মতিলাল মিস্ত্রীর স্টাডি রুমের দেওয়াল-জোড়া মনিটরটা মাঝখান থেকে দুটো ভাগে ভাগ করা।
স্ক্রিনে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা অশরীরির ডেটা জ্বলজ্বল করছে।
বাঁদিকে, সাসপেক্ট এ: তেলেঙ্গানার সেই ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত প্রাক্তন মিলিটারি কনট্রাক্টর।
ডানদিকে, সাসপেক্ট বি: ছত্তিশগড়ের পরিত্যক্ত মাইকা কোয়ারির সাথে জুড়ে থাকা একটা সম্পূর্ণ পরিচয়হীন একটি আইপি (IP) অ্যাড্রেস।
মতিলাল তার পরবর্তী নির্দেশ দেওয়ার আগেই, ডেস্কের ওপর থাকা এনক্রিপটেড ভিডিও কনফারেন্সিং টার্মিনালটা বেজে উঠল। কলার আইডিতে সেন্ট্রাল মিনিস্ট্রির এনক্রিপ্টেড সিল।
মতিলাল কানেকশন বাটনটা প্রেস করলেন।
স্ক্রিনে মল্লিকার মুখ ভেসে উঠল। ও একটা কাঁচের দেওয়াল ঘেরা ছিমছাম, পরিষ্কার অফিসে বসে আছে। ওর বসার ভঙ্গি আর চোখের চাউনিতে একজন চূড়ান্ত ক্ষমতাশালী আমলার দম্ভ স্পষ্ট।
চিফ ডিটেকটিভ, মল্লিকার গলাটা বেশ রুক্ষ এবং কর্তৃত্বপূর্ণ, আমার ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক এইমাত্র তেলেঙ্গানায় আপনাদের সাসপেক্ট এ-র বিহেভিয়ারাল ডসিয়ার তৈরি শেষ করেছে। আমি ফাইলটা আপনাদের সার্ভারে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এটা অাপনারা ভাল করে দেখুন।
পিজির শেয়ার করা ফিডে একটা নতুন উইন্ডো খুলে গেল। তাতে ক্যাপ্টেন অর্জুন বর্মার মিলিটারি এবং সাইকোলজিকাল রেকর্ড। লোকটা প্রাক্তন প্যারা কম্যান্ডো, পাঁচ বছর আগে যাকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এখন সে নাল্লামালা ফরেস্টের ধারে একটা দুর্গের মতো ঘেরা কম্পাউন্ডে থাকে।
এই বর্মা কিলারের সাইকোলজিকাল ফ্রেমের সাথে একদম নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছে, ক্যামেরার মধ্যে দিয়ে মতিলালের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মল্লিকা বলল, ও একজন এলিট শার্পশুটার যে নিজের র্যাঙ্ক আর সম্মান দুটোই হারিয়েছে। রাষ্ট্রের ওপর ওর একটা গভীর, বিষাক্ত রাগ আছে। জঙ্গলে অবসর নেওয়া, কাস্টম অস্ত্রশস্ত্র জমানো, আর সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের ঠান্ডা মাথায় খুন করা—এসবই আসলে ওর ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার একটা উপায়। এটা অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট র্যাডিক্যালাইজেশনের সাথে মিশে থাকা একটা ফ্র্যাকচারড গড-কমপ্লেক্সের একেবারে নিখুঁত উদাহরণ।
মল্লিকা একটু থামল ও বোধহয় বুঝে নিতে চাইল কলকাতায় বসে থাকা তিনজন ঠিক কী ভাবছে। পিজি যদিও নিজের ডেরায় ফিরে গেছে। কিন্তু ওদের তিনজনের ফোনই ইন্টারলিঙ্কড।
মতিলালের বাংলোয় বসে বিক্রম বর্মার মিলিটারি ফাইলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের পেশিগুলো সামান্য কুঁচকে গেল।
বর্মা কিন্তু ডেমোলিশন এক্সপার্ট ছিল, স্নাইপার নয়, কথাটা বলার সময় বিক্রমের গলায় যে সন্দেহ রয়েছে তা বুঝতে বাকি রইল না বুদ্ধিমতী মল্লিকার।
সম্ভবত কাউন্টার লজিকের জন্য ও তৈরি ছিল।
স্কিল সময়ের সাথে বদলে যায়, ক্যাপ্টেন বিক্রম, মল্লিকা এতটুকু না থমকে খুব মসৃণভাবে উত্তর দিল, আসল ব্যাপারটা হলো সাইকোলজি। ওর রাগ। ওর একাকিত্ব। নাল্লামালা ফরেস্টে হওয়া খুনের জায়গার কাছাকাছি ওর থাকা। বর্মাই আপনাদের রেড করিডোর স্নাইপার। মিনিস্ট্রি চাইছে, কাল সকালে মিডিয়ায় খবর হওয়ার আগেই আপনারা ওর কম্পাউন্ডে ঢুকে বর্মাকে অ্যারেস্ট করুন। আমি আশা করব আপনাদের টাস্ক ফোর্স এখনই সমস্ত রিসোর্স তেলেঙ্গানার ওপর ফোকাস করবে।
মল্লিকা কথা শেষ করলেও মতিলালের মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। একটা ঠান্ডা ভদ্রতার মুখোশ পরে তিনি মল্লিকার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটা যে কত নিখুঁতভাবে ওদের ভুল পথে চালিত করছে, সেটা তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন।
ও আসলে একটা সোনার ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছে, যাতে ওরা ঠিক সেখানেই পৌঁছায় যেখানে মল্লিকা ওদের পাঠাতে চায়।
আপনার বিহেভিয়ারাল অ্যানালিসিস বেশ গভীর, ম্যাডাম প্রোফাইলার, মতিলাল খুব শান্ত গলায় বললেন, আমরা আমাদের ট্যাকটিকাল প্যারামিটারগুলো বদলে নিচ্ছি। বিক্রম আর আমি তেলেঙ্গানা কম্পাউন্ডের জন্য তৈরি হচ্ছি।
মতিলালের কথা শুনে যে মল্লিকার কাঁধের পেশিগুলো এক মিলিমিটারের ভগ্নাংশের জন্য সামান্য রিল্যাক্স হলো, একটা মাইক্রোস্কোপিক স্বস্তি, সেটা মতিলালের তীক্ষ্ণ চোখ এড়াল না।
তিনি এটাই চাইছিলেন। তাই ছবিটা মাথার ভেতর গেঁথে নিলেন।
মল্লিকার গলায় স্বস্তির ভাব ফিরে এল, ভেরি গুড। সেটাই করুন চিফ ডিটেকটিভ। আমাকে আপডেট দেবেন, বলে কানেকশন কেটে দিল মল্লিকা।
স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল। স্টাডি রুমটা পাক্কা তিন সেকেন্ড নিস্তব্ধ রইল। পিজি, মতিলালের গলা থেকে ব্যুরোক্র্যাটিক ভদ্রতার মুখোশটা খসে পড়ল, তেলেঙ্গানাকে ইগনোর করো পিজি ভাই। বর্মা একটা টোপ মাত্র। তুমি সাসপেক্ট বি-কে ব্রেক করো।
ষোলো ডিগ্রি তাপমাত্রার কনকনে ঠান্ডা আন্ডারগ্রাউন্ড সার্ভার রুমে বসে পিজি নিজের আঙুলগুলো মটকাল। ও ঠিক এই কম্যান্ডটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
অলরেডি অন ইট, মতিবাবু, এনক্রিপ্টেড অডিও লিংকের মধ্যে দিয়ে পিজির গলা ভেসে এল। পিজি তার পুরো ফোকাস মনিটরের ডানদিকের অংশে ঘুরিয়ে নিল।
সাসপেক্ট বি আসলে একটা ডিজিটাল দুর্গ। যে লোকটা .338 লাপুয়া ম্যাগনাম অ্যামিউনিশন কিনেছিল, সে তার ট্রানজ্যাকশনটা মিলিটারি-গ্রেড এনক্রিপশনের এতগুলো স্তরের নিচে লুকিয়ে রেখেছে যে, কোনো আন্তর্জাতিক মানের সাইবার-ফরেনসিক টিমও হাল ছেড়ে দিত।
কিন্তু পিজি কোনো সাধারণ ফরেনসিক টিম নয়। সে পারফেক্ট জেন্টলম্যান, আর ডিজিটাল দুর্গ দেখলে সে সেটাকে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে ধরে নেয়। পিজির চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
কিলার ঘোস্ট একটা ডায়নামিক অনিয়ন রাউটিং প্রোটোকল ব্যবহার করছে, মেকানিক্যাল কিবোর্ডের ওপর পিজির আঙুলগুলো একটা ভয়ংকর, ছান্দিক গতিতে উড়তে শুরু করল, ওর ট্রাফিক পূর্ব ইউরোপের এনক্রিপ্টেড নোড হয়ে বাউন্স করছে, তারপর সাউথ-ইস্ট এশিয়ার একটা ক্রিপ্টো-টাম্বলারের মধ্যে দিয়ে ঘুরে, শেষমেশ একটা হাইজ্যাক করা স্যাটেলাইট পিং-এর পেছনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলছে।
একটানা কথাগুলো বলে পিজি একটু থামল।
ও কোনো রাষ্ট্রীয় গুপ্তচরের মতো নিজের পায়ের ছাপ মুছে ফেলছে, স্টাডি রুমে দেওয়ালের মনিটরের দিকে ঝুঁকে পড়ে বিক্রম বলল, স্টেট গুপ্তচর প্রোটোকলের ওপর নির্ভর করে।
উত্তরে পিজির হাসি ভেসে এল, দ্যাখ ভিকি, আমি নির্ভর করি কেওস বা বিশৃঙ্খলার ওপর, পিজি জবাব দিল।
পিজি একটা কালো টার্মিনাল উইন্ডো খুলল এবং একটা ব্রুট-ফোর্স প্যাকেট-ইনজেকশন স্ক্রিপ্ট চালু করল। সে প্রক্সি লেয়ারগুলোকে ডিক্রিপ্ট করার চেষ্টাই করল না, বরং সেগুলোকে ওভারলোড করার চেষ্টা করল। পূর্ব ইউরোপের নির্দিষ্ট নোডটাকে করাপ্টেড ডেটা প্যাকেট দিয়ে প্লাবিত করে, সে ঘোস্টের অটোমেটেড সিকিউরিটি প্রোটোকলকে বাধ্য করল তার প্রাইমারি কানেকশন ড্রপ করে সাথে সাথে তার ব্যাকআপ রাউটারে সুইচ করতে।
কাজ করার সময় প্রাণহীন কম্পিউটারের সঙ্গে নিজের মনে কথা বলাটা পিজির পুরোন রোগ।
সুইচিং টু ব্যাকআপ… নাও, পিজি ফিসফিস করে উঠল।
ঠিক ১.৪ সেকেন্ডের জন্য, প্রক্সি সার্ভারগুলোর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় হাতবদলের সময়, ঘোস্টের আসল আইপি অ্যাড্রেসটা ওপেন নেটওয়ার্কে এক্সপোজড হয়ে গেল। নতুন প্রক্সি শিল্ড চালু হওয়ার আগেই পিজির কাস্টম ক্রলার তার ডিজিটাল চোয়াল বন্ধ করে দিল। অবশেষে আইপি অ্যাড্রেসটা বন্দি হলো পিজির হাতে।
গট হিম, পিজির গলায় একটা বিরল, চূড়ান্ত জয়ের সুর, মতিবাবু, আমি র (raw) আইপি অ্যাড্রেসটা পেয়ে গেছি।
বাঃ ভায়া। খুব ভাল খবর। কোথায় দেখাচ্ছে লোকেশন? মতিলালের চোখ স্ক্রিনের ওপর স্থির, রাশিয়া? নাকি আইসল্যান্ডের কোনো ডার্ক ওয়েব সার্ভার ফার্ম?
পিজি রিভার্স ডিএনএস (DNS) লুকআপ শুরু করল। উবুন্টু টার্মিনালে সবুজ কোডের সারি ঝর্ণার মতো নামতে লাগল। সিস্টেম ওই সংখ্যার সারিটাকে একটা ভৌগলিক লোকেশনে অনুবাদ করছে। হঠাৎ পিজির টাইপ করা থেমে গেল। কনকনে ঠান্ডা সার্ভার রুমের সেই বিজয়ের উত্তেজনাটা হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। তার বদলে একটা দমবন্ধ করা হিমশীতল স্রোত নেমে এল, যার সাথে এসির কোনো সম্পর্ক নেই। পিজির মুখের পেশি শক্ত হয়ে গেল। নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে তুলে স্ক্রিনের ফাইনাল আউটপুটটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। ডায়াগনস্টিকটা দ্বিতীয়বার রান করল। রেজাল্ট একদম এক।
মতিবাবু, পিজির গলাটা টাইট, তার স্বাভাবিক শান্ত আত্মবিশ্বাসটা কিছুটা হলেও ধাক্কা খেয়েছে, যদিও এসব চ্যাল্ঞ্জ পিজি উপভোগ করে।
বলো পিজি ভাই কী পেলে, মতিলাল জানতে চাইলেন।
ঘোস্ট আইপি কোনো বিদেশি সার্ভার দেখাচ্ছে না, কথাটা বলার সময় পিজির আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর এমনভাবে ভাসছে যেন প্লাস্টিকের কি-গুলোতে হঠাৎ ইলেকট্রিক শক দৌড়চ্ছে।
পিজি বলল, এটা একটা ইন্টারনাল ইন্ট্রানেট আইপি অ্যাড্রেস। একটা টেন-ডট নেটওয়ার্ক।
কথাটা শুনে বিক্রমের ভ্রূ কুঁচকে গেল, ইন্টারনাল? তার মানে এটা লোকাল?
উঁহু, এটা লোকালের থেকেও বেশি কিছু, পিজি বলল।
মতিলালের স্টাডি রুমের শেয়ার করা ওয়াল মনিটরে ফাইনাল ট্রেস-রাউটটা ভেসে উঠল। ম্যাপটা দ্রুত জুম ইন করে কলকাতা শহরে ঢুকল, শহরতলি পার হয়ে সোজা মেট্রোপলিসের একদম হার্টে গিয়ে ঢুকল। লাল মার্কারটা কোনো সাধারণ মানুষের অ্যাপার্টমেন্ট বা কর্পোরেট অফিসে থামল না। সেটা সোজা গিয়ে পড়ল একটা কড়া পাহারায় থাকা ভবনের ওপর।
যে পিং-টা স্নাইপারের অ্যামিউনিশন কিনেছিল… রেড করিডোর স্নাইপারের সেই ডিজিটাল শ্যাডো…, পিজি একটু থেমে বলল, সেটার জন্ম হয়েছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের চারতলার একটা সিকিওর সার্ভার র্যাক থেকে।
নিজের ডিপার্টমেন্টের হেডকোয়ার্টার্সের ওপর দপদপ করতে থাকা লাল মার্কারটার দিকে পাথর হয়ে তাকিয়ে রইলেন মতিলাল।
তার মানে ভূতটা শুধু জঙ্গলে লুকিয়ে নেই। ভূতটা—বা তার অত্যন্ত ক্ষমতাশালী কোনো শাগরেদ—ঠিক সেই বিল্ডিংটার ভেতরেই বসে আছে, যাদের ওপর তাঁকে ধরার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মতিলাল বিক্রমের মুখের দিকে কিছুটা হতভম্ব হয়ে তাকালেন। চোখে অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, কী বুঝলে ভায়া?
বিক্রম বলল, মল্লিকা ছাড়াও ভেতরের অারও কেউ সাহায্য করে থাকতে পারে। তবে ডোন্ট ওয়ারি মতিবাবু। পিজির ওপর ভরসা রাখুন। ও ঠিকই এই ডিজিটাল দুর্গটা ক্র্যাক করবে।
মতিলাল গভীর শ্বাস ছেড়ে বললেন, সত্যি, তোমরা দুটো ভাই না থাকলে তোমাদের মতিবাবু এইসব ক্রিমিনালদের সামনে তো খাবি খেতো হে।
বিক্রম বলল, অারে খাবেনই যদি, খাবি খাবেন কেন শুধুমুধু?
কথাটা বলার সময় বিক্রমের মজার সুর খেয়াল করে মতিলাল বললেন, সে তো বটেই, অাচ্ছা ব্রাদার, মল্লিকা কি ঠোঁটদুটোয় গোলাপি রঙ লাগিয়েছে নাকি বলো তো?
বিক্রম দুটো হাত ওপরে তুলে বলল, জানেন তো অামি সংসারে এক সন্ন্যাসী। কেন অাপনি অামাকে এইসব বেয়াড়া ইঙ্গিত করছেন মতিবাবু?
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে পিজির গলা ভেসে এল, ওটা অাপনার মত এলিজিবল ব্যাচেলরকে দেখে সব অবিবাহিত মেয়েদেরই হয় মতিবাবু। মেয়েদের মুখ কখন রক্তাভ হয়ে ওঠে জানেন তো? পছন্দের পুরুষ পার্টনার দেখে মাথায় রক্ত উঠে এলে।
খুকখুক করে হেসে মতিলাল বললেন, কিন্তু মেয়েটা যদি সত্যি এসবে জড়িত থাকে, তাহলে তো অামার মাথায় অন্যকিছু উঠে যাবে ভায়া।
