সকাল ১১.০০
রত্নাকে নিয়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাবে বললেও শেখরের সময় লেগে গেল প্রায় ঘন্টা দেড়েক।
এক তো কলকাতার ট্র্যাফিক, আর তার ওপর শীতকালে মানুষ একটু বেশি রাস্তায় থাকে। নানা ধরনের শোভাযাত্রা, মিছিলের হিড়িকটাও বাড়ে এই সময়।
চন্দ্রলেখা এখন অার নেই ঠিকই, কিন্তু মেয়েদের মৃত্যুতে ওর চরম উদাসীনতার কারণটা কী ছিল?
বিক্রম বলছিল, উদাসীনতার পেছনে কয়েকটা কারণ থাকতে পারে, তার মধ্যে একটা – ও জানত গোটা ঘটনাটা।
মতিলাল মাথা নেড়ে বললেন, কিছু কিছু মানুষের মধ্যে এমপ্যাথি নামক বিষয়টি একটু কম থাকে, ভায়া। ভালবাসার শক্তি সবার সমান হয় না।
রাঘব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মধ্যেই ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল শেখর। পেছনে এক তরুণী। বছর কুড়ির মেয়েটি ছিপছিপে, পরনে সাধারণ সুতির শাড়ি। চোখ দুটো ভাসাভাসা, বুদ্ধিদীপ্ত আর সতর্ক। রত্না।
বিক্রম ইশারায় রত্নাকে বসতে বলল।
মতিলাল মৃদু হেসে সৌজন্য দেখালেন, একটু জল খাবে মামণি?
রত্না মাথা নাড়ল। ঘরে ঢুকেই ও বিপ্লবকে দেখেছে। সেই থেকে ওর দৃষ্টি কোণে বসা বিপ্লবের ওপর। চোখে হাজারো প্রশ্ন।
বিক্রম সরাসরি মূল প্রসঙ্গে ঢুকল, বিপ্লব বলেছে কাল রাত ৯টা থেকে ও তোমার সঙ্গে ছিল। সোনাগাছিতে। তাই তো?
রত্না বিক্রমের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
ভেতরে ভেতরে একটু ঘাবড়ে পেলেও কথায় তা প্রকাশ পেল না, হ্যাঁ স্যার। ও ন-টার পরেই আমার ঘরে এসেছিল। ছিল সকাল পর্যন্ত।
এবার প্রশ্নের পালা মতিলালের, ওর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা দেখেছিলে? বা ও কি মাঝপথে ঘর থেকে বেরিয়েছিল?
রত্না বলল, না স্যার। ও সারা রাত আমার সাথেই ছিল। আমরা…, আমরা কথা বলছিলাম।
রাঘব পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, ও কি আসার আগে কোনও মেডিক্যাল স্টোর-এ গিয়েছিল? ওটা কি তোমাকে বলেছে?
রত্না একটু অবাক হল, মেডিক্যাল স্টোর? না, সেরকম তো কিছু বলেনি।
মতিলাল এবার একটু ঝুঁকে বসলেন, দেখো মামণি, এই প্রশ্নটা করতে তোমাকে ভালো লাগছে না। কিন্তু বিপ্লব বলেছে ও এক প্যাকেট কন্ডোম কিনেছে। তুমি কি সেটা জানতে?
রত্নার মুখটা রক্তাভ হয়ে উঠল। মুখ নামিয়ে বলল, দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার। আমরা… খুব শীগগিরই বিয়ে করব। তবে বিয়ের আগে তো বাচ্চা চাই না, তাই…।
মতিলাল হাত তুলে বললেন, ঠিক অাছে, ঠিক অাছে। অামরা ক্ল্যারিফিকেশন চাইছি না। কনফার্মেশনটা পাওয়ার দরকার ছিল।
বিক্রম আর মতিলাল একে অপরের দিকে তাকালেন। কন্ডোম রহস্যটা এবার পরিষ্কার। ওটা চন্দ্রলেখার জন্য ছিল না। কিন্তু একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। রত্না জানে না যে বিপ্লব দোকানে গিয়েছিল। তার মানে বিপ্লব সোনাগাছি যাওয়ার পথেই দোকানটা সেরে নিয়েছিল।
বিক্রম ও মতিলাল কিছুক্ষণ গলা নামিয়ে অালোচনা সেরে নিল।
তারপর মতিলাল বললেন, ঠিক অাছে, তুমি এখন যেতে পারো। তবে, অামরা না বলা পর্যন্ত কলকাতা ছেড়ে কোথাও যাবে না।
ফের বিপ্লবকে ডাকা হল।
বিক্রম বিপ্লবের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, বিপ্লব, তুমি রত্নাকে কেন বলোনি যে তুমি দোকানে গিয়েছিলে? বিপ্লব ঘেমে নেয়ে একসা। স্যার ওটা তো জরুরি কিছু নয়। আমি জাস্ট কিনে নিয়ে ওর কাছে চলে গেছিলাম।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরাসরি সোনাগাছি? মাঝখানে আর কোথাও দাঁড়াওনি? বিক্রমের চোখ বিপ্লবের ওপর স্থির।
হ্যাঁ স্যার। সরাসরি। মুখ নামিয়ে জানাল বিপ্লব।
বিক্রম এক মুহূর্ত থামল। ওর কম্যান্ডো ইনস্টিংক্ট বলছে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। বিপ্লবের অ্যালিবাই আপাতদৃষ্টিতে সলিড। রত্না ওকে ক্লিনচিট দিচ্ছে। কিন্তু বিপ্লবকে যতটা মিনমিনে ভাবা হচ্ছে, সেটা কি ওর ছদ্মবেশ? সে কি তলায় তলায় অন্য কোনও চাল চালছে?
বিপ্লবকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে বিক্রম বলল, মতিবাবু, ন-টার পর ও সোনাগাছিতে ছিল। কিন্তু মার্ডারটা ন-টার আগেও হয়ে থাকতে পারে কি না সেটা আমাদের দেখতে হবে। চন্দ্রলেখা হয়তো ন-টার আগেই শেষ হয়েছিল।
মতিলাল মাথা নাড়লেন, ঠিক বলেছো ভায়া। কিন্তু সোনাগাছিতে যাওয়াটা কি ওর স্রেফ একটা অ্যালিবাই ক্রিয়েট করার চেষ্টা? নাকি ওখানে ও সত্যিই অন্য কারও সাথে দেখা করতে গিয়েছিল?
বিক্রম জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের কুয়াশাটা কেটে বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে বিক্রম বলল, ওই ভুতুড়ে প্যালেসটাতে এখন একজনই বাকি। তার মুখ খোলা দরকার।
মতিলাল খুক খুক করে হাসলেন, ঠিক বলেছো ভায়া। ভজন সিং। ওঁর ষাট বছরের স্মৃতি এবার খুঁড়ে বের করতে হবে। দেখা যাক কোনও ক্লু মেলে কিনা?
