সকাল ৯.৩০
খবরটা যখন এল, মতিলাল তখন সবে কফিতে তৃতীয় চুমুকটা মেরেছেন। আর বিক্রম সোফায় বসে পিজির সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত।
সত্যি কথা বলতে কী, বিক্রমের মনের ভেতর তিলজলা লেনের সেই কুয়াশা তখনো কাটেনি, তার ওপর এই নতুন ধাক্কাটা যে এত তাড়াতাড়ি অাসবে, সেটা ছিল স্বপ্নেরও বাইরে।
এবার আর বাইরের কোনও নির্জন পুকুর বা ঝোপঝাড় নয়, খোদ ভট্টাচার্য প্যালেস-এর অন্দরমহল।
শেখর যেভাবে উত্তেজিত ভাবে ঘরে ঢুকেছিল, তাতেই ওদের মনে হয়েছিল কোনও বড় খবর অাছে।
হাঁফাতে হাঁফাতে শেখর বলল, স্যার, চন্দ্রলেখা,,, কথা শেষ না করে শেখর গলার কাছে হাত নিয়ে যে ইঙ্গিতটা করেছিল তার একটাই মানে হয়।
শহরে, মাত্র একদিনের ব্যবধানে, পড়ে গেল তৃতীয় লাশ।
দুই মেয়ের পর এবার মা – চন্দ্রলেখা।
খুনের জায়গা, চন্দ্রলেখা ভট্টাচার্যের নিজস্ব বেডরুম।
মতিলাল উঠতে উঠতে বললেন, চলো ভায়া। গতকাল ওই ডেথ প্যালেসে পা রেখেই মনে হয়েছিল, ফের কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তবে এত তাড়াতাড়ি যে সেটা ঘটে যাবে, তা ভাবতেই পারিনি।
বিক্রম বলল, খুনীরা এবার নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া সেরে নিচ্ছে।
মতিলাল চোখ কুঁচকে বললেন, ঠিকই বলেছো ভায়া। তেমনই কিন্তু অামারও মনে হচ্ছে।
মতিলাল আর বিক্রম যখন স্পটে পৌঁছলেন, ঘরটা তখন পুলিশের দখলে। কিন্তু ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা দেখে মতিলালের মতো অভিজ্ঞ অফিসারেরও কয়েক সেকেন্ড লাগল নিজেকে সামলাতে।
বিক্রম ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারপাশটা স্ক্যান করছিল। ওর চোখ সরু হয়ে গেছে। বিক্রম জানে একজন ফোরেনসিক সায়েন্টিস্ট বা প্যালোথজিস্ট-এর নিঁখুত পর্যবেক্ষণ এখন অনেক বেশি দরকার।
মতিলাল রাঘবকে জিজ্ঞেস করলেন, কামেশ্বরকে খবর দেওয়া হয়েছে?
রাঘব মাথা নাড়ল, হ্যাঁ স্যার। ও ফরেনসিক দলের সঙ্গেই অাসছে।
লাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বিক্রম নিচু গলায় মতিলালকে বলল, ভেরি ব্রুটাল।
চন্দ্রলেখার মৃতদেহ বিছানার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে। শরীরে এক টুকরো সুতোও নেই।
দুই মেয়ের লাশের প্রতি খুনিরা যে ন্যূনতম মর্যাদা দেখিয়েছিল, মায়ের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তার লেশমাত্রও নেই।
মতিলাল বললেন, এটা স্রেফ মার্ডার নয়, এটা একটা স্টেটমেন্ট। এই কেউ একটা কাপড় এনে অাপাতত লাশটা ঢাকার ব্যবস্থা করো।
বিক্রম লাশের খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল। মতিবাবু, এটা একটা হাইব্রিড মার্ডার।
মতিলাল ভুরু কুঁচকােলেন, অামারও তো তাই মনে হচ্ছে ভায়া?
লক্ষ্য করুন, বিক্রম আঙুল দিয়ে দেখাল। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মাল্টিপল কনটিউশন (কালশিটে) আর ল্যাসারেশন (চেরা ক্ষত) রয়েছে। কবজিতে রয়েছে গভীর লিগেচার মার্কস (দড়ির দাগ), অর্থাৎ ওকে শক্ত করে বাঁধা হয়েছিল। বােঝাই যাচ্ছে, খুনিরা ওকে মারার আগে টর্চার করেছে। তবে এই টর্চারের ধরণটা খুব অ্যামেচার। মনে হচ্ছে পুরোনো কোনও রাগ বা কোনও তথ্য আদায়ের চেষ্টা। কিন্তু ফিনিশিং টাচটা দেখুন, গলার ক্যারোটিড আর্টারি এক কোপে কাটা। একদম প্রফেশনাল কাট। একজন আনাড়ি লোক টর্চার করেছে, আর একজন প্রোফেশনাল এসে কাজ শেষ করেছে।
মতিলাল বললেন, দেওয়াল জুড়ে রক্তের স্প্ল্যাটার প্যাটার্ন দেখেছো ভায়া। বিছানার চাদর দলা পাকানো, দুটো বালিশ নিচে পড়ে আছে। বিক্রম বলল, একটা জিনিস স্পষ্ট যে চন্দ্রলেখা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন। তাঁর নখের নিচে চামড়া বা রক্ত পাওয়া যেতে পারে, যেটাকে আমরা ডিফেন্সিভ উন্ডস বলি। দেখা যাক, ফরেনসিক টিম অাসুক।
একটা চাদর দিয়ে লাশ ঢেকে দেওয়ার পর মতিলাল চারপাশটা দেখে বললেন, ফোরেনসিক টিমকে বলো প্রতিটা ইঞ্চির ছবি তুলতে। খুনিরা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকেছিল সম্ভবত, কারণ ফোর্সড এন্ট্রি-র কোনও চিহ্ন নেই। তার মানে কিলারদের চন্দ্রলেখা চিনতেন, অথবা তারা আগে থেকেই ভেতরে ঘাপটি মেরে ছিল?
বিক্রম বলল, হ্যাঁ সেটার সম্ভাবনাই বেশি।
ঘরের এক কোণে বিপ্লব বসে ছিল। মাথা নিচু করে। মতিলাল আর বিক্রম ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ও মাথা তুলল। চোখে জল।
বিক্রম ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, কি বিপ্লব, এটা কি শোকের জল, নাকি মুক্তির আনন্দ?
বিপ্লব মাথা নামিয়ে নিল।
মতিলাল ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, লাস্ট কখন দেখেছিলে ওনাকে?
বিপ্লব ঢোক গিলে বলল, কাল রাতে একসঙ্গে ডিনার করেছি স্যার। তারপর আমি নিজের রুমে চলে যাই। আমি, আমি ভাবতেও পারিনি।
মতিলাল হাসলেন। পুলিশের চাকরিতে এরকম অর্ধেক সত্যি কথা তিনি হাজার হাজার শুনেছেন।
বললেন, কিন্তু বিপ্লব, তোমার রুম তো চন্দ্রলেখা দেবীর ঠিক পাশেরটাই, তাই না?
বিপ্লব মাথা নিচু করে বলল, হ্যাঁ স্যার। দোতলার সবকটা বেডরুমই ভেতর থেকে ইন্টার-কানেক্টেড।
আর মেয়েদের ঘর? বিক্রমের প্রশ্ন।
ওগুলো উল্টো দিকে। কিন্তু ওগুলোও কানেক্টেড।
মতিলাল সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, ওকে বিপ্লব। আজ আর কিছু বলব না। তবে আমাদের পারমিশন ছাড়া কলকাতা ছাড়বে না। থাকার জায়গা আছে তো?
বিপ্লব স্কুলছাত্রের মতো মাথা নাড়ল, না স্যার। বাবা-মা কেউ নেই। এখানেই থাকি।
হুকুমের সুরে মতিলাল বললেন, ঠিক আছে। তারক আর ভজনলালকেও বলে দাও যেন কোথাও না যায়। কারও স্টেশন লিভ করা চলবে না। আন্ডারস্ট্যান্ড?
মতিলাল আর বিক্রম ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
বাইরে শীতের বিকেলটা গুটিয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত।
বিক্রম বিড়বিড় করল, মতিবাবু, সেই সন্ন্যাসী আর সন্ন্যাসিনীর অ্যাঙ্গেলটা কিন্তু এবার সিরিয়াসলি দেখতে হবে। ভট্টাচার্য প্যালেসের ডার্ক হিস্ট্রি এবার কবরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে।
মতিলাল মাথা নাড়লেন। খুকখুক করে হেসে বললেন, অপারেশন চন্দ্রবংশ এখন সবে শুরু হল ভায়া।
