অনলাইন স্টোর গোয়েন্দা বিক্রম, চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রী ও জিনিয়াস হ্যাকার পিজির যাবতীয় বড়দের ক্রাইম থ্রিলার এখন পাওয়া যাচ্ছে Notion Book Store -এ। বইগুলো দেখুন →

অফলাইন স্টোর কলেজ স্ট্রিটে সমস্ত বই এখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। বুক ফ্রেন্ড। ৮/১/বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, (মিত্র ঘোষের গলি, কফি হাউসের ঠিক পাশে)। ফোন - ৮৭৭৭৪২১১৪২

৪. রহস্যের ঠিকানা সুইনহো লেন | নরকের দরজা

একটু দেরিতে হলে‍ও অবশেষে বর্ষা নামল কলকাতায়। 

অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতই প্রতিবছর দুটি ঋতুর জন্য প্রহর গোনেন মতিলাল। প্রথমটি অবশ্যই বর্ষা, এবং দ্বিতীয়টি শীত। 

কলকাতায় এই দুটি ঋতুর মতিগতি অনেকটা সদ্য কৈশোরে পা রাখা বালক, বালিকাদের মত। তারা নিজেরাও জানে না কখন কী করবে। 

কতদিন তারা কলকাতায় থাকবে, তাও প্রেডিক্ট করাটা কঠিন।

এবার গরমটা বেশ কিছুদিন ধরে ভুগিয়েছে, তার মধ্যে এই ধরনের একটা হাই প্রোফাইল মৃত্যু চারপাশ অ‍ার‍ও গরম করে দিয়েছে। 

বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ার ইনফ্লুয়েন্সার, যারা কি না সবকিছুতেই রহস্যের গন্ধ পায়, তারা এই সম্পাদকের মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মানতেই নারাজ। ফলে নানা ধরনের থিওরি হাওয়ায় ভাসছে। 

ঠিক এই রকম পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকের পরদিন ভোরবেলায় মতিলাল, নিয়মমাফিক হাঁটতে বেরোলেন।

অ‍াষাঢস্য প্রথমঃ দিবসে অ‍াকাশে মেঘের ঘনঘটা। চারপাশ কালো হয়ে অ‍াছে। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে গতরাত থেকেই।

অবশ্য তিনি এটার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন; গত দু-তিন দিন ধরেই তিনি আকাশের মেঘের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন।

ভোরবেলা যখন বেরোলেন, মতিলালের গায়ে তখন একটা কালো রেইনকোট। হাতে সেই পুরনো আমলের বড় একটা ছাতা, যার কাঠের হাতলটা বেশ মজবুত। 

তাঁর বাবার আমলের ছাতা এটি, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া।

বর্ষার মেঘের চরিত্র বড় বিচিত্র। ওরা যেন বড্ড তাড়াহুড়ো করে কোথাও একটা যাওয়ার চেষ্টা করে। ঠিক যেন স্কুলের কিশোরী মেয়েরা, মুঠোয় শক্ত করে ধরা রুমাল, দল বেঁধে একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে, খুনসুটি করতে করতে স্কুলে যাচ্ছে। 

তফাত শুধু একটাই, মেয়েরা হাসাহাসি করে, কাচের চুড়ি ভাঙার মত অ‍াওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, আর বর্ষার মেঘেরা থাকে একদম নিশ্চুপ। কোনও বজ্রপাত নেই, কোনো বিদ্যুতের ঝলকানি নেই। শুধু নিস্তব্ধতা। চারদিক করে টিপটিপ বৃষ্টি।

মতিলাল ওপরের দিকে তাকালেন। মেঘেরা নিঃশব্দে দ্রুত গতিতে সরে যাচ্ছে। বাতাসের আর্দ্রতায় ভিজে উঠছে এই তিনশ বছরের পুরনো শহর। 

কয়েক দিনের তীব্র দহন কাটিয়ে আজ শহরটা বেশ শান্ত আর ঠান্ডা। 

মতিলাল বরাবরই একা হাঁটতে পছন্দ করেন। 

বাড়ির দুই পাহারাদারকে বলে এসেছেন সকালে আরাম করে চা খেতে। 

সাসপেন্ড হয়ে থাকলেও এখনও তিনি সিকিউরিটি পাচ্ছেন অ‍াদালতের নির্দেশেই। যদিও সেটি তিনি নিজে চাননি। সত্যি কথা বলতে কী, তিনি পছন্দও করেন না যে কেউ তাঁর ঘাড়ের ওপর সারাক্ষণ নিঃশ্বাস ফেলুক।

অ‍াপাতত তাঁর গন্তব্য, সুইনহো লেন।

কসবা স্পোর্টিং ক্লাব পেরিয়ে একবার ডানে আর একবার বাঁয়ে মোড় নিতেই একটা লম্বা রাস্তা সামনে খুলে গেল। 

ভেজা রাস্তায় একটা প্রাণীরও চিহ্ন নেই। 

সারারাত বৃষ্টি হয়ে রাস্তাটা কালো আয়নার মতো চকচক করছে। বৃষ্টির ভয়ে প্রাতঃভ্রমণকারীরা আজ ঘরের ভেতরেই সেঁধিয়ে সম্ভবত। 

মতিলাল তাঁদের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন। শরীরের সাথে মনের এক চিরন্তন লড়াই চলে, পা এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু বৃষ্টি দেখলে যুক্তিপ্রিয় মন বাধা দেয়। 

এই বৃষ্টিতে ছাতা হাতে করে হাঁটা কি সম্ভব? এমন সব অজুহাত দিয়ে অলস মনটাই জিতে যায় শেষপর্যন্ত।

মতিলাল সোজা হেঁটে আবার বাঁয়ে মোড় নিলেন। 

প্রফুল্ল কানন পার্কটায় পৌঁছানোর আগেই ডানদিকের সরু গলিটা তাঁকে সুইনহো লেনে পৌঁছে দিল। 

এবার দীর্ঘ পদক্ষেপে তিনি এগিয়ে চললেন রাধারানী প্রেস-এর অফিসের দিকে। সেই প্রেসটা পেরিয়ে মোড় নিতেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছালেন তিনি।

একটা পুরনো বাড়ি, বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। মতিলাল বাড়ির লেটার বক্সটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। 

চারপাশটা একবার দেখে নিলেন, কেউ কি নজর রাখছে? দেখলেও তাতে কিছু যায় আসে না। লেটার বক্সটা তালাবন্ধ থাকে সব সময়। 

এর মালিক অথবা তাঁরই বিশ্বস্ত কেউ দিনে দুবার এটা চেক করে।

মতিলাল পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড চিঠি বের করে সাবধানে তার ভেতরে ফেলে দিলেন।

ফেরার পথে একটা এমন ঘটনা ঘটল, যার জন্য তিনি ঠিক প্রস্তুত ছিলেন না।

হাঁটছিলেন ধীরে সুস্থে। 

মনে করার চেষ্টা করছিলেন, গতবার যখন এই গোপন বন্ধুর কাছে চিঠি দিতে এসেছিলেন, তখন বিশেষ কোনো কিছু নজরে পড়েছিল কি না যা আজ আর নেই। 

মতিলাল জানেন, তাঁর এই বন্ধুটি অন্তত দুপুর না গড়ালে ফোন করবে না। ফোনটা আসবে এনক্রিপ্টেড লাইনে, যা কোনোভাবেই ট্রেস করা সম্ভব নয়। 

অথবা বন্ধুটি যদি এই শহরেই থাকে, তবে কোনো একটা গোপন জায়গায় সে দেখা করার প্রস্তাব দেবে। তবে তাঁর বাড়িতে নয়।

ততক্ষণে করুণাপ্রসাদ খুনের তদন্ত নিয়ে তাঁকে আরও কিছু কাজ সেরে নিতে হবে। 

দেবাশিস আর রাঘবের সকাল ৯টায় তাঁর ডেরায় পৌঁছানোর কথা। মতিলাল ঘড়ির দিকে তাকালেন।

হাতে অনেকটা সময় অ‍াছে।

ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা ট্যাক্সি শোঁ করে তাঁকে পেরিয়ে গেল। মোড় ঘোরার ঠিক আগের মুহূর্তে ট্যাক্সির ভেতর থেকে কেউ একটা গোল করে পাকানো কাগজ তাঁর পায়ের কাছে ছুঁড়ে দিল। 

কাগজটা ছোঁড়ার পরেই ট্যাক্সিটা এত দ্রুত চোখের আড়ালে চলে গেল যে নম্বরটা পড়ার সুযোগ হলো না। 

তবে মতিলাল জানেন, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নম্বরটা বের করা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। 

বৃষ্টিটা এখন বেশ ঝমঝমিয়ে নামছে। 

অন্ধকার মেঘের তালায় ঢাকা পড়া পুরো শহরটা যেন একটা ভুতুড়ে নগরী। 

মতিলাল রুমাল দিয়ে অতি সাবধানে সেই কাগজটা তুলে নিলেন যাতে সেটা বেশি ভিজে না যায়। বড় ছাতাটার নিচে দাঁড়িয়ে তিনি কাগজটা খুললেন।

ভেতরে লাল কালিতে লেখা একটি বার্তা। হাতের লেখাটা খুবই কদর্য। ছোটবেলায় কি লোকটার বাবা, মা এব্যাপারে কোনও যত্নই নেয়নি? 

চিঠিতে যা লেখা আছে, তা মতিলাল অ‍াগেই প্রত্যাশা করেছিলেন।

লেখা রয়েছে – এখনই বন্ধ করো তদন্ত। নইলে তোমার অবস্থাও ঠিক করুণাপ্রসাদের মতই হবে।

মতিলালের ভুরূটা কুঁচকে গেল। খুব সাবধানে রুমালে ধরে চিঠিটা রেইনকোটের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে তিনি ভাবছিলেন, এত তাড়াতাড়ি খবরটা লিক হয়ে গেল?

Leave a Comment