সকাল ৯.৩০
রাঘব আর শেখর মতিলালের চেম্বারের বাইরেই ওয়েট করছিল।
কাম ইন বয়েজ, মতিলাল ওদের ভেতরে ডাকলেন।
চেম্বারে ঢোকার মুখেই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল পিজির নাম।
বিক্রম বলেই রেখেছিল, পিজির কাছে বেশ কিছু ইন্ট্রেস্টিং তথ্য অাছে।
বিক্রমের এই জিনিয়াস হ্যাকার বন্ধুটি এখন বিদেশে। ডেনমার্কে একটি অার্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ডেটা সেন্টার হচ্ছে, পিজিরই তত্ত্বাবধানে। বিশ্বের সবথেকে বড়, পরিবেশ বান্ধব ডেটা সেন্টার যা কিনা এই প্রথম।
পিজি নিখাদ জেন্টলম্যান, কিন্তু মতিলালের পেছনে লাগতে ছাড়ে না, যখনই কথা হবে, মতিলালকে বিয়ে করার জন্য ও কনভিন্স করার চেষ্টা করবে। পিজির মতে, আর দেরি করলে বড্ড লেট হয়ে যাবে।
মতিলাল বরাবরই পাল্টা প্রশ্ন করেন, ভায়া, এই টু লেট বলতে তুমি ঠিক কী বোঝাতে চাইছ?
পিজি জেন্টলম্যান মানুষ, তাই কখনওই কোনও খারাপ কথা মুখে আনে না, অারে মতিবাবু, অাপনি বুঝছেন না কেন, বিবাহিত সম্পর্কের সঙ্গে ফিজিক্সের একটা সম্পর্ক অাছে। অামি পরে দেখা হলে বুঝিয়ে বলব। যত বয়স বাড়বে, ততই অাপনার একটি অঙ্গ নুডলের মত হয়ে যাবে।
মতিলাল খুকখুক করে হেসে বলেন, সেদ্ধ করে নিলে শক্ত হবে না?
ওদের দুজনের মধ্যে এই খুনসুটি চলতেই থাকে, যদিও অাজকের ব্যাপারটা বেশ সিরিয়াস। তাছাড়া অনেক দূর থেকে ফোন করছে পিজি।
পিজি বলল, বিক্রমের সঙ্গে অামার কথা হয়েছে মতিবাবু। কিছু অাইডিয়া পেলেন? পরপর দুটো মাসে একই বাড়ির দুই বোন মার্ডার হয়ে গেল। ভেরি ইন্ট্রেস্টিং। কলকাতায় থাকতে পারলে খুব খুশি হতাম।
মতিলাল বিক্রমের দিকে তাকালেন, ফলে বিক্রমও এই কথোপকথনে যোগ দিল ওর ফোন থেকে।
এরই মধ্যে মতিলাল হাত তুলে রাঘব আর শেখরকে বসতে ইশারা করলেন।
মতিলাল বললেন, মার্ডারের পর ফ্যামিলি নিয়ে কিছু ইনফরমেশন জোগাড় করেছি। বুঝলে ভায়া, হিস্ট্রিটা কিন্তু বেশ চমকপ্রদ।
পিজি কিছুক্ষণ থেমে বলল, খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটির মা একটি স্কুলের হেডমিস্ট্রেস, তাই তো?
এবার বিক্রম বলল, হ্যাঁ, নাম চন্দ্রলেখা। অাজ ভোরে যার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর ছোট মেয়ে। মেয়েটির নাম চন্দ্রিমা। আর মাসখানেক আগে যে মেয়েটি মারা গিয়েছিল, সে ছিল এই মেয়েটিরই বড় বোন, তার নাম, চন্দ্রজা। ইন্টারেস্টিংলি, ওদের বাবার নাম ছিল চন্দ্রশেখর। তুই একটা জিনিস খেয়াল করেছিস, পুরো পরিবারটাই চাঁদের সঙ্গে কানেক্টেড। আশা করি ওরা লুনাটিক ছিল না।
ফোনের উল্টোদিকে পিজির চাপা হাসির শব্দ পাওয়া গেল।
মতিলাল খুকখুক করে হেসে বললেন, হয়তো ছিল। বলা মুস্কিল। চেক করতে হবে।
তবে মেয়েগুলির বাবা ছিলেন কলেজের প্রফেসর, দশ বছর আগে মারা গেছেন। ফ্যামিলিটা আপাতদৃষ্টিতে খুব একাডেমিক, কিন্তু,,,
কিন্তু কী মতিবাবু? পিজি জিজ্ঞেস করল।
মতিলাল বললেন, পুরো ডিটেইলস এখনও হাতে আসেনি। বড় মেয়ে মারা যাওয়ার পর মা কেন নিজে থেকে পুলিশের সাথে কন্টাক্ট করলেন না, বা থানায় এলেন না, সেটা অামার কাছে তখন বেশ উইয়ার্ড লেগেছিল। আমরা আজ বিকেলে ওঁর বাড়ি যাচ্ছি। উনি দেখা করতে রাজি হয়েছেন। দুটি মেয়ের ঘরই এখন অাপাতত সিল করে রাখা হয়েছে।
পিজি নিচু গলায় বললেন, ওকে মতিবাবু, বিক্রম অামাকে ওদের ফোন নম্বরগুলো সবই পাঠিয়েছে। অামি দেখে নিচ্ছি, কোনও ইন্ট্রেস্টিং তথ্য পেলেই অাপনাদের জানাব।
ফোনটা রাখার পর মতিলাল রাঘব আর শেখরের দিকে তাকালেন।
জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের এক্সট্রা কাউকে লাগবে?
শেখর মাথা নাড়ল, না স্যার। আমরাই এটা ক্র্যাক করব।
শেখর অার রাঘব একসঙ্গে বিক্রমের দিকে তাকিয়ে হাসল, শেখর বলল, বিক্রম স্যার অাছেন, অাপনি অাছেন, অাপনারা শুধু অামাদের একটু লিড করবেন। শুধু বলে দেবেন কী করতে হবে।
রাঘব বলল, এই অপারেশনের একটা যুৎসই নাম দেবেন না স্যার?
মতিলাল বিক্রমের দিকে তাকালেন, ভায়া, একটা নাম ভাবো।
বিক্রম বলল, অপারেশন চন্দ্রবংশ হলে কেমন হয়?
তিনজনেরই মাথা নড়ে উঠল। মুখে হাসি।
মতিলাল বললেন, ভেরি গুড। একই বাড়ির দুটি বোনকে ঠিক এক মাসের ব্যবধানে খুন করা হয়েছে, একই কায়দায়। ফ্যামিলি মার্ডার। ফলে এটাই ঠিকঠাক নাম।
একমাস অাগে খুন হওয়া বড় বোন চন্দ্রজার ফাইলটা এগিয়ে দিল রাঘব।
সেবারেও কামেশ্বরের তৈরি সুরতহাল রিপোর্ট পোস্টমর্টেমের সাথে হুবহু মিলে গিয়েছিল।
চন্দ্রজা ছিল দিদি। তাকে ঘুমের অাগে সিডেটিভ দেওয়া হয়েছিল।
ও যখন গভীর ঘুমে অাচ্ছন্ন, তখন তার মধ্যেই তাকে শ্বাসরোধ করে মারা হয়।
সেবারেও কোনও ফিজিক্যাল ভায়োলেন্সের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
খুনীরা প্রফেশনাল। মেয়েটির শরীরের প্রতি ইন্টারেস্টেড ছিল না। স্রেফ প্রফেশনাল খুনিদের মতো কাজ সেরেছে। লাশ ফেলার ধরণ আর সেই একই পাটের বস্তা, সবটাই একটা প্যাটার্ন ফলো করছে।
মতিলাল বললেন, বাড়িটাতে চব্বিশ ঘণ্টার নজরদারি চাই। এখন থেকেই শুরু করে দাও। কে আসছে, কে যাচ্ছে, সব ইনফরমেশন আমার দরকার। চন্দ্রলেখার ওই বাড়িতে আর কে কে আছে, রাঘব?
রাঘব জানাল, চন্দ্রলেখা ছাড়া বাড়িতে দুজন পুরনো লোক আছে, তারক আর ভজনলাল সিং। কিন্তু স্যার, আরও একজন আছে যার কথা আমরা আগের মার্ডারের সময় তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি।
কে সে? মতিলাল ভুরু কুঁচকালেন।
শেখর বলল, বিপ্লব। চন্দ্রলেখার স্বামী মারা যাওয়ার আগে থেকেই লোকটা ওই বাড়িতে থাকছে। প্রায় দশ-বারো বছর হয়ে গেল।
বিক্রম জিজ্ঞেস করল, চন্দ্রলেখার কোনও রিলেটিভ?
না স্যার, রাঘব যোগ করল। সে ওই স্কুলেরই ফিজিক্যাল এডুকেশন টিচার যেখানে চন্দ্রলেখা হেডমিস্ট্রেস। বছর বত্রিশ বয়স। আমরা আগে ওকে সন্দেহ করেছিলাম, কিন্তু পরে চন্দ্রজার কলেজের বন্ধুদের সাথে কথা বলে অন্য একটা অদ্ভুত জিনিস জানতে পারি।
কী? বিক্রম অার মতিলাল, দুজনেই এবার সোজা হয়ে বসল।
রাঘব বলল, চন্দ্রজা মারা যাওয়ার ঠিক আগে ওকে একজন অল্পবয়সী সন্ন্যাসী আর একজন মাঝবয়সী মহিলা সন্ন্যাসিনীর সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। তিন দিন পর ওদের একটা রেস্টুরেন্টেও দেখা যায়। মতিলাল অবাক হলেন, তবে কাউন্টার লজিক পেশ করলেন, হয়তো ডোনেশন চাইছিল?
এবার শেখর বলল, না স্যার। দ্বিতীয় মিটিংয়ের পর চন্দ্রজার বন্ধুরা বলেছিল ওকে খুব উত্তেজিত আর রাগী দেখাচ্ছিল। যেটা ওর ন্যাচারাল ক্যারেক্টার নয়। শেষবার ওদের একসাথে বাসে করে কোথাও যেতেও দেখা গেছে।
মতিলাল উঠে দাঁড়িয়ে জানলার কাছে গেলেন। বাইরে একটা পুরনো চার্চ দেখা যায়। আর কলকাতার রাস্তায় মানুষের ভিড় থাকবে না এ তো হয় না। অার শীতকালে সকালে বা দুপুরে মানুষ বেশি রাস্তায় বেরয়।
বিক্রম বলল, তোমরা তো প্রথম মার্ডারের পর ওদের বাড়িতে গেছিলে। তখন কি বোন চন্দ্রিমার সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছিল?
রাঘব বলল, চন্দ্রজার মা চন্দ্রলেখা কথা বলতে দেননি। আর মায়ের সামনে চন্দ্রিমাও মুখ খোলেনি।
মতিলাল জানলার ধার থেকে ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন। বললেন, ওই বিপ্লব নামক লোকটিকে একটু ফোকাস করতে হবে।
শেখর বলল, বিপ্লব সম্পূর্ণ আউটসাইডার স্যার। স্কুলের সেক্রেটারি ওর রিলেটিভ। সেই সুপারিশে চাকরি পেয়েছিল। নাম কা ওয়াস্তে ফিজিক্যার এডুকেশনের টিচার করা হলেও অাসলে ও ছিল বেয়ারার মত। খুব একটা শিক্ষিত না হলেও লোকটা বেশ হ্যান্ডসাম। বাইশ বছর বয়সে সে ওই বাড়িতে থাকতে আসে। মানে চন্দ্রলেখাই তাকে ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিয়ে অাসে। যুক্তিটা ছিল, তাঁর স্বামী চন্দ্রশেখর যেহেতু অসুস্থ, ফলে ছোট ছোট মেয়েদুটিকে দেখাশোনা করা, পড়ানো বা বাড়ির তদারকি করার জন্য একটি শক্তসমর্থ পুরুষ মানুষের প্রয়োজন।
মতিলাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, শক্তসমর্থ পুরুষ মানুষের প্রয়োজন হয় অনেক কারণেই, ভায়া।
এই কথায় শেখর ও রাঘব মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হাসল তো বটেই, যে বিক্রম খুব রেয়ারলি হাসে, তার মুখেও এক চিলতে হাসি ভেসে উঠেও মিলিয়ে গেল।
শেখর বলল, খুব একটা খারাপ বলেননি স্যার। চন্দ্রলেখার স্বামীর সাথে বয়সের গ্যাপ ছিল ২৫ বছর। মেয়ে দুটো জন্মানোর পর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনও ফিজিক্যাল কন্টাক্ট ছিল না বলেই অামরা জানতে পেরেছি। কারণ চন্দ্রশেখর অসুস্থই থাকত বেশিরভাগ সময়।
তার মানে বিপ্লবই ছিল চন্দ্রলেখার সব কাজের কাজি? ওর ডোমেস্টিক হেল্প? মতিলাল ইনোসেন্টলি জিজ্ঞেস করলেন।
শেখর হাসল, শুধু তাই নয় স্যার। বিপ্লব মেয়ে দুটোকে পড়াতো। পরে চন্দ্রলেখা ওকে বাজার হাট করতে পাঠাত। সেই সময় এমনই জেনেছিলাম অামরা।
মতিলাল মাথা নাড়লেন। তিনি বিক্রমের দিকে একবার তাকালেন।
তারপর বললেন, প্রথম খুনের সময় কেসটাকে তোমরা সিরিয়াসলি নাওনি ভায়া। ভেবেছিলে প্রেমের গল্প বা ছোটখাটো কোনও ঘটনা। কিন্তু এখন দেখছো তো পুরো ম্যাপটা বদলে গেছে। চন্দ্রিমাকেও ওর দিদির মত একই ভাবে মরতে হয়েছে। ডাবল হোমিসাইড তো অাছেই, তার ওপর অামাদের দেখতে হবে এই চন্দ্রবংশটির কতটা ভূমিকা রয়েছে এই ডাবল মার্ডারে।
মতিলাল ঘড়ি দেখে যোগ কররেন, ওকে, বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা ওদের বাড়ি যাব। আমি নিজে কথা বলতে চাই।
শেখর মনে করিয়ে দিল, স্যার, এখন শীতকাল। সাড়ে চারটে-পাঁচটা নাগাদ দিনের আলো কমে যাবে।
বিক্রম বলল, ঠিক একটু অাগেই যাওয়া যাক।
মতিলাল মাথা নাড়লেন, ওকে, তাহলে সময়টা বদলে সাড়ে তিনটে করে দাও। চন্দ্রলেখাকে ফোন করে টাইমটা জানিয়ে দাও।
মতিলাল যখন বাড়ির দিকে রওনা হলেন, তখনও জানতেন না যে বিকেলে তাঁর জন্য কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।
