেই কামড়ানো ঠাণ্ডাটা বাতাসে মিশে বাইরের কুয়াশাকে অারও ভারি অার গম্ভীর করে তুলেছে।
কলকাতায় শীত অনেকটা সিনেমায় গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্সের মতো, আসে আর হুট করে চলে যায়। বলা ভাল লুকোচুরি খেলে শহরবাসীর সঙ্গে। কিন্তু এবার শীতটা শুরু থেকেই বেশ জাঁকিয়ে ব্যাটিং করছে। উইকেট ছেড়ে নড়ার কোনও লক্ষণই নেই।
গাড়ির কাছে বাবুলাল দাঁড়িয়ে ছিল। একটা স্যালুট ঠুকে ঘুম জড়ানো গলায় বিড়বিড় করল, তিলজলা লেন, স্যার?
মতিলাল প্রথমেই লক্ষ্য করলেন, মাফলার জড়ানো বাবুলালের মুখে কিছু একটা মিসিং।
বললেন, তোমার চশমা কোথায়, বাবুলাল?
প্রশ্নটা শুনে বাবুলাল বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
কাঁপতে কাঁপতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, স্যার, তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে ভুলে গেছি। খুব ঠাণ্ডা তো,,,
মতিলাল ছোট করে বললেন, চশমাটা নিয়ে এসো। তাড়াহুড়োর দরকার নেই, হাতে সময় আছে।
বাবুলাল যখন কোয়ার্টারের দিকে দৌড়াচ্ছে, মতিলাল পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললেন, মুখে একটু ঠাণ্ডা জল দিয়ে এসো, ভালো লাগবে।
ভালো লাগা বা খারাপ লাগা আসলে মানুষের হাতে থাকে না। সবটাই নেচারের খেলা। ভাগ্য সহায় থাকলে তবেই প্ল্যানমতো কাজ হয়।
বাবুলাল চশমা পরে নতুন কনফিডেন্স নিয়ে ফিরে এল।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে দিনের প্রথম মন্তব্যটি করল, স্যার, রাঘববাবু যা বলল, তাতে তো মনে হচ্ছে নির্ঘাত স্টোনম্যান ফিরে এসেছে।
মতিলালের কাছে কোনও সাড়া শব্দ না পেয়ে নিজেই অাবার বলল,
অামি সিওর, সেই লোকটাই আবার ফিরে এসেছে। নইলে এক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ডেডবডি?
ঠিক একইভাবে বাবুলাল গত মাসে পার্ক স্ট্রিটের একটা গলিতে এক ভিখারির নৃশংস খুনের প্রসঙ্গেও একই কথা বলেছিল।
যদিও পরে জানা গিয়েছিল, ফুটপাতে শোয়ার জায়গা নিয়ে বচসার জেরে ওই খুন হয়েছিল।
স্টোনম্যানের কোনও গল্প সেখানে ছিল না।
সত্যি কথা বলতে কী, মতিলাল এইসব আলোচনার মুডে ছিলেন না। স্টোনম্যান হোক বা না হোক, একটা মেয়ের বডি পাওয়া গেছে, এটাই এখন একমাত্র ফ্যাক্ট।
গাড়ি যখন স্টার্ট দিল, মতিলালের ফোনে আরও কিছু ইনফরমেশন এল। রাঘব লিখেছে, কলেজ স্টুডেন্ট, কাল রাত থেকে নিখোঁজ ছিল।
মতিলাল ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের চার্জ নেওয়ার পর গত দু-বছরে এই তিনশ বছরের পুরনো শহরে বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি।
১৬৯০ সালে জব চার্নক সুতানুটিতে যে ট্রেডিং পোস্ট বসিয়েছিলেন, তা ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ক্যাপিটাল হয়ে ওঠে।
১৯১১ সাল পর্যন্ত সেটাই ছিল রাজধানী। সেই বছরই মোহনবাগান খালি পায়ে খেলে ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়েছিল। যদিও রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে শিফট করার পেছনে এর কোনও যোগসূত্র ঐতিহাসিকরা খুঁজে পাননি।
মতিলাল অবাক হয়ে ভাবলেন, তিনি খুনের বদলে কলকাতার ইতিহাস নিয়ে ভাবছেন কেন? আসলে ইদানীং কলকাতার ইতিহাসের ওপর একটা বই পড়ছিলেন তিনি। শহরের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন কীভাবে বদলে যায়, সেটা নিয়ে একটা ইন্টারেস্টিং রিসার্চ আছে বইটাতে।
তিলজলা লেনের স্পটে যখন গাড়ি পৌঁছাল, রাঘব আর স্থানীয় পুলিশ অফিসাররা ছুটে এলেন।
রাঘব খাটো কিন্তু বেশ শক্তপোক্ত চেহারার ছেলে। স্যালুট দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে ধরল সে। ফিসফিস করে জানাল, বিক্রম স্যার এসে গেছে। উনি অাপনার খোঁজ করছিলেন।
মতিলাল ক্যাজুয়ালি বললেন, কোথায় বিক্রম?
রাঘব বলল, ডেডবডির কাছেই অাছে।
মতিলাল যেমনটা এক্সপেক্ট করেছিলেন, জায়গাটা বেশ নির্জন।
লাশ ডাম্প করার আদর্শ জায়গা। একটা ছোট পুকুর, কয়েকটা গাছ। দূরে কিছু মর্নিং ওয়াকার ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। এই ঠাণ্ডা অার কুয়াশার ভেতরেও কিছু নাছোড়বান্দা লোক তাহলে হাঁটতে বেরােয়?
ভোরের আবছা আলোয় দূর থেকে তাদের রেমব্রান্টের আঁকা ছবির মতো লাগছে।
মতিলালের দুই লেফটেন্যান্ট, রাঘব আর শেখর তাঁকে স্পটের দিকে নিয়ে চলল।
যেতে যেতে শেখর বলছিল, স্যার, একদম কপি-বুক মার্ডার। এক জায়গায় খুন করে অন্য জায়গায় লাশ ফেলে দিয়ে অামাদের কনফিউজ করার চেষ্টা করেছে।
মতিলালের মনে হচ্ছিল এটা যেন বহুবার দেখা কোনও সিনেমার সিকুয়েন্স।
কুয়াশা ঠেলে বিক্রম এগিয়ে এল, মতিবাবু, গুড মর্নিং।
মতিলাল হাত মেলালেন, গুড অার কোথায় হল, ভায়া?
বিক্রম জিজ্ঞেস করল, বডি কে প্রথম দেখল?
মতিলাল একই প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন।
তার অাগেই রাঘব একজনকে সামনে নিয়ে এল। নাম গোপাল। পেশায় খবরের কাগজ হকার। বয়সের ভারে একটু ঝুঁকে পড়লেও পিঠে পনিটেইল করা সাদা চুল আর দাড়িতে তাকে অনেকটা আমেরিকান অ্যাপাচি আদিবাসীদের মতো লাগছে।
লোকটা যদিও এই মুহূর্তে বেশ নার্ভাস।
মতিলাল তার পিঠে হাত রেখে আশ্বস্ত করলেন, ভয় নেই গোপালবাবু। কখন বডিটা দেখলেন?
গোপাল আমতা আমতা করে বলল, স্যার, হাতে তো ঘড়ি নেই। তবে টাইম একটা আন্দাজ করতে পারি। মঙ্গলের কাছ থেকে খবরের কাগজের কোটা নিয়ে ফেরার পথে অামি এখানে থেমেছিলাম।
মঙ্গল কে? বিক্রম জানতে চাইল।
গোপাল বলল, মেন ভেন্ডার স্যার। ভোর পাঁচটা নাগাদ পেপার নিয়ে এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি এখানে একটু মাইনাস করতে দাঁড়াই। বয়স হয়েছে তো, মিনিট তিনেক লাগে। এটা রোজকার অভ্যাস।
মতিলাল মাথা নাড়লেন, ভালো অভ্যাস। তা বডিটা কি সুসু করার আগে দেখলেন না পরে?
গোপাল থতমত খেয়ে বলল, মাইনাস সারা হয়ে গিয়েছিল স্যার, নইলে,,, বাকিটা আর সে বলল না। কিন্তু বোঝা গেল, বাকি সুসুটাও বন্ধ হয়ে যেত।
তারপর একটু থেমে গোপাল যোগ করল, খুব অন্ধকার ছিল তখনো। সাইকেলটা রেখে পুকুরের ওই গাছটার দিকে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় দেখি মেয়েটা বস্তার ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ভেবেছিলাম কোনও পাগল বসে আছে। একা ছিলাম তো, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তারপর সাহস করে একটু কাছে যেতেই রক্ত দেখলাম। মনে পড়ে গেল একমাস অাগের মার্ডারটার কথা। ঠিক এভাবেই তো বডি ফেলে গিয়েছিল। খবরের কাগজে পড়েছিলাম।
বিক্রম বলল, তারপর আপনি সোজা থানায় গিয়ে খবর দিলেন, তাই তো?
গােপাল মাথা নাড়ল, হ্যাঁ স্যার। থানা এখান থেকে তিন মিনিটের হাঁটা পথ। সাইকেলে ৩০ সেকেন্ড।
মতিলাল হাসলেন বিক্রমের দিকে তাকিয়ে। বললেন, লোকটা বেশ সাহসী। ইম্পর্ট্যান্ট উইটনেস। সবথেকে বড় কথা সবকিছুতেই মিনিট, সেকেন্ডের হিসেব রাখে।
তারপর মতিলাল ঘুরলেন শেখর ও রাঘবের দিকে, ওর সাথে টাচে থেকো। গোপালকেও বললেন, খুব ভালো কাজ করেছেন গোপালবাবু। জার্নালিস্টরা আসার আগেই আমরা পৌঁছে যেতে পারলাম শুধু আপনার জন্য। ভাগ্য ভালো কোনও ফটোগ্রাফার এখনও খবর পায়নি।
কথাটা শেষ হতে না হতেই একটা গাড়ি ওদের খুব কাছে এসে ব্রেক কষে দাঁড়াল ওদের সামনে।
ক্যামেরা হাতে এক ফটোগ্রাফার নেমেই চিৎকার শুরু করল, বডিটা কোথায়?
কেউ উত্তর দিল না। সে এগোতে চাইলে পুলিশ তাকে ঘিরে ধরল। লোকটাকে মতিলাল চেনেন। খুব বড় একটি কাগজের চিফ ফটোগ্রাফার।
সম্ভবত সেই ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বলল, চিফ, কিছু একটা করুন। আমি – সত্যবাদী যুধিষ্ঠির – থেকে আসছি,,, কাগজের নামটা নিয়ে হয়ত বোঝাতে চাইল ওরা ঠিক কতটা ক্ষমতাসম্পন্ন।
মতিলাল রাঘবকে বললেন, ওকে ফের ঠেলে ওর গাড়িতে তুলে দাও। ড্রাইভারকে বলো এখনই এখান থেকে বিদেয় হতে, নইলে আমি সবার সামনে ওর পেছনে এমন একটি কষিয়ে লাথি মারব যে ও অার সিটে বসে গাড়ি চালাতে পারবে না।
বলার অার দরকার হল না, ড্রাইভার নিজের কানেই মতিলালের সুললিত ভাষণ শুনতে পেল ও সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে স্টার্ট দিল।
তারপর যত তাড়াতাড়ি এসেছিল, তার থেকেও তাড়াতাড়ি চলে গেল জায়গাটা ছেড়ে।
বিক্রম হাসতে হাসতে বলল, প্রেসের সঙ্গে অাপনার প্রেম তো দেখছি জমে উঠেছে মতিবাবু?
মতিলাল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ খুকখুক করে হাসলেন, অার বোলো না ভায়া। অনেকে সন্দেহ করে এটা নাকি অামার নেগেটিভ প্রচার। সাধে কী অার ওরা উঠতে বসতে অামাকে গাল পাড়ে? কিন্তু ওরা অাসল জিনিসটা বোঝে না। একটা ক্রাইম সিনে কতরকম এভিডেন্স থাকে বলো তো? পায়ের জুতোর ছাপ থেকে শুরু করে, গাড়ির চাকার দাগ, কত কী। সেখানে এসে ভিড় জমালে হয়? যাকগে, তুমি ভায়া কী দেখলে বলো তো?
বিক্রম বলল, প্রোফেশনাল কাজ। গলায় লিগেচারের দাগ দেখা যাচ্ছে। ক্লিয়ার স্ট্র্যাংগিউলেশন। চোক করে মারা হয়েছে মেয়েটাকে। সম্ভবত ঘুমের মধ্যে। মনে হচ্ছে ঘুমের অাগে কড়া ডোজের কোনও সিডেটিভ ইউজ করা হয়েছে। অবভিয়াসলি সেটা হয়ে থাকলে বাড়ির কারও হাত থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ কোনও স্ট্রাগলের চিহ্ন নেই। সুরতহাল করতে এসেছে কামেশ্বর, তারও দেখলাম একমত।
মতিলাল হালকা শিস দিয়ে উঠলেন, এ তো ঠিক অাগের মার্ডারটারই মত। চলো যাওয়া যাক। মাঝখানে এই প্রেস পার্টি এসে সব ঘেঁটে দিল।
পুলিশের তাড়া খেয়ে গাড়িটা যখন চলে যাচ্ছে, ফটোগ্রাফার মতিলালের একটা ছবি তুলল।
মতিলাল তখন তাকে মাঝখানের আঙুল তুলে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, কীভাবে অাঙুলটার ঠিকঠাক ব্যবহার করা যায়।
ওই অাঙুলের ভঙ্গিতে হয়ত তিনি নিজের জাতের পরিচয়টাও দিচ্ছিলেন, অন্তত সেই ফটোগ্রাফারকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, তাঁর দলিত পূর্বপুরুষদের ওপর এতদিনের চলে অাসা অত্যাচারের কথা।
মতিলাল এসবে অভ্যস্ত। জন্মসূত্রে তিনি দলিত এবং ব্রাত্য হতে পারেন, কিন্তু নিজের মেধার জোরে আইপিএস হয়েছেন। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাথমেটিক্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার পর কোটা ছাড়াই এই চাকরি পেয়েছেন তিনি রীতিমত পরীক্ষা দিয়ে ও টপার হয়ে।
চাইলে ডক্টরেট করতে পারতেন, বিদেশের কলেজে প্রফেসর হতে পারতেন ভীমরাও আম্বেদকরের মতো।
কিন্তু তাঁর বাবা, যিনি একজন অশিক্ষিত রাজমিস্ত্রি ছিলেন, চেয়েছিলেন ছেলে পুলিশ অফিসার হোক। এই ইচ্ছের পেছনে একটাই কারণ, যাতে বছরের পর বছর ধরে উচ্চবর্ণের শোষণ ও অত্যাচার সহ্য করা একটা ক্ষমতাহীন পরিবার একটু ক্ষমতা পায়। শতাব্দীপ্রাচীন শত্রুদের উদ্দেশ্যে মনে মনে মতিলাল বললেন, উচ্ছন্নে যাও।
লাশের দিকে ওঁরা এগনোর অাগেই মতিলাল খেয়াল করলেন, রাঘব ও শেখর হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে অাসছে তাঁদের দিকে।
দূর থেকেই মতিলাল দেখলেন রাঘবের মুখটা রক্তাভ হয়ে উঠেছে। সে দৌড়ে মতিলালের কাছে এসে চাপা উত্তেজনায় ফেটে পড়ল, স্যার, একবার এদিকে আসুন।
মতিলাল বললেন, কী হয়েছে রাঘব?
তারপর রাঘব যা বলল, তা শোনার পর মতিলালের মনে হল পায়ের তলার মাটিটা সরে যাচ্ছে।
