রবিবার, দুপুর ১২.১৪, মুম্বাই
সারিকা কনফিউজড। টোটাল কনফিউশন।
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
কিন্তু এটাই সত্যি। এই সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-তারা, মার্স, জুপিটারের থেকেও সত্যি।
সত্যি কথা বলতে কী, এর থেকে বড় সত্যি অার কিছু হয় না।
সরব মেহতা তার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
তাও আবার যেনতেন ভাবে নয়, একেবারে ধুলোয় গড়াগড়ি খেয়ে, ওর পায়ে মাথা রেখে মাফ চাইছে বেচারা। বারবার লিখেছে, ডার্লিং, অামাকে ক্ষমা করো। ক্ষমা করো। ক্ষমা করো।
খানিকক্ষণ আগেই সারিকার মোবাইলে সেই অবিশ্বাস্য মেসেজটা এসেছে।
সরব লিখেছে, ও যা করেছে তার জন্য ও খুব, খুব, খুবই লজ্জিত।
লিখেছে, সরি, বেবি! ওটা সিরিয়াস কিছু ছিল না, ওটা অাসলে একটা প্র্যাকটিক্যাল জোক ছিল। একটা প্র্যাঙ্ক! অামি দেখার চেষ্টা করেছিলাম তুমি অামাকে সত্যি কতটা ভালবাস।
প্র্যাঙ্ক? সত্যি! সরবটা পারেও বটে।
ওই একটা জোক-এর জন্য সারিকা সুইসাইড পর্যন্ত করতে যাচ্ছিল! ওর অবস্থা হয়ে গিয়েছিল জোঁকের মুখে নুন পড়ার মত।
সারিকা গুটিয়ে গিয়েছিল নিজের মধ্যে। চলে গিয়েছিল ডিপ্রেশনে।
অার সত্যিতো, হবে না? যে জিনিস ও পেয়েও হারাতে বসেছিল, তা হারানোর কষ্ট ও কাকে বোঝাবে?
যখনই ঘটনাটা মনে পড়ে, ওর গা কেমন গুলিয়ে উঠছে। উফ মিসাইল বটে একখানা। সারিকা এমন জীবন্ত মিসাইল জীবনে দেখেনি। হ্যাঁ, পর্নোগ্রাফিতে দেখা যায় বটে, কিন্তু তা কতটা ক্যামেরার কারসাজি, তা কে বলতে পারে?
সারিকার মনের অবস্থা এখন বেশ অদ্ভুত। খিচুড়ি মার্কা। একদিকে রাগ, অন্যদিকে অনুরাগ।
সরবের সঙ্গে কাটানো সেই সব গোল্ডেন মোমেন্টস-এর স্মৃতি চোখের সামনে নাচছে।
সারিকা ওর ভার্জিনিটি যখন হারায়, তখন ও ষোলো। অাই অ্যাম সিক্সটিন, গোয়িং অন সেভেনটিন – দ্য সাউন্ড অফ মিউজিকের সেই বিখ্যাত গান গুনগুন করে উঠল সারিকা।
তারপর থেকে একটার পর একটা গাড়ির ডিকে সারিকা সওয়ার হয়েছে ও, নির্বিচারে।
কিন্তু সরব?
নট এ সিঙ্গল ম্যান ওয়াজ লাইক সরব।
ওই একটা ব্যাপারে সরব এক্সেপশনাল।
সারিকা ওকে অার হারাতে চায় না। সব পুলিশ কেস ও ফিরিয়ে নেবে। ফিরিয়ে অানবে উদ্দাম ভালবাসার সেইসব মুহূর্তগুলো।
এখন সরব যখন নিজে থেকেই ফিরে আসতে চাইছে, তখন কেন ও ফিরিয়ে দেবে? ওর প্রিয় খেলনাটা ও আবার ফেরত পাবে।
সারিকার চোখে জল চলে এল। কেন কাঁদছে, তা ও নিজেও কাউকে বোঝাতে পারবে না। হয়তো খুশিতে? নাকি বোকা মেয়েদের এটাই স্বভাব?
সরব একটা লম্বা মেসেজ লিখেছে। সেখানে সে বারবার ক্ষমা চেয়ে লিখেছে, ডার্লিং, আমি তোমার ওপর জাস্ট একটু রেগে গেছিলাম। পুলিশে কমপ্লেইন তুলে নেওয়ার জন্য হাতে অনেক সময় পাবে, কিন্তু তার আগে চলো আজ কোথাও দেখা করি। সবার অাগে আমি তোমার হাসি মুখ দেখতে চাই।
সারিকা চোখের জল মুছতে মুছতে ফিসফিস করে বলল, আমিও তোমার ওটা দেখতে চাই সোনা। ওহ গড! আই অ্যাম সো হ্যাপি!
সারিকা বুঝল মিসাইলের কথা ভাবলেই ওর শরীর অবশ হয়ে আসছে। ও খুশিতে বিছানায় লাফিয়ে উঠল, একইসঙ্গে একটু স্মার্ট সাজার চেষ্টা করল।
আগের মতো একটু টিজ করতে চাইল সরবকে। তাই লিখল, ডার্লিং, পুলিশ তো হন্যে হয়ে তোমাকে খুঁজছে। মুম্বাইয়ে পা দিলেই তোমাকে ধরে ফেলবে। আমরা কোথায় দেখা করব? সিক্রেটলি?
সারিকা লুকিয়ে দেখা করতে চায় একটা বিশেষ কারণেই। শুধু দেখা করে তো লাভ নেই, ওটা তো নিরামিষ ভোজ। ওর চাই ফুল কোর্স মিল। মেসেজটা পাঠানোর সময় সে একগাদা ইমোজি জুড়ে দিল। ওই সব হাসিমুখ কার্টুনের আড়ালে ওর প্যাশন তখন দপদপ করছে আগুনের মতো।
এদিকে, ডায়ানাকে খতম করে ততক্ষণে স্যামি তার হোটেল রুমে ফিরে এসেছে। ল্যাপটপ খুলে সারিকাকে মেসেজ পাঠাচ্ছে সে।
নিজের পরিচয় কীভাবে গোপন রাখতে হয়, তা ও জানে।
এই কাজ তো অার প্রথম করছে না। সবরকমের সতর্কতা নিয়েছে স্যামি। ওয়েব ফুটপ্রিন্ট লুকোতে সে ওস্তাদ।
সে জাস্ট একটু লাক ট্রাই করছিল। ভাবেনি মেয়েটা এত সহজে টোপ গিলবে। এত বড় হাঁদা হবে!
স্যামি চটজলদি তার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গিয়ার শিফট করল। রজত কাপুর থেকে সে এখন আবার সরব মেহতা।
সে সারিকাকে লিখল, ডার্লিং, আন্ধেরি ইস্টে চলে এসো।
ওটাই ওদের ইউজুয়াল মিটিং পয়েন্ট। লিখল, আমি তোমাকে তুলে নেব। হয়ত অামার ড্রাইভার যেতে পারে।
স্যামি জানে এই মিশনটা খুব ক্রিটিকাল।
সরব মেহতার ছদ্মবেশ আর নেওয়া সম্ভব নয়। কয়েক ঘণ্টা আগেই সে ডায়ানাকে মেরে এসেছে। কে অার ওর সোনা মুখকে সাজিয়ে তুলবে নববধূর মত?
এতক্ষণে পুলিশ নিশ্চয়ই স্পটে পৌঁছে গেছে। তাই সে ঠিক করল, সরব মেহতার ড্রাইভার সেজে যাবে। মুম্বাই-পুনে হাইওয়েতে এমন অনেক নির্জন জায়গা আছে যেখানে সারিকার ডেডবডি আর এই চোরাই গাড়িটা—দুটোকেই একসঙ্গে ডাম্প করে দেওয়া যাবে।
সারিকার রিপ্লাই এল চোখের পলকে। লিখেছে, আই কান্ট ওয়েট ফর ইউ, ডার্লিং।
অাসলে ও লিখতে চেয়েছিল, মাই কান্ট ক্যান্ট ওয়েট ফর ইউ।
স্যামি দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মেয়েরা সত্যিই ক্রেজি। ওরা জীবন আর মৃত্যু—দুটোই ডেকে আনতে পারে। নিজের জন্য, অন্যর জন্য।
ফিসফিস করে স্যামি বলল, টাকাটা দিয়ে দিলে জীবনটা বেঁচে যেত বেবি। এখন তুমি নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনলে। যাকগে, তোমাদের মৃত্যুর জন্য তোমরাই দায়ী।
ডায়ানা তো ফালতু যেচে হাড়িকাঠে মাথা লাগাল।
এবার অাসছে সারিকা। এই কাজটা সেরে স্যামি মুম্বাইয়ের চ্যাপ্টার ক্লোজ করে দিতে চায়।
কলকাতায় ওর অনেক কাজ পড়ে অাছে। জ্যাকি সেনের পকেট যতক্ষণে না ও ফাঁকা করতে পারছে, ওর শান্তি নেই।
তবে তার অাগে এবেলাতেই মুম্বাইকে টা টা বাই বাই করতে হবে।
সারিকার এমন সবকিছুই আছে যা একজন পুরুষের কাম্য—আকর্ষণীয় কোমর, লম্বা পা, ছিপছিপে শরীর। কিন্তু স্যামির নজর ওসবে নেই।
ওর নজর শুধু টাকার দিকে। ঠিক যেমন জ্যাকি সেনের ক্ষেত্রেও। টাকাটাই আসল।
স্যামি যখন ওর পরের শিকারের দিকে নিশানা স্থির করে ফেলেছে, ঠিক তখনই মুম্বাইয়ের সেই রিসর্টের জঙ্গলে একজন সাব-ইন্সপেক্টর ডায়ানার হ্যান্ডব্যাগ চেক করছিল।
এই আধঘণ্টা হল পুলিশ রিসর্টে পৌঁছেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে তারা জানতে পারল একটি বিশেষ তথ্য।
গেটের সিকিউরিটি বলল, ম্যাডাম মোটামুটি রেগুলার আসতেন। ভাল টিপস দিতেন। গাড়ি পার্ক করে মাঝেমাঝেই জঙ্গলের দিকে হাঁটতে যেতেন। ওরা কিছু সন্দেহ করেনি, কাউকে দেখেওনি।
ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার এবং সাইবার সেলের প্রধান উদিত কাশ্যপ যখন এইসব পুছতাজ চালাচ্ছে, ঠিক তখন হঠাৎ একজন সাব-ইন্সপেক্টর দৌড়ে এল, স্যার, এটা দেখুন।
ভিজিটিং কার্ডটা হাতে নিয়ে চমকে উঠল উদিত।
ওটা তার বস, স্বয়ং মুম্বাই পুলিশ কমিশনারের কার্ড। তার ওপর ডায়ানা নিজেই অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় লিখে রেখেছে। আজ বিকেলে কমিশনারের সঙ্গে এই রিসর্টেই দেখা করার কথা ছিল মৃত মহিলার। কিন্তু তাহলে এত তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলেন কেন মহিলা?
মিটিং-এর কারণ উদিত ভাল করেই জানে। এটা সেই সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কেসটা, যেটা নিয়ে তোলপাড় চলছে।
এই কেসটা কদিন ধরে পুলিশকে নাজেহাল করছে।
উদিত দেখল তার হাতে অার কোনও উপায় নেই। ও সোজা ফোন লাগাল কমিশনারকে।
পুলিশ কমিশনার বাড়িতে লাঞ্চ করছিলেন।
তিনি বুঝতেই পারলেন, উদিত কোনও জরুরি দরকার ছাড়া এই সময় ফোন করবে না।
ইয়েস, উদিত, মুরগীর ঠ্যাং-এ একটা কামড় বসিয়ে বললেন কমিশনার।
স্যার, উই হ্যাভ আ সিচুয়েশন। উদিতের গলা উত্তেজনায় কাঁপছে।
কী হয়েছে?
ডায়ানা লামার নামে এক ভদ্রমহিলা… যিনি বিকেলে আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছিলেন সারিকা কেসের ব্যাপারে… আমরা ওঁর বডি পেয়েছি। কেউ ওঁকে খুন করেছে।
কমিশনারের হাত থেকে ঠ্যাংটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। দ্রুত বললেন, সে কী কথা? ডায়ানাই একমাত্র সাক্ষী ছিল। ওই ক্রিমিনালটার প্রস্থেটিক মেকআপ তো ডায়ানাই করেছিল। তোমরা সারিকার জন্য এক্সট্রা সিকিউরিটির ব্যবস্থা করেছ তো? মেয়েটার জীবন কিন্তু এখন ঘোর বিপদের মধ্যে রয়েছে।
ইয়েস স্যার, এসিপি উদিত চেঁচিয়ে সাব-ইন্সপেক্টরকে অর্ডার দিলেন, এই, এক্ষুনি সারিকাকে ফোন লাগাও। বলো বাড়ি থেকে এক পা-ও যেন না বেরোয়। আমরা ফোর্স পাঠাচ্ছি। না, না, লাইনটা আমাকে দাও, আমি নিজে কথা বলব।
লেখাটি ভালো লাগলো?
এই থ্রিলার মাল্টিভার্সকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাতে চাইলে সাপোর্ট করতে পারেন।
কীভাবে সাপোর্ট করবেন? →