চ্যাপ্টার ৩: হাতে সময় কম

এসএসকেএম হসপিটালের ওয়ার্ডের দেওয়ালে নিয়ন ঘড়িটা একটা টক্সিক, সিকলি গ্রিন আলো ছড়াচ্ছে। 

রাত ৩:১৪।

বাইরে কলকাতার বৃষ্টি এখন রীতিমতো একটা মনসুন তাণ্ডবে পরিণত হয়েছে। জানলার লোহার গরাদে জলের ছাট আছড়ে পড়ছে ঠিক যেন হাজারটা রাগী নখ সমানে আঁচড় কাটছে ভেতরেও তাণ্ডব না চালাতে পারার ক্রুদ্ধ হতাশায়।

মেটাল বেডটার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন মতিলাল মিস্ত্রী। হাতে সময় কম, খুব দ্রুত জেরা সারতে হবে। প্লেন ধরার তাড়া রয়েছে।

প্রথাগত গোয়েন্দাদের মত কোনও ট্রেঞ্চ কোট পরে নেই মতিলাল। তাঁর ঠোঁটে নেই পাইপ বা সিগারেট। সস্তা সিনেম্যাটিক প্রপস ব্যবহার করে ভয় দেখানোর কোনও প্রয়োজন তাঁর হয় না। 

তাছাড়া মতিলাল স্মোকিং পছন্দ করেন না, তার মতে ওটা দুর্বল এবং আনডিসিপ্লিনড ব্রেনের লক্ষণ। তিনি অ্যাবসলিউট বায়োলজিক্যাল আর মেন্টাল পিউরিটিতে বিশ্বাস করেন। সেজন্য সব সময় তাঁকে দেখা যায় ইমপেক্যাবল ইস্ত্রি করা সাদা শার্ট, অ‍ার খাকি যোধপুরীতে।

খুব ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায়, তাঁর চোখের দৃষ্টি এমনই যা ফুটন্ত জলকেও নিমেষে জমিয়ে বরফ করে দিতে পারে।

দরজার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে বিক্রম, অন্ধকারের ভেতর আরেকটা অন্ধকার ছায়ার মতো। 

একদম স্টিল। ভালো করে খেয়াল না করলে বোঝাই যাবে না যে ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ঘরের পাহারায় থাকা দুজন আর্মড কনস্টেবল তাকে একদমই ভোলেনি। 

তারা রীতিমতো ঘামছে, আর বারবার আড়চোখে এক্স-কমান্ডোর দিকে তাকাচ্ছে। বিক্রম তাদের থ্রেট করেনি। এমনকি তাদের সাথে একটা কথাও বলেনি। ও জাস্ট এমন একটা কয়েলড, কাইনেটিক ভায়োলেন্সের স্টেটে দাঁড়িয়ে আছে, যা দেখে যে কোনও নরমাল মানুষের নিশ্বাস নিতেও ভয় লাগতে পারে। মনে হয় এই বুঝি কিছু একটা ঘটিয়ে দিতে পারে এই লোকটা।

বেডের ওপর শুয়ে আছে শ্যামল। 

তাকে এখন কোনো ক্রিমিনাল মাস্টারমাইন্ড নয়, বরং একটা ভাঙা, বাতিল খেলনার মতো দেখাচ্ছে। ডান কাঁধে ভারী ব্যান্ডেজ, মুখে কালশিটে আর শুকনো রক্তের দাগ। 

সিলিংয়ের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে, রুম ফোরটি টু-এর ঘটনার পর ওর স্পিরিট পুরোপুরি ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

কার্গো ফ্লাইট ছাড়তে কিন্তু আর উনচল্লিশ মিনিট বাকি, মতিলাল আর বিক্রমের ইয়ারপিসে পিজির গলা বেজে উঠল। 

কয়েক মাইল দূরে পিজি তার ব্যাকলিট মেকানিক্যাল কি-বোর্ডের ওপর ঝুঁকে আছে, ওর চশমার কাঁচের ওপর হেভিলি মডিফায়েড টার্মিনালের সবুজ কমান্ড-লাইনগুলো রিফ্লেক্ট করছে। 

পিজি বলল, অ‍ামারা মেসেজ পেয়ে পাইলট ঘামতে শুরু করেছে। ব্যাটা দু-টন প্রিমিয়াম দার্জিলিং চা নিয়ে যাচ্ছে, আর পুলিশ একদম দুচোখে দেখতে পারে না। র‍্যাপ ইট আপ অ্যানালগ বয়েজ।

পিজি সব সময়েই মজা করে বিক্রম ও মতিলালকে অ্যানালগ বয়েজ বলে ডাকে। 

ওকে ভায়া, ওকে অ‍ারও ঘামতে দাও। অ‍ামরা ঠিক পৌঁছে যাব, মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন।

মতিলাল এক পা এগিয়ে গেলেন। তিনি শ্যামলকে এক গ্লাস জল অফার করার জন্য এখানে অ‍াসেননি।

নীরব, মতিলাল নামটা উচ্চারণ করলেন। অন্ধকার কুয়োর ভেতর পাথর ফেলার মতো যেন শোনাল নামটা।

শ্যামল চমকে উঠল। 

ওর হার্ট রেট ট্র্যাক করা মেডিক্যাল মনিটরটা হঠাৎ স্পাইক করল, একটা প্যানিকড বিপ-বিপ-বিপ আওয়াজ শুরু হলো।

ও মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে, শ্যামল। তুমি যখন এখানে শুয়ে শুয়ে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছ, তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড তখন তোমার ভালোবাসার মানুষের গলায় স্টিলের তার পেঁচিয়ে তার শ্বাসরোধ করেছে। 

কথাগুলো বলার সময় মতিলালের গলায় কোনো এমপ্যাথি প্রতিধ্বনিত করল না। 

তিনি বললেন, জাস্ট পিওর, ডিস্টিলড লজিক। নন্দিনী জানত নীরব ওকে মারতে আসছে। কিন্তু তোমার মুখ চেয়ে, তোমাকে ভালবেসে ও ইচ্ছে করেই আমাদের জন্য একটা গিফট ছেড়ে গেছে।

মতিলাল নিজের ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিন সোয়াইপ করে সেই রক্তমাখা ট্রেনের টিকিট স্টাবের হাই-রেজোলিউশন ছবিটা বের করলেন, যেটা বিক্রম মেয়েটার স্নিকার্স থেকে পেয়েছিল। গ্লোয়িং স্ক্রিনটা শ্যামলের ক্ষতবিক্ষত মুখের একদম সামনে ধরলেন তিনি।

বারাণসী ক্যান্টনমেন্ট। একটা ডিজিটাল লকার (Digital locker), মতিলাল বললেন, ওদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্যই ও এই ম্যাপটা আমাদের দিয়ে গেছে। কিন্তু লেজেন্ড ছাড়া ম্যাপ কোনো কাজের নয়। বারাণসীতে কী আছে শ্যামল? তাড়াতাড়ি বলো। পাইলট ওদিকে ঘামছে।

শ্যামল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। ডান চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল ওর ধুলোমাখা গাল বেয়ে। তারপর, খুব ধীরে ধীরে, একটা অদ্ভুত পাগলের মতো হাসি হাসতে শুরু করল ও। 

বেরিয়ে এল একটা ভেজা, ঘড়ঘড়ে শব্দ, যেটা শেষ হলো একটা ভায়োলেন্ট কাশির দমকে।

আপনার কি মনে হয় এগুলো ছিল একটা পাতি ডাকাতি, চিফ? 

লেদার স্ট্র্যাপের বাঁধনের ভেতর হাঁপাতে হাঁপাতে শ্যামল বলল, আপনার কি মনে হয়, আমরা জাস্ট কয়েকটা লোভী গুন্ডা, যারা স্পোর্টস কার আর সোনার চেন কেনার জন্য ডাকাতি করছে?

আমার ধারণা তুই একটা পাতি চোর, যে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে খুন করিয়েছে, অন্ধকার কোণ থেকে বিক্রমের গলা ভেসে এল। গলাটা ফ্ল্যাট, কিন্তু কথাগুলো ওর পাঞ্চের চেয়েও জোরে হিট করল।

শ্যামল ওই ছায়াটার দিকে রাগে একবার কটমট করে তাকাল, তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, আমি কলকাতা ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক্সে গোল্ড মেডালিস্ট! 

ও প্রায় হিসহিস করে বলে উঠল, রাগে ওর গলা কাঁপতে লাগল, নীরব সাইকোলজিতে মাস্টার্স! বিভু মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার! আমরা সব কিছু নিয়ম মেনে করেছি! যখন শহর ঘুমোত, আমরা তখন পড়াশোনা করেছি। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের লাইনে রোদের মধ্যে পুড়েছি। আর তারপর গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়েছি ওইসব করাপ্ট ব্যুরোক্র্যাটদের কাছে, যারা একটা পাতি ক্লার্কের চেয়ারে বসার জন্যও দশ লাখ টাকা ঘুষ চায়!

শ্যামলের উত্তেজনায় হার্ট মনিটরটা তখন উন্মাদ রিদমে বিপবিপ করতে শুরু করল।

আমরা আইন ভাঙিনি, চিফ। আইন অ‍ামাদের ভেতর থেকে ভেঙেছে, কারণ ‍ওটা আগে থেকেই ভাঙা ছিল! সিস্টেম ইজ রিগড। এই সমাজ আমাদের যা দিতে বাধ্য, আমরা জাস্ট তার একটা ফ্র্যাকশন ছিনিয়ে নিয়েছি, আর তাতেই আমরা মনস্টার হয়ে গেলাম? 

হাতকড়ার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতে করতে শ্যামল বলল, ওর চোখের দৃষ্টি এখন পুরো বন্য প্রাণীর মত, আমরা কোনও পাতি ডাকাতের গ্যাং নই। আমরা হলাম এই করাপ্ট সিস্টেমের কনসিকোয়েন্স!

মতিলাল এক চুলও নড়লেন না। ঠাণ্ডা গলায় বললেন, তোমার এই আর্থ-সামাজিক থিসিসটা সত্যিই ফ্যাসিনেটিং, শ্যামল। কোনো জার্নালে পাবলিশ করে দিও। অথবা তার চেয়েও ভালো হয়, নন্দিনীর লাশের সামনে গিয়ে পড়ো। ভেবে দেখো, তোমার ডিগ্রিগুলো ওকে বাঁচাতে পারেনি ভায়া। তোমার এই ব্রিলিয়ান্স জাস্ট ওর পিঠে একটা টার্গেট এঁকে দিয়েছিল।

শ্যামল ধপ করে আবার বালিশের ওপর শুয়ে পড়ল। চোখের আগুনটা নিমেষে নিভে গেল। ওকে এখন ছোট পুতুলের মত দেখাচ্ছে।

নীরব ঠিকই বলেছিল, শ্যামল ফিসফিস করে বলল, গলাটা ভেঙে যাচ্ছে। ও বলেছিল, অ্যাটাচমেন্ট হলো লায়াবিলিটি। ও বলেছিল, এই সিস্টেমকে হারাতে গেলে সিস্টেমের চেয়েও বেশি কোল্ড হতে হবে।

বারাণসী, চটপট বলো। পাইলট ওদিকে ঘামছে। মতিলাল রিপিট করলেন, চিফ ডিটেকটিভের পেশেন্স এখন ডেঞ্জারাসলি কমতির দিকে। সেখানে আমাদের জন্য কী ওয়েট করছে?

একটা অস্ত্রাগার, শূন্য গলায় কনফেস করল শ্যামল, ওটা বিভুর প্লেগ্রাউন্ড। আপনারা ভাবছেন আপনারা ভায়োলেন্স দেখেছেন? বিভু সিন্দুক ভাঙার জন্য বম্ব বানায় না। ও বম্ব বানায় একটা স্টেটমেন্ট তৈরি করার জন্য। বারাণসী হলো ওদের স্টেজিং গ্রাউন্ড। ওরা একটা সেন্ট্রাল সার্ভার ফার্মে হিট করে স্টেটের ফিনান্সিয়াল রেকর্ডস পুরো ওয়াইপ আউট করে দেবে। আ কমপ্লিট ডিজিটাল রিসেট। সার্ভার লেভেলে রবিনহুড প্লে করবে ওরা।

আর লকারটা? বিক্রম তীক্ষ্ণ ফ্লুরোসেন্ট আলোর নিচে এসে জিজ্ঞেস করল।

ট্রিগার কোডস, শ্যামল জানাল। ফিজিক্যাল ব্যাকআপ-কি গুলো নন্দিনীর কাছে ছিল। আপনাদের কাছে যদি ওই টিকিটটা থাকে, তার মানে আপনাদের কাছে বিভুর এক্সপ্লোসিভের চাবি আছে। আপনারা চাইলে ওদের শাট ডাউন করতে পারবেন।

মতিলাল ইনফরমেশনটা ইনস্ট্যান্টলি ডাইজেস্ট করে নিলেন। লেটস গো, বিক্রম। ওই কোডগুলোর জন্য পিজিকে একটা ডিক্রিপশন অ্যালগরিদম প্রিপেয়ার করতে হবে।

মতিলাল আসামির দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এটা একটা ক্যালকুলেটেড ডিসমিসাল।

ওয়েট! শ্যামল আর্তনাদ করে উঠল। ওর গলায় এখন পিওর, টেরর। আপনারা আমাকে এখানে ফেলে যেতে পারেন না! আমাকে সলিটারি সেলে রাখুন। আমাকে লুকিয়ে রাখুন! নইলে ওরা অ‍ামাকেও মেরে ফেলবে।

মতিলাল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন, ভয় নেই। তুমি একটা ম্যাক্সিমাম-সিকিউরিটি প্রিজন হসপিটালে আছো ভায়া। বাইরে আর্মড পুলিশ আছে। ইউ আর পারফেক্টলি সেফ।

আপনারা নীরবকে চেনেন না! শ্যামল চিৎকার করে উঠল, ওর চোখদুটো স্টেরাইল ঘরটার এদিক ওদিক পাগলের মতো ঘুরছে। ও একটা সাইকোলজিক্যাল প্যারাসাইট! ও সব জায়গায় আছে! ও লোক কেনে। ভ্যারিয়েবল ম্যানিপুলেট করে। আই অ্যাম আ লুজ এন্ড!

বিক্রমের ভুরু কুঁচকে গেল। ব্ল্যাক-অপস ওয়ারফেয়ারে তৈরি ওর কমব্যাট ইন্সটিংক্ট হঠাৎ ট্রিগার করল। ঘরের মধ্যে কিছু একটা ফান্ডামেন্টালি রং মনে হচ্ছে। হাওয়াটা বড্ড স্ট্যাটিক। অ্যাটমোস্ফিয়ারটা হঠাৎ শিফট করে গেছে।

ওই নার্সটা, শ্যামলের নিশ্বাস কমে এল। ও নিজের ডান কাঁধের ব্যান্ডেজটার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল। ফিসফিস করে বলল, নাইট শিফটের নার্সটা… যে কুড়ি মিনিট আগে আমার ড্রেসিং চেঞ্জ করতে এসেছিল। সে আমার চার্ট দেখেনি। সে আমার আইভি মনিটর চেক করেনি।

বিক্রম চোখের পলকে মুভ করল। দুটো বিশাল স্ট্রাইডে বেডের কাছে পৌঁছে শ্যামলের ভালো হাতটা খপ করে চেপে ধরল।

কী করেছে সে? বিক্রম ডিমান্ড করল।

শ্যামল তখন ভায়োলেন্টভাবে কাঁপছে। ও নিজের বাঁ হাতটা আড়াআড়িভাবে নিয়ে গিয়ে ডান কাঁধের মোটা, রক্তমাখা ব্যান্ডেজের ঠিক নিচে পাগলের মতো আঙুল ঢোকাল।

ও নার্সটাকে পাঠিয়েছিল আমাকে একটা চয়েস দেওয়ার জন্য, শ্যামল ফিসফিস করল। ওর ফ্যাকাশে মুখে একটা উন্মাদ, ডেসপারেট হাসি ফুটে উঠল। হয় ওর অ্যাসাসিনদের হাতে একটা স্লো, যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু… নয়তো আমার নিজের শর্তে একটা কুইক ডেথ।

শ্যামলের আঙুল ব্যান্ডেজের ভেতর থেকে কিছু একটা টেনে বের করল। মাথার ওপরের ফ্লুরোসেন্ট আলোয় একটা মেটালিক ঝলক খেলে গেল—একটা সার্জিক্যাল স্কালপেল (Surgical scalpel)। ডেলিবারেটলি ওটা ব্যান্ডেজের নিচে রেখে যাওয়া হয়েছিল।

স্টপ হিম! মতিলাল ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করলেন।

কিন্তু শ্যামল তখন সেই মানুষের অ্যাবসলিউট টেররে ফিউয়েলড, যে জানে তার পুরনো বন্ধুরা ঠিক কতটা ভয়ংকর হতে পারে। বিক্রম ওর হাতটা পিন ডাউন করার আগেই, শ্যামল প্রচণ্ডফোর্সের সাথে স্কালপেলটা দিয়ে নিজের গলার নলিটা ফালাফালা করার চেষ্টা করল।

কিন্তু তার অ‍াগেই অদ্ভুত রিফ্লেক্সে বিক্রম অ‍াটকে দিয়েছে শ্যামলের হাত।

হার্ট মনিটরটা ইনস্ট্যান্টলি ফ্ল্যাটলাইন করতে করতে একবার ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। 

ইলেকট্রনিকালি প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার একটা লম্বা, একটানা আর্তনাদ শোনা গেল গোটা ঘর জুড়ে।

বিক্রম নিজের দুই হাত দিয়ে গলার কাটা অংশটা চেপে ধরল, নিজের সমস্ত মাসল পাওয়ার দিয়ে সার্ভাইভাল আর্টারিটা চিমটে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু লাভ হলো না। কাট-মার্কটা সার্জিক্যালি প্রিসাইজ। শ্যামল নিজের রক্তের মধ্যেই ডুবে যাচ্ছে।

মেডিক! গেট আ মেডিক ইন হিয়ার নাউ! দরজার বাইরের ওই আতঙ্কিত কনস্টেবলদের দিকে গর্জে উঠলেন মতিলাল।

শ্যামল একটা রক্তমাখা হাত দিয়ে বিক্রমের ট্যাকটিকাল জ্যাকেটটা খামচে ধরল। ওর চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেছে, জীবনটা বেরিয়ে যাচ্ছে মারাত্মক স্পিডে। ও এক্স-কমান্ডোকে একটু নিজের দিকে টানল, ওর ঠোঁটদুটো সাইলেন্টলি নড়ছে।

বিক্রম ঝুঁকে পড়ল, ওর কানটা শ্যামলের মুখের একদম কাছে।

বারাণসী… শ্যামল ঘড়ঘড় করে উঠল, ঠোঁটের পাশ দিয়ে রক্তের বুদবুদ বেরোচ্ছে। সেফহাউস … ডোন্ট… ডোন্ট কিক দ্য ডোর …

বিক্রমের জ্যাকেটের ওপর থেকে ওর গ্রিপটা আলগা হয়ে গেল। মাথাটা একদিকে লুটিয়ে পড়ল। অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক্সের গোল্ড মেডালিস্ট ইজ ডেড।

বিক্রম আস্তে আস্তে সোজা হয়ে দাঁড়াল। বেডসাইড টেবিল থেকে একটা স্টেরাইল টাওয়েল নিয়ে নিজের হাতের রক্তটা মুছল। ওর মুখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই, জাস্ট কোল্ড ফিউরির একটা মাস্ক। সে এক চুলও কাঁপে নি। মৃত্যুর এর থেকেও ভয়ঙ্কর রূপ ও দেখেছে।

মতিলাল ডেডবডিটার দিকে তাকিয়ে আছেন। এই সিচুয়েশনের লজিকটা খুব ব্রুটাল, কিন্তু আনডিনায়াবলি ব্রিলিয়ান্ট। হসপিটালের চৌকাঠ না পেরিয়েই নীরব সাকসেসফুলি শেষকৃত্য সম্পন্ন করে দিল।

বিক্রম নিজের ইয়ারপিসে ট্যাপ করে অডিও কানেক্ট করল।

পিজি, বিক্রম শান্ত গলায় বলল।

আই অ্যাম হিয়ার। এতক্ষণ সময় লাগাচ্ছিস কেন তোরা? পাইলট কিন্তু তোদের ফেলেই টেক অফ করে যাবে বলে থ্রেট দিচ্ছে।

বিক্রম বলল, তুই ওকে শান্ত কর। এখানে শ্যামল ইজ ডেড। স্মাগল করে আনা স্কালপেল দিয়ে এইমাত্র সুইসাইড করেছে ও। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন দিয়েছে।

লাইনের ওপারে একটা লম্বা পজ। এমনকি একজন হাইপারঅ্যাকটিভ হ্যাকারও নীরবের এই রুথলেস এফিশিয়েন্সিতে যেন নীরব হয়ে গেছে। 

শেষ পর্যন্ত পিজি বলল, ড্যাম। ইট প্রুভস নীরব ইজন্ট প্লেয়িং গেমস।

আমরাও খেলছি না, মতিলাল নিজের ক্রিস্প কাফ-দুটো ঠিক করতে করতে বললেন, পাইলটকে বলে দাও, সে যদি আমাদের ফেলে যায়, তবে আমি পার্সোনালি দায়িত্ব নিয়ে ওর চায়ের বাক্সগুলো হুগলি নদীতে ফেলে দেব।

মতিলাল বিক্রমের দিকে তাকালেন, চলো ভায়া, ফ্লাইট ধরতে আমাদের হাতে অ‍ার মিনিট কুড়ি সময় আছে। বারাণসী ইজ ওয়েটিং। তবে যেতে যেতে রাকেশকে বলে দিতে হবে অ‍াগের শিফটের নার্সটিকে ট্রেস করতে।

মরার আগে শ্যামল আমাকে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে গেছে, বিক্রম বলল, ওর চোখের দৃষ্টি এখন চকমকি পাথরের মতো শক্ত। শ্যামল বলল সেফহাউসের দরজায় যেন আমরা লাথি না মারি।

মতিলাল আস্তে করে মাথা নাড়লেন, কোনও অবস্থাতেই ওই কাজটা অ‍ামরা করতাম না। তবে পাজলের টুকরোগুলো ঠিক ঠিক জায়গায় বসছে। বিভু দ্য ইঞ্জিনিয়ার। ও দরজাটা ওয়্যার্ড করে রেখেছে। এটা তো প্রত্যাশিত।

ইয়েস, নিজের রিস্টওয়াচ চেক করে বিক্রম বলল। লেটস গো ডিসম্যান্টল আ বম্ব ইন বারাণসী।

Leave a Comment