নরকের দরজা – অ‍াগের কথা

খুন হয়ে গেলেও নিজের অভ্যাসটা কিন্তু বজায় রেখেছেন করুণাপ্রসাদ। তাই না? 

বিক্রমের প্রশ্নে খুকখুক করে নিজের স্পেশাল হাসিটা হাসলেন সাসপেন্ডেড ইন্সপেক্টর মতিলাল মিস্ত্রী। বললেন, একদম অ‍ামার মনের কথা বলেছো ভায়া। করুণার সাপ্তাহিক কলামের নাম ছিল নক, মক অ্যান্ড শক। অ‍ার এই সাপ্তাহিক কলামটাই ছিল ওর জনপ্রিয়তার আসল চাবিকাঠি। ১৯৮৬ সালে ফ্রি প্রেস এক্সপ্রেস শুরু হওয়ার পর থেকে এই কলামই ছিল ওর কাগজের প্রধান আকর্ষণ। যেভাবে ওকে খুন করা হয়েছে, তাতে এই থিমটাই তো রিফ্লেক্ট হচ্ছে। তাই না?

একটু অ‍াগেই ওরা দুজন ক্রাইম সিন থেকে বেরিয়ে এসে নিউজ রুমের ওপর ছ-তলায় ছাদের ক্যান্টিনে এসে বসেছে। 

মতিলালের একটু ঘনঘন কালো কফি খাওয়া অভ্যাস। বিক্রমের অ‍াবার ঠিক উল্টো। ও বরাবরই ফিটনেস ফ্যানাটিক। ফলে ক্যাফিন বিরোধী। 

বিক্রম বলল, উনি তো প্রথমে ইংরেজি খবরের কাগজ দিয়েই শুরু করেছিলেন?

মতিলাল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, এক্স্যাক্টলি। তারপর নিউজ পোর্টাল, আর তারও কিছুটা পরে ন্যাশনাল টিভি চ্যানেল। বলতে পারো এসবই ওর একক সাম্রাজ্য। তবে শুরুর দিকে ওর দাদার ইনভেস্টমেন্ট ছিল। পরে বোনকেও ডিরেক্টর বোর্ডে নিয়ে নেয়। অ্যাজ এ রেজাল্ট, ইট বিকামস ‍এ ভেরি লুক্রেটিভ ফ্যামিলি বিজনেস। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। পরের দিকে অ‍ারাম, বিরামের দিকে ঝোঁকটা অ‍ারও বেড়ে যায়, অ‍ার কী।

একটু অ‍াগে ওরা ক্রাইম সিনে যা দেখেছে তা মোটেও অবশ্য চোখের পক্ষে অ‍ারামপ্রদ নয়। 

জাঁদরেল ও নামজাদা এডিটর করুণাপ্রসাদ মুখার্জিকে কেউ একজন তার অ্যান্টি চেম্বারের ভেতরেই একেবারে বিচ্ছিরিভাবে নক-আউট করে দিয়েছে। 

লোকটা যেরকম অসহায় ভঙ্গিতে মরে পড়ে আছে, তাতে কে বলবে বেঁচে থাকার সময় এই লোকটাই হাতে সবার মাথা কাটত। এখন ওর নিজের অবস্থাই হয়েছে মাথাকাটা মুরগীর মত।

ওর মুখটা ছিল সিলিং-এর দিকে ফেরানো। অর্থাৎ খুনীর মধ্যে এমন অ‍াক্রোশ কাজ করেছে যে করুণার মরে যাওয়া নিশ্চিত করতে খুনী ওর ঘাড়টাকেও ধরে মটকে দিয়েছে।

চোখ দুটো প্রায় ঠিকরে বেরিয়ে আসছে কোটর থেকে। 

এমন মনে হতে পারে, মৃত্যুর ঠিক আগে সম্ভবত এমন ভয়ঙ্কর কিছু সে দেখেছিল যা ওকে চরম আতঙ্কিত করে তুলেছিল?

অথবা হয়তো চোখের মণিগুলো ওভাবে ফুলে উঠেছে গলায় প্রচণ্ড চাপ বা শ্বাসরোধের কারণেই?

দুপাশে হাত দুটো যেভাবে অসহায়ভাবে ছড়ানো তাতে মনে অ‍াসতে পারে অনেককিছুই।

কিন্তু যেটা চোখে পড়ার মত বিষয়, সেটা হল, সম্পাদক মহাশয়ের চোখের সেই বীভৎস চাউনির সাথে একটা অদ্ভুত সামঞ্জস্য রাখা হয়েছে শরীরের নিচের অংশেও। লোকটার প্যান্টের জিপ কেউ একটা খুলে দিয়ে ওকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে দিয়েছে। 

এই দৃশ্যটার মধ্যে এমন একটা উপহাস বা মকিং রয়েছে, যেন গোটা দুনিয়াকে সম্পাদক মশাই ব্যঙ্গ করছে ওর এই ভয়ঙ্কর মৃত্যুদৃশ্যের ভেতর দিয়ে।

মতিলাল কফিতে সেকেন্ড চুমুক মেরে মুখ দিয়ে এমন ভাবে অ‍াঃ বললেন, তাতে বোঝা গেল গোটা ঘটনাটায় তিনি বেশ পরিতৃপ্তি বোধ করছেন। 

বিক্রম বলল, কিন্তু মতিবাবু, একটা ব্যাপার কী খুব অদ্ভুত নয়?

কী বলোতো ভায়া? 

এই যে লাশের মুখের ভেতর গোঁজা রয়েছে মেয়েদের অন্তর্বাস, একটা গোলাপি লেসি প্যান্টি, আর গলায় ফাঁস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে স্বচ্ছ গোলাপি রঙের একটি ব্রা, এটা কি অন্য কোনও মানে ক্যারি করছে?

কথা শেষ করে বিক্রম ভুরূ কুঁচকে তাকাল মতিলালের দিকে।

মতিলাল পরিপাটি করে অ‍ারেকটা চুমুক মারলেন কফিতে, বুঝলে না ভায়া? লাস্ট সিনটা হচ্ছে গোটা বিশ্বকে শক দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ, ওর সাপ্তহিক কলামের যে থিম – নক, মক অ্যান্ড শক – সেই থিমটাকে খুনীরা এস্টাবলিশ করার চেষ্টা করেছে এই খুনের মধ্য দিয়ে। অ‍ার করুণাপ্রসাদের মত সেক্সুয়ালি পারভার্ট লোক অ‍ামি জীবনে অ‍ার একটাও দেখেছি কিনা সন্দেহ। ওর জীবনকাহিনী শুনলে তুমি চেয়ার থেকে পড়ে যাবে, ভায়া।

তাই?

অ‍ারে, তবে কী বলছি? সে ভায়া, বহুত কেচ্ছা। সব বলব পরে তোমাকে। তুমি ওর লাইফ হিস্ট্রি শুনলে তাজ্জব বনে যাবে।

বিক্রম বলল, মানে অ‍াপনি বলছেন, কিলারস ওয়ান্ট টু গিভ এ স্টেটমেন্ট?

রাইট ইউ অ‍ার, মাই ব্রাদার। একদম ঠিক পয়েন্টটাতে তুমি হিট করেছো। একটা জিনিস খুব পরিস্কার। এই পুরো খুনটা খুবই সুচিন্তিত। প্রিপ্ল্যানড। অ‍ামরা যাকে অ‍াইনের পরিভাষায় বলি ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার। 

অ্যান্ড দ্যাট ইজ হোয়াই ইট ইজ সো ওয়েল এক্সিকিউটেড? বিক্রম শেষে যোগ করল।

মতিলাল বললেন, ঠিক তাই। অনেকদিনের প্ল্যান ছাড়া এই মার্ডার হয় না কি? একজন সাংবাদিক আর এডিটর হিসেবে করুণা চিরকালই তার কলামের মাধ্যমে মানুষকে চমকে দিতে চেয়েছিল। হি লাভস ড্রামা। মোরওভার, হি ওয়ান্টস অ‍্যাটেনশন। কিন্তু বিশ্বাস করো, এর আগে আমি অনেক খুনের স্পট দেখেছি, কিন্তু মেয়েদের অন্তর্বাস দিয়ে এভাবে খুন করার বীভৎসতা আমার কাছে একদম নতুন। কিন্তু ফ্রি প্রেস এক্সপ্রেস-এর দাপুটে এডিটর-ইন-চিফ এবং মালিককে মারার জন্য ঠিক এই পথটাই কেন বেছে নেওয়া হল? এটা নিশ্চয়ই ভাবার মত বিষয়।

কথা শেষ করে কফিতে শেষ চুমুক মারতে গিয়ে মতিলালের মুখ কুঁচকে গেল, ধুস, শেষ? 

ঘুরে বসে ক্যান্টিনের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে একটা দাবড়ানি দিলেন, এই এদিকে শোন।

ছেলেটা প্রায় দৌড়ে এল, কী হয়েছে স্যার?

কী হয়েছে স্যার? মতিলাল ব্যঙ্গ করলেন, তোর মাথা হয়েছে, অ‍ার তোর মালিকের মুণ্ডু হয়েছে। এই ট্যালট্যালে ঘোড়ার মুতের মত কফিটার দাম কত?

ছেলেটা হাসতে দেখা গেল তার সামনের দুটো দাঁত নেই। সেভাবেই বলল, দশ টাকা, স্যার। 

মতিলাল মুখ কুঁচকে বললেন, দশ টাকায় অন্তত পাঁচটা চুমুক তো মারতে পারা উচিত? কী মনে হয় তোর? 

ছেলেটা ফের ফোকলা হেসে বলল, পাঁচ কেন স্যার, দশ চুমুক মারা উচিত। 

ওরে ব্যাটা। তুই তো খুব ধড়িবাজ। মতিলাল ফিক করে হাসলেন, তা তোর সামনের দুটো দাঁত কে মেরে ভেঙে দিল?

ছেলেটা মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, গ্রামে ফুটবল খেলতে গিয়ে একটা ছেলে এমন ট্যাকল করেছিল যে। ছেলেটা কথা শেষ না করেই মুখটা নামিয়ে নিল। বোঝা গেল এটা নিয়ে ওর একটা পার্সোনাল দুঃখ অ‍াছে।

মতিলাল বললেন, ঠিক অ‍াছে বুঝেছি। এই নে অ‍ামার কার্ডটা রাখ। অ‍াজ বিকেলে ডেন্টাল কলেজে যাবি। অ‍ামি বলে রাখব। গিয়ে ডাঃ সৌম্য রায়ের সঙ্গে দেখা করবি। নামটা মনে থাকবে তো? অ‍াচ্ছা, উল্টো দিকে নামটা লিখেও দিলাম। ও অ‍াউটডোরেই থাকবে। এই কার্ডটা ওর হাতে দিবি। ও সব ব্যবস্থা করে দেবে। ভয় নেই, কোনও টাকা লাগবে না। অ‍ারে এমন ফোকলা হয়ে থাকলে কোন‍ও মেয়ে তো তােকে বিয়ে করবে না। যাঃ, পালা।

বিক্রম চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে গোটা ব্যাপারটা উপভোগ করছিল। নানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু, সাসপেন্ডেড চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রীকে এইসব কারণেই ও এত পছন্দ করে।  এমন উদার হৃদয় পুরুষ ও জীবনে অ‍ার একজনই দেখেছে। ওর জিনিয়াস হ্যাকার ফ্রেন্ড, পিজি। ফলে এই তিনজনের মধ্যে পটে ভাল। একে অন্যের দরকারে সবসময় পাশে এসে দাঁড়ায়।

সকালে তাই মতিলালের ফোন পেয়ে অ‍ার দেরি করেনি বিক্রম। সোজা কা‍ওয়াসাকি চালিয়ে চলে এসেছিল ক্রাইম স্পটে।

যদিও এই কেসটাতে অফিসিয়ালি মতিলালের থাকার কথা নয়। তিনি কাজ করছেন মুখ্যমন্ত্রীর ডাইরেক্ট অর্ডারে। অ‍াজ সকালে মুখ্যমন্ত্রী শুদ্ধ সান্যালের দপ্তর থেকে পার্সোনাল ফোন এসেছিল মতিলালের কাছে। সেখানে তিনি মতিলালকে জানিয়েছেন, তদন্তের কাজ চালাতে হবে গোপনে। এটা ঠিকই যে ক্রাইম সিনে গেলে বা কাউকে জেরা করতে গেলে ঘটনাটা জানাজানি হবেই। সেক্ষেত্রে মতিলালকে কী বলতে হবে, তাও শিখিয়ে দে‍ওয়া হয়েছে। 

মতিলাল সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ে অ‍াপাতত গবেষণার কাজ করছেন। সেজন্যই এই ঘটনা নিয়ে খোঁজখবর চালাচ্ছেন।

মতিলাল এবার বিক্রমের দিকে ঘুরে বসলেন, আমার কী মনে হয় জানো তো ভায়া, খুনি ইচ্ছাকৃতভাবেই এই সূত্রগুলো রেখে গেছে। আমি ফরেনসিক টিমের জন্য অপেক্ষা করছিলাম, যদিও জানি তারা বিশেষ কিছু উদ্ধার করতে পারবে না। ময়নাতদন্তের রিপোর্টটাও দেখা দরকার, কিন্তু মৃতদেহের চোখে লেগে থাকা সেই চরম আতঙ্কের কারণটাই অ‍ামাকে ভাবাচ্ছে। তোমার কী মনে হচ্ছে?

বিক্রম মাথা নাড়ল, ঠিকই বলছেন অ‍াপনি। প্রথমে নক তারপর মক, আর শেষে, এই খুনের এই ভয়ঙ্কর ধরনেই লুকিয়ে আছে একধরনের শক। এই খুনের পেছনে রয়েছে অনেক দিনের পুরোন অ‍াক্রোশ, অ‍ার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষুরধার মস্তিষ্ক। রিভেঞ্জ অ্যান্ড প্ল্যান। একটা ব্যাপার পরিস্কার। একাধিক মানুষ জড়িত। নইলে এমন ব্যস্ত অফিসে, সকালবেলায়, স্বয়ং সম্পাদকের অ্যান্টি চেম্বারে ঢুকে, তাকে ধীরে সুস্থে মেরে, অ‍াবার ফের বেরিয়ে যাওয়া। নাঃ, বিক্রম মাথা নাড়ল, ভেতরের লোক জড়িত, মতিবাবু। নইলে এটা সম্ভব নয়।

জানি, ভায়া, জানি। মতিলাল সায় দিলেন, ভেতরের লোক জড়িত শুধু নয়, এদের ফ্যামিলি হিস্ট্রিটাও খুব গণ্ডগোলের। ফলে অনেকগুলো অ্যাঙ্গল রয়েছে এই মার্ডারের। কিন্তু অ‍ামাকে একটা জিনিসই ভাবাচ্ছে, জানো তো?

কী? 

ওর চোখের চাউনি। মৃত্যুর অ‍াগে ঠিক অ‍গে কী দেখেছিল করুণাপ্রসাদ? ওর চোখে এত ভয় কেন? যেন ভূত দেখার মত চমকে উঠেছে ও। মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে ও আসলে ঠিক কী দেখেছিল? সেটা কিন্তু অ‍ামাদের খুঁজে বের করতেই হবে। 

গল্পটি ভালো লাগছে? পরের পর্ব পড়ুন:

পরবর্তী পর্ব: ১. অ‍াতঙ্কের কারণ →