চ্যাপ্টার ১: দ্য রেড লাইট সিক্রেট

বিক্রমের ঘুম এমনিতেই খুব পাতলা। ফলে মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে থাকলে‍ও বেডসাইড টেবিলে ভাইব্রেশন শুরু হতেই ওর ঘুম ভেঙে গেল।

স্ক্রিনে ভাসছে মতিলাল মিস্ত্রীর নাম। 

বিক্রম চাপা গলায় বলল, বলুন মতিবাবু, কী সংবাদ।

ভায়া, একবার অ‍াসতে পারবে নাকি? মতিলালের গলা শুনে মনে হতে পারে, এত রাতে কোনও একটা মজার কথা বলার জন্য উনি ফোন করেছেন।

কোথায় যেতে হবে? বিক্রম জিজ্ঞেস করল।

যেখানে তুমি কখনও যাও না ভায়া। খুকখুক করে নিজের স্পেশাল হাসিটা হেসে মতিলাল বললেন, সোনাগাছি। ওখানে একটি মেয়ে খুন হয়েছে। এই মেয়েটিকে অ‍ামরা ট্র্যাক করে ফেলেছিলাম। মনে পড়ছে? ওই ডাকাত দলের সঙ্গে মেয়েটার একটা কানেকশন ছিল। কাল সকালেই মেয়েটাকে ইন্টারোগেশনের জন্য তোলার কথা ছিল। কিন্তু তার অ‍াগেই ওকে মেরে দিল। অ‍ামি তাহলে তোমাকে তুলে নিচ্ছি?

ওকে, চলে অ‍াসুন। 

বিক্রম বিছানা ছেড়ে নামতে নামতে দেখল পাশের ঘর থেকে বিষ্ণু থাপা বেরিয়ে এসেছে। এক্স-কম্যান্ডো বিক্রমের সবথেকে সেরা ছাত্র ছিল এই বিষ্ণু। পরে নিজে যেচেই বিক্রমের ডিটেকটিভ এজেন্সিতে কাজ নিয়েছে। এখন বিক্রমের সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী। 

স্যার বেরোচ্ছেন? বিষ্ণুর গলায় এখনও সামান্য হিন্দি টান রয়ে গিয়েছে। 

বিক্রম বলল, হ্যাঁ, মতিবাবুর সঙ্গে যাচ্ছি এক জায়গায়। যদি খুব দেরি হয়ে যায়, তাহলে ফোন করব।

ওকে স্যার। দরকার হলে অ‍ামাকে ডেকে নেবেন। বিষ্ণু বলল।

সিওর, বলতে বলতেই বিক্রম শুনল বাইরে মতিলালের গাড়ি ঢুকছে। 

বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল, একটি ডাকাত দল ঘুম কেড়ে নিয়েছে পুলিশের। কলকাতা এবং তার অ‍াশেপাশের বড় বড় সোনার দোকান থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক, কিছুই বাদ নেই। 

তবে শেষ ব্যাঙ্ক ডাকাতিটায় গিয়ে গণ্ডগোল বেঁধে গেল, যখন ব্যাঙ্কের দারোয়ান, প্রৌঢ় ভগবানদাস ডাকাতদের হাতে বন্দুক তুলে দেওয়ার বদলে চালিয়ে দিল গুলি।

সেই গুলিতে অ‍াহত হল এক ডাকাত। শ্যামল। তার ঊরু ফুঁড়ে গুলি চলে যাওয়ার পর বাকি ডাকাতেরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিল ভগবানদাসকে।

কিন্তু গুলির শব্দে বাইরে লোক জমে যাওয়ায় বাকি তিন ডাকাত কাজ শেষ না করেই বোমা ছুঁড়তে ছুঁড়তে পালিয়ে গেল শ্যামলকে ফেলে রেখে।

কিন্তু তারপর এই ডাকাত দল সম্পর্কে তথ্য যোগাড় করতে গিয়ে যা জানা গেল, তাতে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল পুলিশের। জানা গেল এরা কেউই মোটেও সাধারণ ক্রিমিনাল তো নয়ই, বরং, একটি বড়সড় টেরর মডিউলের সঙ্গে এদের যোগাযোগ রয়েছে। এইসব ডাকাতির মাধ্যমে এরা যে টাকা সংগ্রহ করছে, তার পেছনে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা, বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। খুব স্বাভাবিকভাবেই তদন্তভার এসে পড়েছে চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রীর কাঁধে। ফলে তদন্তে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে বিক্রম ও পিজিকে।

বাইরে বেরোতেই মেঘ গুড়গুড় করে উঠল। একটা বিদ্যুৎ অ‍াড়াঅ‍াড়িভাবে চিরে দিল রাতের কলকাতার অ‍াকাশ।

একটা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে যাওয়ার পরেই বিক্রমের গায়ে পড়ল ঠিক তিন ফোঁটা বৃষ্টি।

গাড়িতে বসে হাঁক পাড়লেন মতিলাল, চলে এসো ভায়া, মনে হচ্ছে ভালই ঢালবে।

দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতেই বিক্রম দেখল, বাইরে ঝড় উঠে গেছে।

গাড়িতে বসে বিক্রম একবার ঘড়ি দেখল, রাত ঠিক দুটো। 

ওরা যখন সোনাগাছির গলিতে ঢুকল, ততক্ষণে ভালই বৃষ্টি নেমে গিয়েছে। রাস্তার জলে ভাসছে সস্তা, বাসী জুঁইফুল, ঘাম আর ডেসপারেশনের গন্ধ। 

এশিয়ার বিগেস্ট রেড লাইট এরিয়ার সরু, গোলকধাঁধার মতো গলিগুলো ভিজে চকচক করছে হঠাৎ শুরু হওয়া কলকাতার বৃষ্টিতে। 

কয়েকশো টাকার বিনিময়ে স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নিয়ন সাইনগুলো তখনও বিপবিপ করে জ্বলছে আর নিভছে নতুন কাস্টমারের অ‍াশায়। জমা জলে তার রিফ্লেকশনগুলো ঠিক যেন ছোপ ছোপ টাটকা রক্তের মতো দেখায়।

চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রী তার আনমার্কড এসইউভি থেকে নামলেন। 

একেবারে ম্যাথমেটিক্যাল প্রিসিশন মেনে রাস্তায় জমে থাকা একটা বড়সড় জল ভর্তি গর্ত সযত্নে এড়িয়ে গেলেন তিনি। 

মতিলালের সাদা শার্টটা একদম ক্রিস্প, ইস্ত্রি করা। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ মোটেও রিজিড নয়, বরং উল্টোটা। মুখের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, মতিলাল এখানে কিছু একটা মজার সন্ধান পেয়েছেন।

পাশের দরজা দিয়ে নামল বিক্রম।

যে শহরটা নিকোটিন আর ক্যাফেইনের ওপর ভর করে চলে, সেখানে মতিলাল চলেন পিওর ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট লজিকের ওপর। তিনি স্মোক করেন না। ড্রিঙ্ক করেন না। তিনি শুধু ক্রিমিনাল শিকার করেন।

কথায় কথায় তিনি বলেন, ক্রিমিনাল অ‍ার কৃমির মধ্যে অ‍ার তফাৎ কী? দুটোকেই মারতে হয়।

তবে মতিলাল যদি স্ক্যালপেল হন, বিক্রম তবে হাতুড়ি। তবে অত্যন্ত সাইলেন্ট একটা হাতুড়ি।

বিক্রমের গায়ে ফিটেড ব্ল্যাক ট্যাকটিকাল জ্যাকেট। মুখটা একটা আনরিডেবল মাস্কের মতো। এক্স-কমান্ডো, বর্তমানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তার ফিটনেস আর ডিসিপ্লিন রীতিমতো পানিশিং। হঠাৎ দেখলে মনে হতে পারে টার্মিনেটর সিনেমা থেকে অ‍ার্নল্ড শোয়্যারজেনেগার বেরিয়ে এসেছে।

ছাদের কার্নিশ, অন্ধকার কোণ, আর বন্ধ দরজাগুলো স্ক্যান করে নিল বিক্রম। এটা ঘটনা, বিক্রমের কোনও অস্ত্র লাগে না; তার শরীরটাই একটা লিথাল উইপন।

থার্ড ফ্লোর। রুম ফোরটি টু, বৃষ্টির শব্দের বুক চিরে মতিলালের নিচু, খসখসে গলা শোনা গেল। 

এসিপি রাকেশ অলরেডি ওপরে পৌঁছে গেছে।

রাকেশ, বিক্রম বিড়বিড় করে বলল, রাকেশ এতটাই ভালমানুষ যে মিথ্যে কথা বলার সময় ঘেমে যেত। ওকে তো সেই কলেজ থেকে দেখছি। খুব একটা বদলায়নি।

রাকেশ খুব ভাল ছেলে, ভায়া। মতিলাল বললেন, পুলিশে চাকরি করতে গেলে ওইসব ভালমানুষি চলে না। নার্ভাস হয়ে গেলেই ও ঘামে।

একটা ক্ষয়ে যাওয়া, কলোনিয়াল-যুগের ব্রথেলের দরজায় পৌঁছল ওরা।

সিঁড়ির ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে অ‍াছে লাল গেঞ্জি পরা একটা লোক, সম্ভবত ছুরি খেয়ে খেয়ে সারা গায়ে দাগ, পাহাড়ের মতো সাইজ—সরু সিঁড়িটা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে। 

লোকটার গা থেকে বেরোচ্ছে সস্তা দেশি মদের উৎকট গন্ধ।

লোকটা সেই মদের ঘোরে দুলতে দুলতে বাজখাঁই গলায় হেঁকে বলল, ওপরে পুলিশ অ‍াছে। এখন তো যাওয়া যাবে না, বা‍‍ওয়া।

মতিলাল মজার গলায় বললেন, অ‍ামরাও যে পুলিশ ভায়া। 

লোকটা গব্বর সিংয়ের মত হেসে বলল, অ‍ামি অত ফুলিশ নই যে যা খুশি বোঝাবে। যেতে হলে অ‍ামার লাশের ওপর দিয়ে যেতে হবে। হিঁক… একটা ঢেঁকুর তুলে দুটো হাত দুদিকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। 

বলার পরেই মতিলালের পালিশ করা জুতোর ঠিক এক ইঞ্চি দূরে একদলা লাল পানের পিক ফেলল সে।

মতিলাল বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে ভায়া এই কেসটা তুমিই পিক অ‍াপ করো। 

বলার সময় মতিলালের চোখের পলকও পড়ল না। কোমরে গোঁজা সার্ভিস পিস্তলের দিকে হাতও বাড়ালেন না তিনি। শুধু নিজের রিস্টওয়াচটার দিকে একবার তাকালেন।

বিক্রম এক পা এগিয়ে গেল।

একটা মাতালের সঙ্গে লড়াই করা যায় না, ফলে ওর মুভমেন্টটা একটা ছায়ার মত, ফিজিক্সের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো একটা ফ্লুইড কাইনেটিক সিকোয়েন্স। 

এক। বাউন্সারের গলায় একটা পাম স্ট্রাইক, এয়ারওয়ে পুরোপুরি শাটডাউন। 

দুই। হাঁটুর মালাইচাকির ঠিক পেছনে একটা সুইপিং কিক, দানবটার সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এক ঝটকায় নিচে। 

তিন। ক্যারোটিড আর্টারিতে একটা প্রিসিশন এলবো স্ট্রাইক।

বাউন্সারটা একটা বাতিল ন্যাকড়ার পুতুলের মতো স্যাঁতস্যাঁতে কংক্রিটের ফ্লোরে আছড়ে পড়ল। তার ভারী শরীরটা ইমপ্যাক্ট রেজিস্টার করার আগেই সে আউট কোল্ড। বোল্ড অ‍াউট।

টু পয়েন্ট এইট সেকেন্ডস, অজ্ঞান লোকটাকে টপকে যাওয়ার সময় মতিলাল খুকখুক করে হাসতে হাসতে জানালেন, তিন সেকেন্ডও লাগল না ভায়া। তুমি আগের চেয়ে ফাস্ট হয়েছ। এতো মনে হচ্ছে নতুন ডায়েটের ফল।

ফ্লোরটা একটু স্লিপারি ছিল, বিক্রম ক্যাজুয়ালি জবাব দিল, বোঝা গেল, তার ব্রিদিং প্যাটার্নে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। 

মতিলাল বললেন, লেটস গো।

পুরনো অ‍ামলের লাল সিমেন্টের বাঁধানো সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠার পর দেখা গেল হলুদ পুলিসী টেপ দিয়ে রুম ফোরটি টু কর্ডন করা। 

ভেতরে পোর্টেবল হ্যালোজেন ল্যাম্পের তীব্র আলোয় একটা জলজ্যান্ত দুঃস্বপ্ন ফুটে উঠেছে।

এসিপি রাকেশ চৌধুরী ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে মনোগ্রাম করা রুমালে কপালের ঘাম মুছছে। একসময় বিক্রমের ক্লাসমেট ছিল রাকেশ, ভাল ক্রিকেট খেলত। সিস্টেম এখন তাকে একটা খাঁটি ব্যুরোক্র্যাট বানিয়ে ছেড়েছে।

মতিলালের পাশে বিক্রমকে দেখা রাকেশ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, বলল, ওঃ ভিকি, তুইও এসেছিস স্যারের সঙ্গে। নার্ভাসভাবে মাথা নাড়ল রাকেশ, ইটস আ মেস।

সেটা তো গেস করতেই পারছি, বললেন মতিলাল।

ঘরটা একটা জেলের সেলের চেয়ে বড় নয়। 

নীচের দিকে একটা মরচে ধরা লোহার খাটের ওপর পুরু গদি পাতা, একটা কাঠের চেয়ার, আর একটা ফাটা আয়না। 

খাটের ঠিক ওপরেই একটা বছর পঁচিশের মেয়ের ডেডবডি। 

হ্যালোজেনের আলোয় তার স্কিনটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। চোখদুটো খোলা, একটা জমে যাওয়া আর্তনাদ যেন সেখানে আটকে আছে। গলার চারপাশে একটা গভীর, কালচে-বেগুনি রঙের লিগেচার মার্ক।

গ্যারোট ওয়্যার। কোনও তার জড়িয়ে ওর শ্বাসরোধ করা হয়েছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই বিক্রম মন্তব্য করল। 

মতিলাল মাথা নাড়লেন, ঠিক, অ‍ামারও তাই মনে হচ্ছে। মার্ডার ওয়েপন কি পাওয়া গেছে? সুরতহাল করার জন্য কামেশ্বর এসেছে?

রাকেশ বলল, মার্ডার ওয়েপন এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি স্যার। তবে কামেশ্বর এসেছে, পাশের ঘরে অ‍াছে। ডাকব?

মতিলাল বললেন, না, না। ডাকতে হবে না।

বিক্রম বলল, একটা জিনিস দেখেছেন মতিবাবু? ঘরে কোনো স্ট্রাগলের চিহ্ন নেই? যে বা যারা মেরেছে অ‍াইদার তারা প্রফেশনাল বা মেয়েটি তাদের চিনত। দরজা দিয়ে তাই খুনীরা স্বচ্ছন্দে ঢুকে এসেছে। মেয়েটিও ফাইট ব্যাক করার সময়টুকু পায়নি।

একজ্যাক্টলি, খাটের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলেন মতিলাল। 

বডিতে টাচ করলেন না। 

বললেন, মেয়েটি সম্ভবত কোনো লোকাল সেক্স ওয়ার্কার নয়। হাতদুটো দ্যাখো। ও নিজের বাড়ির কাজ করত। ডান হাতে রান্নাবান্না করার চিহ্ন রয়েছে।  জামাকাপড় দ্যাখো। খুব সাধারণ, এখানকার মেয়েদের মত, এক্সপেন্সিভ ডেনিম, ইমপোর্টেড স্নিকার্স এসব কিছুই নেই। 

বিক্রম বলল, মেয়েটা এখানে লুকিয়ে ছিল।

ঠিক বলেছো ভায়া। মতিলাল বললেন।

হঠাৎ বিক্রম আর মতিলালের ইয়ারপিসে একটা তীক্ষ্ণ, সিন্থেটিক গলা ভেসে এল।

টেস্টিং, টেস্টিং। ক্যান দ্য অ্যানালগ বয়েজ হিয়ার দ্য ডিজিটাল গড?

পিজি। 

কয়েক মাইল দূরে সল্টলেকের একটা ডার্ক, মাল্টি-মনিটর ফোর্ট্রেসে বসে এই জিনিয়াস হ্যাকার অলরেডি ওদের লোকাল নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েছে।

বিক্রম বেরনোর অ‍াগে পিজিকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিল। 

আন্ডারওয়ার্ল্ডে যে কিনা পিজি, অ্যাকাডেমিক দুনিয়ায় সেই মানুষটাই প্রকাশ গুপ্ত, আর হ্যাকার কমিউনিটিতে তাকে সবাই পিজি বা পারফেক্ট জেন্টলম্যান বলে চেনে।

উই হিয়ার ইউ, পিজি, বিক্রম নিচু গলায় বলল। কিছু পেলি?

আমি দু-মাইল রেডিয়াসের সব স্ট্রিট ক্যামেরা চেক করেছি, পিজি বলল, ঠিক চল্লিশ মিনিট আগে কেউ একজন একটা লোকালাইজড ইএমপি জ্যামার ডেপ্লয় করেছিল। এই ব্লকের প্রতিটা সিসিটিভির ডিজিটাল মেমরি পুরো ওয়াইপড আউট। খুনীরা কিন্তু রাস্তার পাতি গুন্ডা নয়। এরা নেটওয়ার্ক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বোঝে। ওহ, আর মতিবাবু কী বলছেন? ন্যাশনাল ডেটাবেস দিয়ে ভিকটিমের ফেসিয়াল রিকগনিশন পিং করছিলাম। এটা শোনার জন্য মতিবাবুর কিন্তু এবার একটা চেয়ার লাগবে।

আমি ভায়া ঘোড়ার মত, দাঁড়িয়ে থাকতেই প্রেফার করি, মতিলাল খুকখুক করে হেসে বললেন, টেল মি।

পিজি বলল, সিভিলিয়ান রেজিস্ট্রিতে কোনো ম্যাচ নেই। কিন্তু আমি ওর ডাইমেনশন, হাইট আর গেইট অ্যানালিসিস তিনটে ব্যাঙ্ক রবারির সিসিটিভি ফুটেজের সাথে ক্রস-চেক করলাম। 

ড্রামাটিক এফেক্টের জন্য পিজি একটু পজ নিল। তারপর বলল, ম্যাচ কনফার্মড। খাটে পড়ে থাকা ওই ডেডবডিটা? শি ইজ ইওর ঘোস্ট। ওই মেয়েটাই হচ্ছে সেই বোরখা পরা স্কাউট, যে গ্যাং-এর হিটের আগে ক্যামেরা ফিডগুলো কাট করে দিত।

পাজলের টুকরোগুলো একটা ভয়ংকর ক্লিকের সাথে জায়গামতো বসে যাচ্ছে। মতিলাল তাকালেন বিক্রমের দিকে, বললেন, পথের কাঁটা অ‍াগেভাগেই সরিয়ে দিল ওরা। বুঝতেই পারছিল অ‍ামরা মেয়েটাকে ট্র্যাক করে ফেলেছি।

রাকেশের দিকে ফিরলেন মতিলাল, শ্যামলকে অ‍ানা হয়েছে?

রাকেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, ইয়েস স্যার। ওকে পাশের ঘরে রেখেছি। এখনও কিছু জানাইনি।

বিক্রম বলল, সেটা ভালই করেছিস। এবার ওকে নিয়ে অ‍াসা যাক, কি মতিবাবু?

মতিলাল মাথা নাড়লেন, সিওর। লে অ‍াও শ্যামলকে।

মতিলালের নির্দেশে চারজন মিলে ধরে ধরে একটি ছোটখাটো চেহারার লোককে ঘরে ধরে নিয়ে এল। লোকটার কাঁধে, ঊরুতে বড় ব্যান্ডেজ। অপারেশন করে গুলি বের করে নেওয়া হয়েছে। 

চেহারাটা ছােটখাটো হলে কী হবে, শ্যামলের চোখমুখে কোনও ভয়ের চিহ্ন নেই।

শ্যামলই ছিল এই পাঁচজনের ডাকাত দলের লিডার। মেয়েটিও ছিল ওই পাঁচজনের দলে। তার দায়িত্ব থাকত শুধু রেইকি করা। তথ্য যোগাড় করা।

এখন শ্যামলের ডান কাঁধের ভারী ব্যান্ডেজটাই শেষ ডাকাতির একমাত্র সাক্ষী—ব্যাঙ্কের সাহসী সিকিউরিটি গার্ড ভগবানদাসের বুলেটের উপহার। 

শ্যামলের মুখের কালশিটে, টানা পুলিসি ইন্টারোগেশনের ফলে একদম ফাঁকা হয়ে যাওয়া চোখের দৃষ্টি দেখলে কেউ বলবে না যে ও একটা সময় ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল, তারপর একটা করাপ্ট সিস্টেম তাকে গিলে খেয়ে একজন রুথলেস ক্রিমিনাল হিসেবে উগরে দিয়েছে।

ঘরে ঢুকতেই শ্যামলের চোখ গেল বিছানার ওপর পড়ে থাকা মেয়েটির ডেডবডির দিকে।

তিন সেকেন্ডের জন্য ঘরে নেমে এল অ্যাবসলিউট সাইলেন্স। শুধু বাইরে টিনের চালে বৃষ্টির উন্মাদ ড্রামিং মনে করিয়ে দেয় রক অ্যান্ড রোলের কথা।

একী? বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল শ্যামলের অ‍ার্তনাদ।

ডুকরে কেঁদে উঠল ডাকাবুকো ডাকাত।

নন্দিনী! সে এত জোরে চিৎকার করে উঠল, মনে হল, গলা দিয়ে রক্ত আর থুতু যেন ছিটকে বেরোচ্ছে। নো! নো, নো, নো!

মতিলাল ও বিক্রম গোটা দৃশ্যটা নির্লিপ্ততার সঙ্গে দেখছিল। 

মতিলাল বললন, নন্দিনী তোমার সঙ্গে কলেজে পড়ত, তাই না শ্যামল? তবে ও তো শুধু তোমার স্কাউট ছিল না, তাই তো? শি ওয়াজ ইওর অ্যাংকর।

শ্যামল মেঝের নোংরা টাইলসের ওপর বসে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, আমাদের তো চলে যাওয়ার কথা ছিল… ব্যাঙ্কের পর… আমাদের কাছে এনাফ ছিল। ওরা যখন অ‍ামাকে ফেলে চলে যাচ্ছে, আমি ওদের বলেছিলাম নন্দিনীকে ছেড়ে দিতে! 

ওরা শুধু তোমাকেই ফেলে যায়নি, এখন নন্দিনীকেও মেরে দিল, বিক্রম জিজ্ঞেস করল, তার গলা নিচু কিন্তু কমান্ডিং, কে মারতে পারে? বিভূ? অজয়? নীরব? নিজেদের বাঁচাতে কে ওকে মারল বলে মনে হয়?

একটু চুপ থেকে শ্যামল ধীরে ধীরে বলল, এটা নীরবের কাজ…, ও নিজেকে ভগবান ভাবে। ও লুজ এন্ডস ক্লিন করে। ইভেন হার। ইভেন মাই নন্দিনী। হায় ভগবান, এও অ‍ামাকে দেখতে হল।

একে প্রিজন হসপিটালে ফেরত নিয়ে যাও, মতিলাল গার্ডদের অর্ডার দিলেন। 

শ্যামলকে নিয়ে বেরিয়ে যা‍ওয়ার পর, রাকেশের দিকে ফিরে বললেন, টুয়েন্টি ফোর আওয়ারস শ্যামলকে সুইসাইড ওয়াচে রাখবে। হি ইজ দ্য ওনলি থ্রেড। 

ঘরে সেই দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা ফিরে এল।

ট্র্যাজিক, ঘাড় মুছতে মুছতে রাকেশ বিড়বিড় করে মতিলালকে বলল, স্যার এখানে আর কিচ্ছু নেই। ফরেনসিক স্যুইপ করবে, কিন্তু যদি ওরা গ্যারোট আর জ্যামার ইউজ করে থাকে, তাহলে ফিঙ্গারপ্রিন্টও রেখে যায়নি বলেই মনে হয়।

অপরাধী সবসময় কিছু না কিছু রেখে যায়, বিক্রম সফটলি বলার সময় কাঁধ চাপড়ে দিল রাকেশের।

বলার পর আস্তে আস্তে খাটের চারপাশে হাঁটতে লাগল বিক্রম। 

তার চোখ ঘন জঙ্গলে ট্রিপওয়্যার স্পট করতে ট্রেইনড। 

ঠিক এই মুহূর্তে সে ক্রাইম সিনের মাইক্রোস্কোপিক ডিটেলস স্ক্যান করছে। 

কোঁচকানো বেডশিট। ঘাড়ের অ্যাঙ্গেল। ফ্লোরে ঘষা লাগার দাগ। সবকিছুই এখন গুরুত্বপূর্ণ। 

সে খাটের পায়ের কাছে এসে থামল।

পিজি, নিজের ইয়ারপিসে ট্যাপ করল বিক্রম। তুমি কি বললে মেয়েটি টেক স্কাউট ছিল? রেইকি করার কাজেই ওকে ব্যবহার করা হত?

অ্যাফার্মেটিভ। ওই ক্যামেরা ফিডগুলো কাট করত, পিজির গলা ভেসে এল।

বিক্রম হাঁটু গেড়ে বসল। সে ভিকটিমের সস্তা স্নিকার্স খুঁটিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল। 

ডানদিকের জুতোটা পারফেক্টলি ডাবল নট করে বাঁধা। কিন্তু বাঁদিকের জুতোর লেসগুলো খুব তাড়াহুড়ো করে গোঁজা, জুতোর টাং অস্বাভাবিকভাবে ফুলে আছে।

ও জানত ওরা আসছে, বিক্রম বিড়বিড় করল। ও পালাতে পারেনি। কিন্তু নন্দিনী জানত ওরা ওকে মেরে ফেলবে।

সে একজোড়া ব্লু ল্যাটেক্স গ্লাভস পরে নিল। অ্যাবসলিউট প্রিসিশনের সাথে সে হাত বাড়িয়ে বাঁদিকের স্নিকার্সের টাং-টা টেনে সরাল।

ভেতরে একদম গভীরে গোঁজা, গোড়ালির একটা ছোট্ট কাটা দাগ থেকে লাগা টাটকা রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে একটা ছোট, শক্ত আয়তক্ষেত্রাকার কার্ডবোর্ডের টুকরো।

বিক্রম সেটা বের করে হ্যালোজেনের কড়া আলোয় তুলে ধরল।

এটা কোনো লোকাল কারেন্সি নয়। কোনো নোটও নয়।

এটা একটা ফিজিক্যাল, ওল্ড-স্কুল রেলওয়ের টিকিট স্টাব। রক্ত মাখা বুড়ো আঙুলের ছাপে কিউআর কোডটা আংশিক ঢাকা পড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু গাঢ় কালো কালিতে প্রিন্ট করা ডেস্টিনেশনটা একদম পারফেক্টলি পড়া যাচ্ছে।

মতিলাল আরও এক পা এগিয়ে এলেন, বিক্রমের কাঁধের ওপর দিয়ে ডেস্টিনেশনটা পড়লেন। চিফ ডিটেকটিভের চোখদুটো সরু হয়ে এল, ব্যাপার কী ভায়া? 

ডেস্টিনেশন বারাণসী। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে কাশীতেই নিবাস ওদের। বিক্রম নীচু গলায় বলল, এই কিউ অ‍ার কোডের সঙ্গে কোনও রেলওয়ে স্টেশনের ডিজিটাল লকারের সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা এখন একমাত্র পিজি বলতে পারবে।

Leave a Comment