মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ঢুকতে তিনি দুই উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিলেন। মতিলাল অবশ্য প্রাক্তন হয়ে গেছেন।
শুদ্ধ সান্যাল মাথা না তুলে বললেন, বসুন।
তাঁর গলার স্বর বরাবরই গম্ভীর, ব্যক্তিত্বপূর্ণ , কিন্তু কলেজ জীবনের বন্ধুর এই অস্বাভাবিক মৃত্যু সেই গলাকেও কাঁপিয়ে দিল।
শুদ্ধ সান্যাল বেশিক্ষণ সময় নষ্ট করেন না। তিনি প্রাক্তন চিফ ডিটেকটিভের দিকে তাকিয়ে বললেন, তো মতিলাল,,, কথাটা শেষ হল না।
তিনি একটা গলা খাঁকরানি দিলেন।
মতিলাল ভাবছিলেন অন্য কথা, মুখ্যমন্ত্রী কখনও তাঁর নাম ধরে সম্বোধন করেন না, সবসময় মিস্টার মিস্ত্রী বলেন। অাজ কী হল?
মিস্ত্রী আর মিস্ট্রি, উচ্চারণটা কাছাকাছি, শুধু একটা অক্ষরের তফাত।
আজ হঠাৎ নাম ধরে ডাকায় মতিলাল বুঝে গেলেন, আবহাওয়া খারাপ। যদিও তাতে তাঁর কিছুই অার এসে যায় না। তিনি ঠিক করেই ফেলেছেন, অার পুলিশে জয়েন করবেন না।
মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি মতিলালকে জিজ্ঞেস করলেন, খুনটা নিয়ে কী ভাবছেন? এমন কিছু অস্বাভাবিক দেখেছেন যা এই জটিল জট খুলতে পারে?
মতিলাল বললেন, সবটাই অস্বাভাবিক স্যার। শুধু মার্ডার সিন নয়, লোকটাও চরিত্রও তো স্বাভাবিক ছিল না। করুণাপ্রসাদ সেক্স অ্যাডিক্ট ছিলেন। আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে।
বন্ধুর এমন কুকীর্তির কথা তাঁর কানে কখনও অাসেনি, এটা তো হতে পারে না। ফলে তিনি মাথা নামিয়ে নিয়ে, ফাইলটা খুললেন। ফরেনসিকের ছবিগুলো সেখানে ছিল। তিনি সশব্দে ফাইলটা বন্ধ করে দিলেন, বিড়বিড় করে বললেন, রাসকেল কোথাকার।
গালিটা কাকে দিলেন জানেন না মতিলাল। পুরনো বন্ধুকেই সম্ভবত।
মতিলাল ঠিকই করে রেখেছিলেন, কিছু লুকোবেন না করুণাপ্রসাদের সম্পর্কে। তাঁর এখন কিছুই হারানোর নেই।
ফলে এরপর মতিলাল যোগ করলেন, করুণাপ্রসাদ ক্রস-ড্রেসার ছিলেন। বিচিত্র ধরনের বিকৃতি বা ফেটিশ ছিল তাঁর। আমার ধারণা, মৃত্যুর আগে তিনি শারীরিকভাবে কারও সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। ঠিকঠাক পারফর্ম করার জন্য বিশেষ কোনো ড্রাগ ইনজেক্ট করেছিলেন তিনি নিজেকে। যাতে তিনি শারীরিক মিলনের সময় পাথরের মতো শক্ত হয়ে থাকতে পারেন। অামরা ড্রয়ারে সিরিঞ্জ পেয়েছি। ফরেনসিকে গেছে। মারা যাওয়ার অাগে ওঁর ঘরে এক নায়িকা ঢুকেছিলেন। তাঁর সঙ্গে এবার কথা বলা দরকার।
যথেষ্ট হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী উঠে দাঁড়ালেন। তাকালেন কমিশনারের দিকে। বললেন, দেখবেন মিঃ মিস্ত্রীর তদন্ত করতে কোনও অসুবিধা না হয়।
কমিশনার মাথা নাড়লেন, ইয়েস স্যার।
মতিলালরাও উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি নিচু গলায় বললেন, এইসব খবর অাপাতত আমাদের মধ্যেই থাকুক। সারা দুনিয়া জানবে করুণা স্বাভাবিকভাবে মারা গেছে। সাংবাদিকদের সম্মান অামি ধুলোয় মেশাতে চাই না। ব্যাপারটা গোপন থাকুক অাপাতত।
মতিলাল ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করলেন, তদন্ত কি তাহলে সেভাবেই করা হবে, স্যার?
তিনি প্রায় গর্জে উঠলেন, না! অাপনি অাপনার কাজ করবেন। অামি অাপনাকে অানঅফিসিয়ালি ফ্রি হ্যান্ড দিলাম। তদন্ত করে কে খুন করেছে খুঁজে বের করুন, কিন্তু রিপোর্ট সরাসরি আমাকে দেবেন। মাঝখানে আর কেউ থাকবে না। ক্লিয়ার?
ওকে স্যার। মতিলাল ও কমিশনার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
মুখ্যমন্ত্রী যা বললেন, তার মানে দাঁড়ায় একটাই।
রিটায়ারমেন্টের মুখে তিনি কমিশনারকে এই বিশেষ তদন্ত থেকে পুরোপুরি বাদ দিলেন। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী ধরেই নিচ্ছেন, তদন্ত দু-মাসের বেশিও গড়াতে পারে।
ফলে তিনি ফুল চার্জ দিলেন এক প্রাক্তন, সাসপেন্ডেড, ও পদত্যাগ করতে চাওয়া চিফ ডিটেকটিভকে।
ফোনটা সাইলেন্টে ছিল, মুখ্যমন্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে ফোন বের করে মতিলাল দেখলেন, মিসড কলে রয়ছে বিক্রমের নাম।
লম্বা টানা বারান্দার একটু ধারে সরে গিয়ে তিনি ধরলেন বিক্রমকে, বলো ভিকিভাই।
বিক্রমের গলা ভেসে এল, কি, তদন্ত বন্ধের নির্দেশ পেলেন, মতিবাবু?
মতিলাল বললেন, ঠিক ধরেছো তো ভায়া, প্রায় সেরকমই। যা হল, তাতে আমার ঝামেলা বাড়ল। একে তো এরা প্রভাবশালী পরিবার, সুতরাং, তেনাদের ইন্টারোগেশন করতে গেলে প্রতিবার পারমিশন লাগবে। তবুও, এই হাফ বুড়ো, বিকৃত মস্তিষ্কের এডিটর খুনের রহস্য আমাদের ভেদ করতেই হবে। অারও একটা ব্যাপার অাছে। এই জঘন্য লোকটাকে খতম করে যে পৃথিবীর উপকার করেছে, তার পরিচয়টা জানার জন্যও আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে, ভায়া।
কথা শেষ করে খুকখুক করে একটি বিশেষ ভঙ্গিতে হাসলেন মতিলাল। এটা ওঁর সিগনেচার হাসি। একমাত্র যাঁরা ওকে অনেকদিন ধরে চেনেন, তাঁরাই এটা জানেন।
উল্টোদিকে বিক্রম হেসে উঠল, ভালো বলেছেন মতিবাবু। তবে এর মধ্যেই একটা ভাল খবর অাছে। পিজি দুদিনের জন্য কলকাতায় ফিরছে ডেনমার্ক থেকে। ফলে ফোনটোন যা বাজেয়াপ্ত করার এই ফাঁকে করে নিন।
মতিলাল বললেন, বাঃ, এটা খুব ভাল খবর দিলে ভায়া। করুণার ফোন তো পুলিশের হেফাজতে অাছেই, অাজকেই তোমাকে হ্যান্ড ওভার করে দিচ্ছি। বাকিটা অামি লিস্ট করে নিয়ে তোমাকে জানাচ্ছি।
বিক্রমের বন্ধু, জিনিয়াস হ্যাকার পিজি ঠিক সময়েই কলকাতা ফিরছে। এতক্ষণে মনটা বেশ ভাল হয়ে গেল মতিলালের।
পিজি অাসার ফলে ফিফটি পারসেন্ট কাজ এগিয়ে গেল।
