সকাল ৯.৩০
মতিলাল আর বিক্রম চেম্বারে বসে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দুটো খুঁটিয়ে দেখছিলেন। দুই মেয়ের রিপোর্ট হাতে থাকলেও মা চন্দ্রলেখার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট বিকেলে আসবে।
সামনে দাঁড়িয়েছিল শেখর আর রাঘব।
একটু অন্যমনস্কভাবে মতিলাল বললেন, বোসো তোমরা। নতুন কী তথ্য পেলে?
শেখর জানাল, স্যার, চন্দ্রলেখা যেদিন মার্ডার হলেন, সেই রাতে বিপ্লব একটা লোকাল মেডিক্যাল স্টোর-এ গিয়েছিল। আমাদের নজরদারি চলছিল, তাই কনস্টেবলরা ওকে ফলো করে।
বিক্রম মাথা তুলল, শুধু দোকানে? অন্য কোথাও গিয়েছিল?
রাঘব বলল, না। দোকানেই গিয়েছিল। সেখান থেকে সোজাসুজি প্যালেসে ফিরে আসে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার বেরিয়ে যায়।
মতিলাল কিছু একটা ভাবছিলেন, সেই ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, কী ওষুধ কিনতে গিয়েছিল ও?
শেখর একটু ইতস্তত করে বলল, ওষুধ নয় স্যার। এক প্যাকেট কনডম কিনেছিল ও।
মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন। কামেশ্বরের দিকে ফিরে বললেন, কামেশ্বর, তুমি তো বিবাহিত মানুষ। তিনটে বাচ্চা তোমার। একটা কথা বলো দেখি—কোনও মহিলা যদি পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট হয়, তবে কি আর কোনও প্রোটেকশন-এর দরকার পড়ে?
লাজুক কামেশ্বর মাথা নিচু করে জানাল, না স্যার।
বিক্রমের চোখ সরু হয়ে এল। বলল, তার মানে ওটা চন্দ্রলেখার জন্য ছিল না। অন্য কেউ আছে। বিপ্লবকে তোলা দরকার মতিবাবু।
শেখর জানাল, পুরনো চাকর তারকও চার মাস ধরে নিরুদ্দেশ। সে অসুস্থ হয়ে বর্ডারের কাছে নিজের গ্রামে পড়ে আছে। অর্থাৎ সেই বিশাল প্যালেসে এখন রয়েছে শুধু বিপ্লব আর ভজনলাল।
মতিলাল কড়া গলায় অর্ডার দিল, বিপ্লবকে তড়িঘড়ি তুলে আনো। আর প্যালেস সার্চ করার জন্য সার্চ ওয়ারেন্ট রেডি করো। আই ওয়ান্ট এভরিথিং ডান ইন ওয়ার ফুটিং।
এক ঘণ্টা পর যখন বিপ্লবকে চেম্বারে আনা হল, দেখা গেল, অাগে থাকতেই তার চোখমুখ কাঁচুমাচু হয়ে গেছে।
ঘরে ঢুকে সবার দিকে তাকিয়ে পর্যায়ক্রমে একবার মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার পর্ব সেরে সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল যে মনে হতে পারে ও ফাইনাল কনফেশনের জন্য তৈরি।
বিক্রম ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, বোসো বিপ্লব। অনেক কথা আছে। তারপর মতিলালের দিকে তাকিয়ে বলল, মতিবাবু অাপনি স্টার্ট করুন।
মতিলাল শুরু করলেন, বাবা বিপ্লব, কাল রাতে কোথায় ছিলে? তুমি তো ভাই বাড়িতে ছিলে না।
বোঝাই গেল, বিক্রম ইয়ার্কির মুডে রয়েছে, বলল, একবার ওকে বাবা বলছেন, পরক্ষণেই অাবার ভাই। কোনটা ঠিক মতিবাবু?
মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন, বাবাটা বলার পর মনে পড়ে গেল, ও তো চন্দ্রলেখার ভাই।
খোঁচাটা হজম করে বিপ্লব মতিলাল আর বিক্রমের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
বিক্রম ঠান্ডা গলায় বলল, আমরা জানি তুমি কোথায় ছিলে। শুধু তোমার মুখ থেকে কনফার্মেশনটা শুনতে চাই।
চোখে জল এসে গেল বিপ্লবের, স্যার, বিশ্বাস করুন আমি খুনের বিষয়ে কিছু জানি না।
মতিলাল হাসলেন, তোমাকে তো খুন নিয়ে কোনও প্রশ্ন করিনি বাছা। যে প্রশ্নটা করেছি, তার উত্তর দাও বিপ্লব।
বিপ্লব মাথা নিচু করে বলল, আমি একজনকে ভালোবাসি। আমরা বিয়ে করতে চাই। কাল রাতে আমি ওর কাছে গিয়েছিলাম। সোনাগাছিতে।
সোনাগাছির নাম শুনে শেখর ফোঁড়ন কাটল, প্রেমিকা কি সেক্স ওয়ার্কার?
বিপ্লব প্রতিবাদ করে উঠল, না স্যার! ওর মা আগে ওই লাইনে ছিলেন। মেয়েটি এখন ওখানে একটা এনজিও-তে কাজ করে। নাম রত্না। ওরা যৌনকর্মীদের সন্তানদের লেখাপড়া, হাতের কাজ শেখায়, এসব নিয়েই কাজ করে।
বিক্রম চোখের ইশারায় শেখরকে থামাল। কনডম রহস্য পরিষ্কার। রত্নার সঙ্গে বিপ্লবের ফিজিক্যাল রিলেশন আছে।
বিক্রম মতিলালের দিকে তাকিয়ে বলল, শেখর তাহলে কিছু মহিলা কনস্টেবল নিয়ে সোনাগাছি যাক। রত্নাকে পিক অাপ করে নিয়ে অাসুক। কী বলেন মতিবাবু?
মতিলাল বললেন, ঠিক, এদের দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে জেরা করার দরকার।
তারপর শেখরের দিকে তাকালেন, তবে রত্নার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে।
শেখর বেরিয়ে যাওয়ার পর বিক্রম অার মতিলাল চেপে ধরলেন বিপ্লবকে, তুমি গত তেরো বছর ধরে এই প্যালেসে আছো। সব জানো। শুরু থেকে সব বলো।
মতিলাল ইন্টারকমে অনুপমকে ডাকলেন। স্টেনোগ্রাফার টাইপরাইটার নিয়ে কোণে বসল। বিপ্লবের বয়ান রেকর্ড করা শুরু হল।
বিপ্লব বলতে শুরু করল, আমি বাইশ বছর বয়সে এখানে আসি। অভিনেতা হওয়ার শখ ছিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর ওই স্কুলে কাজ নিতে বাধ্য হই। স্কুলের সেক্রেটারি কানুলাল ভট্টাচার্য আর চন্দ্রলেখাদির বাব ব্যারিস্টার জয়ন্তনারায়ণ ভট্টাচার্য ছিলেন হরিহর আত্মা।
বিক্রম বাধা দিয়ে বলল, কানুলাল লোকটা কেমন ছিল?
খুব একটা সুবিধার নয় স্যার, বিপ্লব জানাল। ওর এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট বিজনেসের আড়ালে চলত গার্ল ট্রাফিকিং। বহুবার পুলিশ রেইড হয়েছে, কিন্তু শহরের একনম্বর ডিফেন্স ল-ইয়ার, বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার জয়ন্তনারায়ণের বুদ্ধিতে ও প্রতিবার ক্লিনচিট পেয়ে যেত। এই সম্পর্ক পোক্ত করতেই কানুলালের বড় ছেলে চন্দ্রশেখরের সঙ্গে চন্দ্রলেখার বিয়ে দেওয়া হয়। বয়সে ডিফারেন্স থাকলেও অাসলে দুই পরিবারের মধ্যে এটা ছিল অাসলে একটা বিজনেস ডিল।
মতিলাল মাথা নাড়লেন, বুঝলাম। টিপিক্যাল বিজনেস ম্যারেজ। তারপর?
কানুলাল আর জয়ন্ত দুজনেই মারা যান। চন্দ্রলেখা ম্যাডাম স্কুলের হেডমিস্ট্রেস হন। আমি তখন ওঁর বাড়িতে মেয়েদের পড়ানো আর ওভারঅল দেখাশোনার কাজ করতে আসি। শুরুর দিকে ব্যাপারটা অন্যরকম থাকলেও চন্দ্রলেখা পরে আমাকে দাস বানিয়ে রেখেছিলেন। ভয় দেখাতেন, ওর কথা শুনে না চলেল চাকরি চলে যাবে। মা নেই, বাবা নেই—কোথায় যেতাম স্যার?
রাঘব এবার ডাইরেক্ট প্রশ্ন করল, চন্দ্রলেখার সাথে তোমার কোনও ফিজিক্যাল রিলেশন ছিল?
বিপ্লব দু-হাতে মুখ ঢাকল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, হ্যাঁ। কিন্তু সেটা ছিল ওঁর ইচ্ছে মাফিক। ওই যে বললাম, আমি কেবল হুকুম পালন করতাম। ইট ওয়াজ এ ওয়ান-ওয়ে ট্রাফিক।
বিক্রম আর মতিলাল একে অপরের দিকে তাকালেন। কেসটা যে কেবল সম্পত্তির লোভ নয়, বরং একটা ডার্ক সাইকোলজিক্যাল জালের ভেতরে আটকে আছে—তা এখন স্পষ্ট।
