১. অ‍াতঙ্কের কারণ

পশ্চিমবঙ্গে বর্ষা নামার ঠিক আগে ভ্যাপসা গরম আর আর্দ্রতা মিলে মিশে শরীরে একটা অদ্ভুত চিড়বিড়ানি ধরিয়ে দেয়। হাওয়া নেই, একটা গাছের পাতাও নড়ছে না। বৃষ্টি কবে নামবে, তার কোনও ঠিক নেই।

কিন্তু সাতসকালের এই খুনের খবর রীতিমত ঝড় তুলে দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে। 

মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ঢোকার ঠিক আগে পুলিশ কমিশনার মতিলালের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে ডাকলেন, মিস্ত্রী।

ইয়েস স্যার।

আমি যা বলেছি, মনে আছে তো?

কমিশনারের অবসরের আর মাত্র দুমাস বাকি। দেখে মনে হচ্ছিল না তিনি খুব একটা স্বস্তিতে আছেন। 

কেরিয়ারের একদম শেষ প্রান্তে এসে এমন একটা আপদ আকাশ থেকে তাঁর কোলে পড়বে, সেটা তিনি ভাবেননি। 

এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই, গত কুড়ি বছরে পশ্চিমবঙ্গ এমন হাই-প্রোফাইল মার্ডার দেখেনি। অন্তত মতিলাল মিস্ত্রী গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর তো নয়ই। দায়িত্ব যখন নিয়েছিলেন, তখন মতিলালের বয়স ছিল তিরিশের কোঠায়, দেখতে দেখতে হাফ সেঞ্চুরি পার করে দেওয়ার পর নানা ধরনের বিতর্কের সূত্র ধরে প্রথমে মতিলালকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়। তার পরেই মতিলাল তাঁর পদত্যাগ-পত্র পাঠিয়ে দেন। যদিও তা এখনও অ্যাকসেপ্টেড হয়নি। 

এখানে ঘটনাটা অন্যধরনের। 

খুন হয়েছেন একজন এডিটর। তিনি এক সময় ছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এবং তাঁকে খুন করা হয়েছে তাঁরই নিজের অ্যান্টি-চেম্বারে। 

কিন্তু খুনের অস্ত্র? মেয়েদের দুটো অন্তর্বাস! 

খুনিদের সেন্স অফ হিউমার যে মারাত্মক সে বিষয়ে মতিলালের তো কোনও সন্দেহই নেই, পাশাপাশি খুনীরা বিশ্বকে বিশেষ কিছু একটা বলতেও চাইছে। 

মার্ডার সিনটা মতিলালকে অন্য একটা ইঙ্গিতও দিচ্ছিল। মরার আগে করুণাপ্রসাদ চরম আতঙ্কিত ছিলেন। 

কেন? কীসের এত ভয়? এছাড়া খুনের মোটিভ বা উদ্দেশ্যটা কী? তীব্র আক্রোশ বা প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা ছাড়া তো এমন খুন সম্ভব নয়।

পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে মতিলালের যাতায়াত নতুন কিছু নয়। একজন চিফ আরেকজন চিফের সাথে দেখা করতে এসেছেন, যদিও এই খুনের কারণটা বেশ চিপ বা সস্তা। কিন্তু এখন তো অ‍ার মতিলাল খাতায় কলমে চিফের পদে নেই। 

করুণাপ্রসাদ কেমন এডিটর ছিলেন মতিলাল জানেন না, তবে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জঘন্য প্রকৃতির, লম্পট এবং বর্ণবাদী। 

ঘোরতর লম্পট হিসেবে তিনি যথেষ্ট কুখ্যাতি অর্জনে সমর্থ হয়েছিলেন, কোনও মহিলাই তাঁর আশেপাশে নিরাপদ বোধ করতেন না।

মতিলালের যুক্তি অনুযায়ী এমন একটা মানুষ পৃথিবীতে থেকেই বা কী অ‍ার এমন উপকার করছিলেন?

এডিটর করুণাপ্রসাদ মুখার্জি আর মুখ্যমন্ত্রী শুদ্ধ সান্যাল, যাকে সবাই এসএস বলে চেনে, ছিলেন পুরনো বন্ধু। সত্তর দশকের সেই উত্তাল ছাত্র রাজনীতি থেকে তাদের পরিচয়। 

যদিও করুণা কখনও সক্রিয় রাজনীতি করেননি, উল্টে পরের দিকে নিজের কাগজ আর নক, মক অ্যান্ড শক কলামে পুরনো বন্ধুর বামপন্থী রাজনীতিকে তুলোধোনা করতেন নিয়মিত। 

তবুও তাঁদের সম্পর্ক টিকে ছিল। একই কলেজে পড়ার দিনগুলোতে কফি হাউসে এক কাপ ব্ল্যাক কফি ভাগ করে খাওয়ার সেই টান রয়েই গিয়েছিল দুজনের মধ্যে।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ঢুকে মতিলাল অ‍াবিষ্কার করলেন, মানুষটার বয়স একদিনে যেন বছর কুড়ি বেড়ে গেছে। দেখলে মনে হতে পারে, একজন খিটখিটে মেজাজের মানুষ গোমড়া মুখে বসে আছেন, যদিও অ‍াদপেই তিনি তেমন নন। 

ষাটের ওপর বয়স হয়েছে এমনিতেই। তার ‍ওপর মুখের কোঁচকানো চামড়া আর চোখের ক্লান্তি তাঁকে আরও বৃদ্ধ করে দিয়েছে। 

তাঁর পুরনো বন্ধু আজ অস্বাভাবিকভাবে মৃত, আর তাও এমন এক বিল্ডিং-এ যার কিনা উদ্বোধন তিনি নিজেই করেছিলেন বছর কুড়ি অ‍াগে। তখনও অবশ্য তিনি মুখ্যমন্ত্রী হননি, ছিলেন পুলিশমন্ত্রী।

সত্যি কথা বলতে কী, ওই বছরটা মতিলালের কাছেও স্পেশাল। 

ওই বছরই তিনি গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্ব নেন। 

অনেকেরই ভুরু কুঁচকে গিয়েছিল, শেষে মতিলাল মিস্ত্রী ডিটেকটিভ চিফ? 

মিস্ত্রী পদবিটা সাধারণত গুজরাটের হিন্দু গুর্জর সম্প্রদায়ের, যারা মুঘল অ‍ামলে কেল্লা, অ‍ার ব্রিটিশ অ‍ামলে রেলের ব্রিজ তৈরির জন্য মিস্ত্রী বা রাজমিস্ত্রীর কাজ করত। সেই অর্থে মতিলালেরও উচিত ছিল এক রাজমিস্ত্রীর উত্তরসূরি হিসাবে একই কাজ করে যাওয়া। 

তা না হয়ে কিনা একলাফে চিফ ডিটেকটিভ? করুণাপ্রসাদের মত লোকেরা রেগে যাবে না?

জন্মের পর থেকেই একটি জিনিস দেখেছেন মতিলাল – উচ্চবর্ণের মানুষের ঘৃণা অ‍ার সন্দেহ। 

সবথেকে বড় কথা তা মুখ বন্ধ করে সহ্য করতে হয়েছে মতিলালকে। অনেক প্রজন্ম পেরিয়ে অবশেষে তিনি পেরেছিলেন স্কুলে পৌঁছাতে। মতিলালের বাবার কথাই ধরা যাক। পাথর কাটার কাজে তিনি ছিলেন ওস্তাদ। অভাবের জন্য নিজে পড়তে পারেননি, কিন্তু হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ছেলের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন।

ছোটবেলায় মতিলাল মাকে হারায়। 

বাবা চাইলে কি আবার বিয়ে করতে পারতেন না? 

অনায়াসেই পারতেন। বাড়ির দিক থেকে চাপও ছিল।

কিন্তু ছোট্ট সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সেই পথে যাননি। 

রাতে যখন তিনি বাবার পাশে শুতেন, ছোট্ট মতির মাথায় হাত বুলিয়ে বাবা বলতেন, একদিন তোকে বড় পুলিশ অফিসার হতে হবে, তুই ইংরেজি বলবি। সবাই তোকে সেলাম ঠুকবে। 

এটা বলা মুস্কিল কেন ছেলেকে পুলিশ বানানোর প্রতি মতিলালের বাবার এত ঝোঁক ছিল?

তবে হ্যাঁ, বাবার মান রেখে মতিলাল ছিলেন পড়াশোনায় বরাবরই টপার। কিন্তু একটা অ‍ানপড় দলিত পরিবারের ছেলে পড়াশোনা শিখছে, এটা গ্রামের উচ্চবর্ণের লোকজনের সহ্য হতো না। সেই ঘৃণা মতিলালের পিছু ছাড়েনি পুলিশ ফোর্সে আসার পরও।

আইপিএস-এ টপ র‍্যাঙ্ক করার পর মতিলাল নিজের সাথে একটা গোপন চুক্তি করেছিলেন। 

উচ্চবর্ণের অপরাধীদের জন্য প্রয়োজনে তিনি আইনের বাইরে গিয়ে ব্যবস্থা নেবেন, কারণ সভ্যতার শুরু থেকে তারা দলিতদের ওপর যে অত্যাচার করেছে তাতে অ‍াইনের কোনও স্থান ছিল না, ফলে তার বদলা তাদের ভাষাতেই দিতে হবে। অন্তত যদি কিছুটাও ফেরত দেওয়া যায়।

মতিলাল ভোলেননি সেই দিনটার কথা। কীভাবে সম্পাদক করুণাপ্রসাদ মুখার্জি একবার তাঁর মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার বা বুদ্ধির দৌড় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারণ তিনি এক দলিত মিস্ত্রী-র ছেলে। 

করুণার তত্ত্ব ছিল সোজা-সাপটা, পুলিশ অফিসার হতে হলে তাকে উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি হতে হবে।

কেন?

করুণার যুক্তি ছিল খুব অদ্ভুত, ছোটলোকদের মাথায় অ‍াবার বুদ্ধি থাকে নাকি? হয়তো সেজন্যই কলামে লিখেছিলেন,  মিস্ত্রী-র ছেলের মাথায় তো ইট, বালি, পাথর বোঝাই। ও খুনী ধরবে কী করে?