অনলাইন স্টোর গোয়েন্দা বিক্রম, চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রী ও জিনিয়াস হ্যাকার পিজির যাবতীয় বড়দের ক্রাইম থ্রিলার এখন পাওয়া যাচ্ছে Notion Book Store -এ। বইগুলো দেখুন →

অফলাইন স্টোর কলেজ স্ট্রিটে সমস্ত বই এখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। বুক ফ্রেন্ড। ৮/১/বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, (মিত্র ঘোষের গলি, কফি হাউসের ঠিক পাশে)। ফোন - ৮৭৭৭৪২১১৪২

: দ্বিতীয় অধ্যায়: অফ-দ্য-বুকস কল

তৃতীয় অধ্যায়: ছায়াদের জমায়েত | শকুনের চক্কর

লোয়ার পারেলের একটা পরিত্যক্ত সুতোকলের অফিস। এটাই হবে ওদের অ‍াপাতত গোপন মিটিং প্লেস। 

স্যাঁতস্যাঁতে কংক্রিট, বিস্মৃত শিল্পের স্বপ্ন আর ইঁদুরের বিষ্ঠার গন্ধ ম-ম করছে। বাইরে মুম্বাইয়ের আর্দ্র বর্ষা মরচে ধরা লোহার গরাদে ধাক্কা মারছে। ভেতরে পরিবেশটা থমথমে। 

প্রচণ্ড শব্দে হাঁচলো পিজি। ধবধবে সাদা রুমালে নাক মুছল। মাথার ওপরের টিমটিম করতে থাকা টিউবলাইটের দিকে কটমট করে তাকাল।

দেওয়াল ফুঁড়ে যদি কোনো মিউট্যান্ট আরশোলা বেরিয়ে আমার মাদারবোর্ডটা খেয়ে নেয়, তাহলে নতুন যন্ত্রপাতির বিল আমি কিন্তু কমিশনারকে ধরাবো, টাইটানিয়ামের বাক্স থেকে একগাদা ফাইবার-অপটিক তার বের করতে করতে হেসে বলল পিজি। 

মরচে ধরা একটা ফাইলিং ক্যাবিনেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মতিলাল মিস্ত্রী। থার্মোফ্লাস্ক থেকে স্টিলের গ্লাসে সাবধানে গরম জল ঢাললেন। মেপে এক চুমুক খেলেন। এই নোংরা পরিবেশ নিয়ে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

মতিলাল বললেন, অ‍ারে এটা তো টেম্পোরারি। একটু গরম জলে লেবু চিপে খাও, ভায়া। এই জায়গাটার ভালো দিকটা ভেবে দ্যাখো তো। লোকাল মাফিয়ারা যদি আমাদের খুঁজতেও আসে, তবে অস্ত্র বের করার আগেই ধনুষ্টংকারে মারা পড়বে।

মুখ দিয়ে একটা শব্দ করল পিজি, ধুস, এই গন্ধটা অ‍ামাকে পাগল করে দেবে। 

তিনটে আলাদা কিবোর্ডে ঝড় তুলল ওর আঙুল। মনিটরগুলো জ্বলে উঠল। ভুতুড়ে নীল আলোয় ভরে গেল ধুলোয় মাখা ঘরটা। 

ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে বিক্রম চারদিক দেখছিল। বলল, মতিবাবু এমন খাসা জায়গাটা পেলেন কোথায় বলুন তো?

গুগল ম্যাপ ভায়া, হোয়েন দেয়ার ইজ পিজি, এভরিথিং ইজ ইজি। মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন।

জানলার দিকে এগিয়ে গেল বিক্রম। মরচে ধরা ছিটকিনিটা পরীক্ষা করল। তারপর পেছনের কাঠের দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, 

ঢোকার রাস্তা তিনটে। সামনের দরজাটা মজবুত, কিন্তু কবজাগুলো বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। পেছনের দরজার কাঠ পচে গেছে। ওপরের ছাদে ওঠার দরজার কাঠামোটাও নড়বড়ে। পেছনের দরজাটায় ফাঁদ পাততে আর ছাদের দিকে নজর রাখার জায়গা বানাতে আমার দশ মিনিট সময় লাগবে।

টাইপ করা থামাল পিজি। রিমলেস চশমার ওপর দিয়ে বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বলল, ভিকি, আমরা এখানে একটা খুনের তদন্ত করতে এসেছি। যুদ্ধ করতে নয়। কি মতিবাবু, তাই তো?

মতিলাল মুচকি হেসে বললেন, এটা তোমরা দুই বন্ধু সেটল করো। অ‍ামি এর মধ্যে নেই।

বিক্রম বলল, মতিবাবু অ‍ার অ‍াগের মত ভালমানুষ নেই।

মতিলাল বললেন, কেন ভায়া? কেন একথা বলছো?

বিক্রম বলল, পিজিকে বলেই দিন না – অ‍ামাদের প্রতিটি খুনের তদন্ত তো শেষমেষ যুদ্ধেই পরিণত হয়।

মতিলাল বললেন, তা ঠিক, তা ঠিক। এই মেয়েটার কথাই ধরো, ডার্ক ওয়েবে কে এবং কেন এমন সাতে-পাঁচে না থাকা মেয়েকে মারতে যাবে? ভাই পিজি, তুমি কি লোকাল নেটওয়ার্কের দখল পেয়েছ?

নেটওয়ার্ক, ট্র্যাফিক ক্যামেরা আর শহরের নিকাশি ব্যবস্থার ম্যাপ, সবই পেয়েছি। যদি বিক্রম মাটির তলা দিয়ে হামলা চালাতে চায়, সেইজন্য আর কী, হাতদুটো ঝড়ের বেগে চালানার ফাঁকে হাসতে হাসতে জবাব দিল পিজি।  

সেইসঙ্গে একনিঃশ্বাসে বলল, কমিশনার আগরওয়াল যদিও ব্যাকডোর খুলে দিয়েছেন, তবে অ‍ামি একটা অন্য রাস্তায় রোজির ফ্ল্যাটের সিকিউরিটি মেইনফ্রেমে ঢুকে পড়েছি।

বিক্রম মুচকি হেসে মতিলালকে বলল, দেখলেন তো, সোজা পথ থাকলেও পিজি কেমন ব্যাঁকা রাস্তা ধরে?

হাসতে হাসতে পিজির যন্ত্রপাতির পাশে একটা চেয়ার টেনে বসলেন মতিলাল। 

একটু দাগ-ধরা সাদা দেওয়ালে প্রজেক্টরের সাহায্যে রোজির ফ্ল্যাটের ছবিগুলো ফুটিয়ে তুললেন। মার্বেলের মেঝেতে পড়ে থাকা মেয়েটার লাশের ছবিটাই ঘরের পরিবেশ বদলে দিল।

বিক্রম কাছে এগিয়ে অ‍াসতে মতিলাল বললেন, কী মনে হচ্ছে ভায়া। তোমার তো দেখার চোখই অ‍ালাদা। আমাকে ঘরের জ্যামিতিক নকশাটা একটু বোঝাও তো। আমাদের ওই ঘোস্ট কিলারের ব্যাপারে বলো।

মৃতের উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি, বলতে শুরু করল বিক্রম, ডাক্তার গলার নিচে কোনো আঘাতের চিহ্ন পায়নি। তার মানে রাসায়নিক ঢোকানোর জন্য খুনিকে মেয়েটাকে টেনে নিচে নামাতে হয়নি। খুনী সোজা দাঁড়িয়েই ইঞ্জেকশন দিয়েছে।

ডান হাত তুলল বিক্রম। দূরত্ব মাপল। বাঁ হাত দিয়ে মুখ চাপা দেওয়া আর ডান হাত দিয়ে নিখুঁতভাবে গলার ধমনীতে ইঞ্জেকশন ফোটানো। পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির একটা টার্গেটের সাথে এই সমান্তরাল কোণ বজায় রাখতে গেলে, আক্রমণকারীকে বেশ লম্বা হতে হবে। অন্তত ছ’ফুট দুই ইঞ্চি। কম করে।

একটা দৈত্যাকার ভূত। চমৎকার, হাত গুটিয়ে মন্তব্য করলেন মতিলাল। আর কী?

দক্ষতা, বিক্রম বলল। মানুষের বাঁচার সহজাত প্রবৃত্তি ভীষণ হিংস্র। শ্বাস নেওয়ার জন্য লড়াই করতে থাকা একটা ছোটখাটো মেয়েও হাত-পা ছুঁড়বে, লাথি মারবে, খামচাবে। আত্মরক্ষার একটা আঁচড়ও না কেটে দশ সেকেন্ডের মধ্যে কাউকে পুরোপুরি কাবু করতে গেলে, চরম শারীরিক নিয়ন্ত্রণ দরকার। খুনি নিমেষের মধ্যে মেয়েটার ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল।

এক পা পিছিয়ে এল বিক্রম। চোখদুটো সরু হয়ে কুঁচকে গেল, এ যে কোনো রাস্তার গুন্ডা নয়, তা এই প্রিসিশন থেকে বোঝা যায়। এ হলো মিলিটারি ক্লোজ কোয়ার্টার্স কমব্যাট। স্পেশাল ফোর্সের নিয়ম। সে শুধু খুন করেনি; পুরোপুরি কৌশলগত কায়দায় শিকারকে নামিয়ে এনেছে। 

চোখ মনিটরে রেখে পিজি বলল, কিন্তু শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করলে নেটওয়ার্কেও তার একটা ঢেউ ওঠে, ভিকি। মনে হচ্ছে সেটাকে ধরা ফেলা গেছে।

দেওয়াল থেকে মুখ ফেরালেন মতিলাল। তাঁর গলায় অবিশ্বাস, ওই গায়েব হয়ে যাওয়া দশ মিনিটের ক্লিপ পেয়েছ?

তার থেকেও ভালো কিছু, একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল পিজির মুখে, স্থানীয় পুলিশের ধারণা, ছোটখাটো ইএমপি দিয়ে স্মার্ট-হাবটা মুছে দেওয়া হয়েছিল। তারা ঠিকই ধরেছে, তবে ঘটনাপ্রবাহটা ধরতে পারেনি। তালাটা জোর করে ভাঙা হয়নি; রীতিমতো ভদ্রভাবে খুলে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল।

মাঝখানের স্ক্রিনে ঘন সবুজ রঙের একগাদা কোড নিয়ে এল পিজি। বলল, খুনি একটা বায়োমেট্রিক ক্লোনার ব্যবহার করেছিল। কিন্তু বান্দ্রার ওই বিল্ডিংয়ের সিস্টেম ক্লাউড-ভিত্তিক। রোজির আঙুলের ছাপ নকল করার সময় সংকেত মেলানোর জন্য ক্লোনারটাকে সেন্ট্রাল সার্ভারে একটা ধাক্কা মারতে হয়েছিল। এক মাইক্রোসেকেন্ডেরও কম সময় লেগেছে, কিন্তু তার একটা প্রতিধ্বনি রয়ে গেছে ক্লাউডে।

তুমি কি সেই প্রতিধ্বনিটার উৎস ধরতে পারবে? তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল মতিলালের গলা।

মনে তো তাই হচ্ছে মতিবাবু। যখন এভাবে একটি ইনোসেন্ট মেয়েকে মারা হয়, তখন হাত গুটিয়ে বসে থাকি কী করে? সিগন্যালটা এস্তোনিয়ার তিনটে প্রক্সি সার্ভার, সুইজারল্যান্ডের একটা ভিপিএন হয়ে একটা টর রিলে নোডে হারিয়ে গেছে। এটা মিলিটারি-গ্রেডের সুরক্ষা বলয়। সুপার-কম্পিউটার দিয়ে ভাঙতেও কয়েক সপ্তাহ লাগবে।

বিক্রম বলল, সে কী রে? তার মানে কি আমরা কানাগলিতে এসে আটকে গেলাম?

খুনির দিক থেকে দেখলে, উত্তরটা হচ্ছে হ্যাঁ, একটা আঙুল তুলে শুধরে দিয়ে পিজি বলল, দ্যাখ, খুনি একজন পেশাদার। পেশাদাররা মাগনায় কাজ করে না। তারা মক্কেলের জন্য কাজ করে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে খুনির ডিজিটাল পায়ের ছাপ হয়তো একটা দুর্ভেদ্য দুর্গ, কিন্তু যে মক্কেল তাকে ভাড়া করেছে? এইসব লোকগুলো তো সাধারণত ইন্টারনেটের কানেকশন থাকা কোনো রাগী আর বোকা মানুষ হয়। তাই না? …

নাটকীয় কায়দায় এন্টার বোতামটা চাপল পিজি। চেপে হেসে বলল, আমি যখন খুনির বেরোনোর রাস্তা খুঁজছিলাম, ঠিক সেইসময় গত আটচল্লিশ ঘণ্টায় মুম্বাইয়ের স্থানীয় নেটওয়ার্কে হওয়া অস্বাভাবিক লেনদেনগুলোও খতিয়ে দেখছিলাম। ডার্ক ওয়েবে ঢুকে কেউ এনক্রিপ্টেড ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বড় অঙ্কের লেনদেন করেছে কি না, সেটাই খুঁজছিলাম।

শিকারের গন্ধ পাওয়া শিকারির মতো সামনে ঝুঁকে এলেন মতিলাল, তাঁর গলা খাদে নেমে গেল, তারপর? 

তারপর, মুম্বাইয়ের একটা ম্যাপ স্ক্রিনে আনল পিজি। এনে বলল, সেখানে একটা লাল বিন্দু জ্বলছে আর নিভছে। রোজির খুন হওয়ার ঠিক বারো ঘণ্টা আগে আন্ধেরির একটা আবাসিক এলাকা থেকে আশি হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের ট্র্যাক-না-করা-যাওয়ার-মতো বিটকয়েন ট্রান্সফার করা হয়েছে। টাকাটা যে ওয়ালেটে গেছে, সেটা ঠিক সেই টর রিলে নোডেই রয়েছে, যেটা ব্যবহার করে খুনি তালাটা খুলেছিল।

জ্বলতে থাকা লাল বিন্দুটার দিকে তাকিয়ে রইলেন মতিলাল। পেশাদার খুনির দুর্ভেদ্য দেওয়ালে একটা ফাটল পাওয়া গেছে। ঘরের কাছের ফাটল।

ইন্টারনেটের কানেকশন থাকা একটা রাগী, বোকা লোক যে রোজিকে যে কোনও মূল্যে মারতে চেয়েছিল, বিড়বিড় করলেন মতিলাল। ঠোঁটের কোণে একটা শীতল হাসি। বললেন, ভাই পিজি, আইপি অ্যাড্রেসটা আলাদা করো। আমাকে নাম আর ঠিকানা দাও।

কাজ শেষ, চিফ। আইপি-টা একটা ব্রডব্যান্ড কানেকশনের। নীতীশ প্রসাদ নামের এক লোকের নামে রেজিস্টার করা। বয়স তিরিশের কোঠায়। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট।

পিজির পিঠ চাপড়ে বিক্রম বলল, এই না হলে তুই পিজি। সব কিছুই তোর কাছে ইজি। তাহলে মতিবাবু, ওই হারামজাদাটাকে নিয়ে অ‍াপাতত অ‍াপনার কী প্ল্যান?

জ্যাকেটটা তুলে নিয়ে বললেন মতিলাল, দ্যাখো ভায়া, নীতীশ যদি সত্যিই পেশাদার খুনি ভাড়া করে থাকে, তবে এখন সে ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। আমরা ওর দরজা ভেঙে ঢুকব না। আমরা ওর অ‍ার একটা ভুল করার অপেক্ষায় থাকব। স্নায়ুর চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়ার জন্য অ‍ার একটু অপেক্ষা করব।

এই ধরনের লোক সবসময় ভেঙে পড়ে, চেয়ারে বনবন করে একপাক  ঘুরে পিজি বলল, লোকটা তার জীবনের অনেকটা সঞ্চয় একজন ডিজিটাল খুনিকে দিয়ে দিয়েছে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, ওর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এখন ফাঁকা, আর ওর বাড়ির কেউ না কেউ ঠিক ওর প্যানিক করাটা টের পাবে।

মাথা নাড়লেন মতিলাল। তাঁর চোখে ঠান্ডা আর হিসেবি দৃষ্টি। বিক্রম, চলো। আমরা আন্ধেরি যাচ্ছি। আমরা ওর বাড়ির ওপর নজর রাখব। যেই মুহূর্তে ওর সাধারণ জীবনের মুখোশটা খসে পড়বে, আমরা ওকে টেনে হিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে আসব। 

পিজি হাতজোড় করে বলল, যাওয়ার পথে দয়া করে অ‍ামাকে হোটেল তাজে নামিয়ে দিয়ে যাবেন, কেমন? এই গন্ধটা অ‍ার সহ্য হচ্ছে না।

বেশ, বেশ …, মতিলাল খুকখুক করে হাসতে লাগলেন।

গল্পটি ভালো লাগছে? পরের পর্ব পড়ুন:

পরবর্তী পর্ব: দ্বিতীয় অধ্যায়: অফ-দ্য-বুকস কল →

Leave a Comment