মুম্বাই শহর কখনও ঘুমোয় না। আরব সাগরের আর্দ্রতায় মাঝেমাধে কেবল তার দম বন্ধ হয়ে অাসে।
অার সেই দমবন্ধ পরিস্থিতির ঠিক পরেই অাকাশ গা ঝাড়া দেয়। তখন অাবার বৃষ্টি থামতেই চায় না। চারদিক জলে জলময়। কিন্তু মুম্বই থেমে থাকে না। শীত, গ্রীষ্ম, ঝড়, বৃষ্টি … এখানে চব্বিশ ঘণ্টা টাকা ওড়ে।
ভারুচের একটি মধ্যবিত্ত বহুতলের চোদ্দ তলা।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের একটানা আওয়াজ। সেই শব্দের আড়ালে রোজির ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ল একটা ছায়া। নিঃশব্দে।
খুনির শ্বাসপ্রশ্বাস একেবারে স্বাভাবিক। কপালে ঘামের চিহ্ন নেই। পদক্ষেপে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। আপাদমস্তক কালো পোশাকে মোড়া। হাঁটাচলা একেবারে নিখুঁত, ঠিক যন্ত্রের মতো।
দরজা খোলার জন্য জোর খাটায়নি সে। বহুতলের অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ভেদ করেছে অত্যন্ত কৌশলে। নকল ডিজিটাল সংকেত ব্যবহার করেছে। সময় লেগেছে মাত্র চার সেকেন্ড।
মুখোশের অাড়ালে থাকা এই মানুষটির লক্ষ্য এখন রোজি।
ছাব্বিশের একটি নিষ্পাপ মেয়ে যে কিনা ভুল করে একটি বিবাহিত পুরুষকে বিশ্বাস করেছিল।
যে কোনও কঠিন কাজের সময়েও মুখে যার সবসময় হাসি লেগে থাকে, যে রোজির মনটা ভীষণ নরম বলেই বন্ধুমহলে সবাই ওকে পছন্দ করে। শত্রু বলে কেউ নেই, অন্তত কিছুদিন অাগেও ছিল না।
রোজি ঢোকার ঠিক পাঁচ মিনিট অাগেই মুখোশ পরা লোকটা ঢুকে পড়েছে রোজির ফ্ল্যাটে।
দেখে নিয়েছে একটি বেডরুমে শায়িত এক বৃদ্ধা। রোজির মা। তিনি দুর্বল, অশক্ত। তাঁকে নিয়ে ভাবার কোনও কারণ নেই।
রান্নাঘরের পাশের করিডরে একটি কাবার্ডের মধ্যে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা।
অন্ধকারের সাথে একেবারে মিশে গেছে। হাতঘড়ি দেখল। রাত একটা বেজে বাহান্ন। সময় একদম ঠিকঠাক।
বাইরে তালার শব্দ হলো। ভারী কাঠের দরজাটা খুলে গেল।
রোজি ভেতরে ঢুকল। ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে জুতো জোড়া খুলে রাখল। কাঁচের টেবিলের ওপর ছুড়ে দিল হাতের ব্যাগটা। ফাঁকা ফ্ল্যাটে ধাতব বকলসের আওয়াজটা গমগম করে উঠল।
কপালে হাত ঘষল রোজি। কেন জানে না সে ভীষণ ক্লান্তি অনুভব করছে। সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না, দশ ফুটেরও কম দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে একজন অনুভূতিহীন শিকারি, যার কাছে রোজি একটা টার্গেট মাত্র।
খুনি বন্দুক বের করল না। আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করলে শব্দ বা দাগ থেকে যায়। বুলেটে থাকে ব্যালিস্টিক প্রমাণ। রক্তে থাকে ডিএনএ। মক্কেল তাকে টাকা দিয়েছে ভূতের মতো গা ঢাকা দিয়ে কাজ করার জন্য। আর তাদের এই ভুতুড়ে সংস্থাটি শুধু তার মত ভূতেদেরই ভাড়া খাটায়।
অন্যদের মারার কাজে।
বন্দুকের বদলে পকেট থেকে সরু একটা স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জেকশন বের করল খুনি।
ভেতরে রয়েছে মারাত্মক এক কৃত্রিম রাসায়নিক। ফরেনসিক অ্যানালিস্টের চোখে এটা নিছকই এক আকস্মিক, মর্মান্তিক হৃদরোগ বলে মনে হবে।
শরীরে কোনো সুঁচ ফোটার দাগও থাকবে না। ধস্তাধস্তির চিহ্ন থাকবে না। খুনের প্রমাণও নয়। কেবল অল্পবয়সী একটা মেয়ের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যাবে অাচমকা।
এক গ্লাস জল খাওয়ার জন্য রান্নাঘরে ঢুকল রোজি। ফ্রিজের দরজাটা খুলতেই একটা ফ্যাকাশে, কড়া আলোয় ভরে গেল ঘরটা।
সময় লাগল ঠিক তিন সেকেন্ড।
খুনি নিঃশব্দে দূরত্ব কমিয়ে আনল। দস্তানা পরা একটা হাত সজোরে চেপে বসল রোজির মুখে।
শ্বাস নেওয়ার সুযোগটুকুও পেল না রোজি। ঠিক সেই মিলি-সেকেন্ডে গলার ধমনীতে চেপে বসল স্বয়ংক্রিয় ইঞ্জেকশন। শুধু একটা মৃদু হিসহিস শব্দ হলো।
অজানা আতঙ্কে রোজির চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে প্রাণপণ ধস্তাধস্তি করল। দমবন্ধ করা চামড়ার দস্তানাটায় পাগলের মতো খামচে ধরল তার আঙুলগুলো। কিন্তু ওই হাতের মুঠো যেন একেবারে লোহার সাঁড়াশি। লড়াইটা টিকল মাত্র দশ সেকেন্ড। তরল আগুনের মতো রাসায়নিকটা ছড়িয়ে পড়ল তার রক্তে। নিমেষে বিকল করে দিল হৃদযন্ত্রের সমস্ত স্পন্দন।
রোজির হাঁটু ভেঙে এল।
খুনি তাকে মাটিতে পড়তে দিল না। নিখুঁত দক্ষতায় তাকে আলতো করে শুইয়ে দিল মার্বেলের মেঝেতে। মাথায় যেন কোনো চোট না লাগে। তাহলেই ধস্তাধস্তির সন্দেহ দানা বাঁধতে পারে।
রোজির চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে গেল। ছাদের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। নাড়ির স্পন্দন উধাও।
ঠিক তিরিশ সেকেন্ড তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল খুনি। মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হতে কবজিতে দুটো আঙুল চেপে ধরল।
হৃদস্পন্দন শূন্য। নো পালস।
প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেছে। কাজটা খুবই সহজ ছিল।
এবার প্রমাণ মোছার পালা। গলার সূক্ষ্ম ফুটোটা অ্যালকোহল-মাখানো তুলো দিয়ে মুছে দিল খুনি। রাসায়নিকের কোনো চিহ্নই আর রইল না। রোজির হাত থেকে পড়ে যাওয়া জলের গ্লাসটা তুলে নিল। নিজের অদৃশ্য ছাপ মুছে ফেলে গ্লাসটা সন্তর্পণে রাখল রোজির ছড়িয়ে থাকা হাতের কাছে।
যেন মনে হয় হঠাৎ করেই মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছে।
যাওয়ার আগে একটা অত্যাধুনিক যন্ত্র বের করল খুনি। একটা বোতাম টিপতেই ফ্ল্যাটের স্মার্ট-হাবে বিদ্যুৎতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ল। ভেতরের সিসিটিভির গত দশ মিনিটের ফুটেজ সম্পূর্ণ মুছে গেল। ডিজিটাল তালার হিসেবও শূন্য হয়ে গেল।
রাত এগারোটা বেজে ছেচল্লিশ। ফ্ল্যাটের দরজাটা খটাস করে বন্ধ হলো। ছায়াটা উধাও। পেছনে পড়ে রইল শুধু একটা বন্ধ ঘর আর এক মর্মান্তিক মৃত্যু।
পুলিশকে ফোন করে ডেকেছিল সুহাসিনী। কারণ গত রাতে রোজির ফোন না পাওয়ার পর, ওরা বন্ধুরা পালা করে রোজির ফোনে কল করেছে। বারবারই ফোনটা ভয়েস মেলে ঢুকে কেটে গেছে।
এমন ওদের পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের জীবনে কখনও হয়নি।
ওরা তিন বন্ধু, সুহাসিনী, প্রিয়া ও তিউ গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছিল রোজির ফ্ল্যাটে।
ওরা যত না রোজিকে নিয়ে ভাবিত ছিল, তার থেকে বেশি ভাবছিল রোজির মাকে নিয়ে। হয়ত মাসীমার কিছু একটা হয়েছে, রোজি কি সেজন্য এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল?
এমন তো কখনও হয় না।
সকাল নটার মধ্যেই পুলিশ এসে প্রথম দরজা ভাঙে।
তার অাধঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক দল, চিকিৎসক আর উর্দিধারী পুলিশের সঙ্গে মিডিয়ার লোক, বন্ধু-বান্ধব ও অাত্মীয় স্বজনে ভরে গেল ফ্ল্যাটের ভেতর ও বাইরে। খবর পেয়েই ছুটে এলেন মন্ত্রী রাজেশ প্যাটেল। রোজি তাঁর ভাইঝি। রোজির মা তাঁর বৌদিও কার্যত মৃত্যুশয্যায়। রোজি ওর মায়ের দেখাশোনা করত। এত ভাল ছিল মেয়েটা।
মিডিয়ার সামনে অাবেগ ধরে রাখতে পারলেন না মিনিস্টার। কেঁদে বললেন, প্লিজ, এখন অামাদের ফ্যামিলির সামনে ঘোর দুঃসময়। প্লিজ ..।
ফ্ল্যাটে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল দেশমুখের সঙ্গে।
বসার ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন মুম্বাই ক্রাইম ব্রাঞ্চের ইনস্পেক্টর ফিরোজ দেশমুখ।
তাঁর রুক্ষ মুখে চিন্তার ভাঁজ। এই শহরে গত কুড়ি বছর ধরে অজস্র খুন দেখেছেন তিনি। রাগের মাথায় খুন, গ্যাং-ওয়ারের গোলাগুলি, ডাকাতি করতে গিয়ে খুনোখুনি। মানুষের হিংস্রতার এলোমেলো, নোংরা ছাপগুলো তাঁর খুব চেনা।
কিন্তু এটা সেসবের কিছুই নয়। তার থেকেও অনেক বেশি।
কী বুঝছেন? রোজির মৃতদেহ পরীক্ষা করতে থাকা প্রধান চিকিৎসকের দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন দেশমুখ।
আপনাকে কী বলব বুঝতে পারছি না, ইনস্পেক্টর, নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে তুললেন চিকিৎসক মহেশ কাম্বলি, বললেন, জোর করে ঢোকার কোনো চিহ্ন নেই। ধস্তাধস্তির প্রমাণ নেই। নখের ডগায় আত্মরক্ষার কোনো আঁচড় নেই। বিষক্রিয়া কিনা, তার রিপোর্ট আসতে কম করে তো এক সপ্তাহ লাগবে। তবে খালি চোখে দেখে যা বুঝছি? এটা মারাত্মক একটা হার্ট অ্যাটাক।
ছাব্বিশ বছরের সম্পূর্ণ সুস্থ একটা মেয়ে, বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল? দাঁতে দাঁত চেপে বললেন দেশমুখ।
তাঁর পুলিশি সত্তা অন্য কথা বলছে। তিনি তাই বিরক্ত গলায় বললেন, আপনি কাকতালীয়ে বিশ্বাস করেন, ডাক্তারবাবু?
কাম্বলি নরম গলায় বললেন, আমি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বাস করি, ইনস্পেক্টর। আর এই মুহূর্তে বিজ্ঞান বলছে, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু। তবে অনেক অস্বাভাবিক মৃত্যুকেও স্বাভাবিক বলে চালানো যেতে পারে। সেটা বোঝার জন্য তো অামাদের সময় দিতে হবে।
ফ্ল্যাটের স্মার্ট-হাবের সাথে ল্যাপটপ জুড়ে বসে থাকা সাইবার-ফরেনসিক অফিসারের দিকে ঘুরে তাকালেন দেশমুখ, ক্যামেরার কী খবর? দরজার লক?
ঘাড় নাড়ল অফিসার। চোখেমুখে চরম বিভ্রান্তি। বলল, এটাই সবথেকে অদ্ভুত ব্যাপার, স্যার। গতরাতে সিস্টেমে একটা ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশন হয়েছিল। মাইক্রো-ব্ল্যাকআউট। মাঝরাতের ঠিক দশ মিনিটের ডেটা পুরোপুরি গায়েব। মুছে ফেলা হয়নি। কাঁচা স্ট্যাটিক দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আর বায়োমেট্রিক লক বলছে, দরজার তালা খোলা হয়েছে খোদ মৃতের ডিজিটাল ছাপ ব্যবহার করে। এটাই প্রথম সন্দেহ যে কেউ ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল। ঠিক একটা ঘোস্টের মত সে তার প্রমাণ লোপাট করেছে।
মেঝে থেকে ছাদ অবধি টানা জানলার দিকে এগিয়ে গেলেন দেশমুখ। বাইরে ছড়ানো ছেটানো, কোলাহলমুখর মহানগরী। ভেতরে ভেতরে একটা মোচড় দিয়ে উঠল তাঁর। বন্ধ ঘর। দশ মিনিটের ডেটা গায়েব। আর একটা লাশ, যার মৃত্যুর কোনো কারণ নেই।
এটা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। কোনো রাগের মাথায় করা খুনও নয়। এটা একটা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এর নিখুঁত ধরনটাই তাঁকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। এর মানে, যে-ই এ কাজ করে থাকুক, সে একজন চরম পেশাদার। এমন এক শিকারি যে ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ বাইরে কাজ করে।
ফোনটা পকেট থেকে বের করলেন দেশমুখ। অনেকটা সময় একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন স্ক্রিনের দিকে। এই কেস তাঁর এক্তিয়ারের অনেক বাইরে। মৃত মেয়েটা শুধু সাধারণ কেউ নয়। সে রাজ্যের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালী মন্ত্রীর ভাইঝি।
প্যাটেল সাহেব ঠিক তাঁর পেছনেই বুকে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
একটা নম্বরে ডায়াল করলেন দেশমুখ। দু’বার রিং হতেই ওপার থেকে একটা ভারী, কর্তৃত্বপূর্ণ গলার স্বর ভেসে এল।
কমিশনার স্যার, গলাটা খাদে নামিয়ে বললেন দেশমুখ, বান্দ্রায় একটা সমস্যা হয়েছে। মিনিস্টার রাজেশ প্যাটেলের ভাইঝি রোজির ফ্ল্যাটে।
একটু থামলেন তিনি।
লাইনের ওপারে একটা দীর্ঘশ্বাস টানার শব্দ পেলেন।
মেয়েটা আর নেই, স্যার, গুরুগম্ভীর গলায় বলে চললেন দেশমুখ। আর আমাদের হাতেও কিচ্ছু নেই। কোনো আঙুলের ছাপ নেই, অস্ত্র নেই, মৃত্যুর কারণও নেই। সব ভোজবাজির মতো উধাও। স্যার… আমার মনে হয় এই কেসের জন্য স্পেশাল টিম দরকার। সাধারণ পুলিশি ব্যবস্থায় এই খুনি ধরা পড়বে না।
লাইনের ওপারে একটা লম্বা, চাপা নীরবতা। কমিশনার যখন কথা বললেন, তাঁর গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা শোনাল, অকুস্থল সিল করে দিন, ইনস্পেক্টর। আর কিচ্ছুতে হাত দেবেন না। আমি জানি ঠিক কাকে খবর দিতে হবে।
