অনলাইন স্টোর গোয়েন্দা বিক্রম, চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রী ও জিনিয়াস হ্যাকার পিজির যাবতীয় বড়দের ক্রাইম থ্রিলার এখন পাওয়া যাচ্ছে Notion Book Store -এ। বইগুলো দেখুন →

অফলাইন স্টোর কলেজ স্ট্রিটে সমস্ত বই এখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। বুক ফ্রেন্ড। ৮/১/বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, (মিত্র ঘোষের গলি, কফি হাউসের ঠিক পাশে)। ফোন - ৮৭৭৭৪২১১৪২

১১. শ্বাসরোধ ও পাঁচ মাসের ভ্রূণ | বিষকন্যা রহস্য

সকাল ৯.০০

গতরাতে ভট্টাচার্য প্যালেস থেকে বেরতে বেরতে রাত গড়িয়ে গিয়েছিল। 

অতবড় একটি বাড়িকে এখন যেন জেলখানার মত লাগে। 

বিক্রম ও মতিলালকে গেট পর্যন্ত ছাড়তে এসেছিল বিপ্লব ও ভজন। 

বিপ্লব একবার মতিলালকে বলার চেষ্টা করেছিল, স্যার অ‍ামরা দুজনেই নির্দােষ। 

মতিলাল তাঁর সেই খুকখুকে হাসিটা দিয়ে বলেছিলেন, কে দােষী, কে নির্দােষ, তা তো বাপু ঠিক করবে অ‍াদালত। অ‍ামাদের কাজ তথ্য সংগ্রহ করা। সেগুলো কোর্টে পেশ করা। তারপর মহামান্য অ‍াদালত যা ভাল মনে করবে, তাই হবে। 

বিক্রম বিপ্লবের পিঠে হাত রেখে বলেছিল, তুমি ভাই কিছু লুকি‍ও না। তুমি যাই লুকোও না কেন, তা ঠিকই বেরিয়ে অ‍াসবে। অ‍ামরা ঠিকই খুঁজে বের করব। 

ভট্টাচার্য প্যালেস থেকে বেরিয়ে আসার পরেও বেশ কিছুক্ষণ ওরা চুপ করেছিল। 

প্রথম কথাটা বললেন মতিলাল, কী মনে হচ্ছে ভায়া?

বিক্রম বলল, বিপ্লব কাউকে একটা ভয় পাচ্ছে। ওর লাইন ইন্টারসেপশনে রাখুন, পাশাপাশি অ‍ামি পিজিকে বলছি, কিছু একটা ব্যবস্থা করতে। 

মতিলাল বললেন, তোমার ওই জিনিয়াস হ্যাকার বন্ধুটিকে কলকাতায় পার্মানেন্টলি অ‍ানার ব্যবস্থা করা যায় না?

গাড়ির জানলা দিয়ে অ‍াসা রাস্তার অ‍ালোতে দেখা গেল, বিক্রম হাসছে। 

মতিলাল বললেন, কী ব্যাপার বলোতো, তোমার হাসিটা যেন সন্দেহজনক ঠেকছে। 

বিক্রম মতিলালের দিকে ফিরে বলল, পিজি পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে অ‍াসছে। তল্লাশি অ‍ার জেরা চলাকালীন অ‍াপনাকে খবরটা দিতে পারিনি। তিনটে শহর অ‍াপাতত বাছা হয়েছে। কলকাতা, মুম্বই অ‍ার চেন্নাই। এটা নিয়ে অ‍াপনার সঙ্গে পরামর্শ করব। তবে বিদেশের পাট পুরোপুরি চুকিয়ে ফেলার অ‍াগে ওকে কিছু ফর্মালিটি সারতে হবে। ততক্ষণ এই কেসটাতে ও বাইরে থেকেই সাপোর্ট দেবে। 

মতিলাল বললেন, ভেরি গুড। 

গতরাতে বিক্রম ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি। 

স্বপ্নে বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল চন্দ্রলেখার দুই মেয়ের মুখ। কুয়াশার ভেতর থেকে ওরা যেন কিছু একটা বলতে চাইছিল, কিন্তু কেউ যেন পেছন থেকে ওদের টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছিল অন্ধকারে। কনকনে শীতের রাতেও বিক্রম যখন উঠে বসে একগ্লাস জল খেল, দেখল কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

বিক্রমের মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল জয়ন্ত নারায়ণের সেই ডায়েরির শব্দগুলো—J issue resolved. Doctor B complication. Handled it. Package delivered to Odisha. Safe. 

সকালে খুব স্বাভাবিকভাবেই ডায়েরির প্রসঙ্গটাই উঠল সবার অ‍াগে। মতিলালের বাংলোর বারান্দায় বসে বিক্রম বলল, মতিবাবু, কোডগুলো এখন আর অতটা ক্রিপ্টিক মনে হচ্ছে না। 

মতিলাল কফিতে চুমুক দিয়ে বলে উঠলেন, একটা চেইন রিঅ্যাকশন কাজ করছে, বুঝলে ভায়া। প্রথমে জগনের অস্বাভাবিক মৃত্যু। সেকেন্ড, ডাক্তার বিশ্বাসের অ্যাক্সিডেন্ট। থার্ড, ওড়িশার শঙ্কর মহারাজের আশ্রমে সেই রহস্যময় প্যাকেজ ডেলিভারি।

বিক্রম যোগ করল, অ‍ার সবকিছুর কেন্দ্রে চন্দ্রলেখার সেই রহস্যময় অসুস্থতা। 

অসুস্থতা নাকি অন্য কিছু? জগন কি এমন জানত, বা কীভাবে ব্যাপারটার সঙ্গে ইনভলবড হয়ে পড়েছিল যে যার জন্য ওকে মরতে হল?

লাঞ্চের ঠিক আগে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন এল। চন্দ্রলেখার পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট রেডি। 

রাঘব জানাল, শেখর গেছে স্যার, ওটা নিয়ে আসতে।

মিনিট পনেরো পর শেখর যখন একটা মোটা খাম নিয়ে ঘরে ঢুকল, তখন ওর চোখমুখ থমথমে, গম্ভীর। 

মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন, ভায়ার ভাবগতিক ভাল নয়। বাচ্চা ছেলে তো, সব দেখেশুনে ঘাবড়ে গেছে। 

খামটা খুলে বিক্রম আর মতিলাল রিপোর্টটা পড়তে শুরু করল। 

নিথর দেহের সেই ক্লিনিক্যাল বর্ণনা আসলে একটা ভয়ংকর নিষ্ঠুরতার দলিল।

  • কজ অফ ডেথ (Cause of Death): ম্যানুয়াল স্ট্র্যাঙ্গুলেশন। গলায় প্রচণ্ড চাপ দিয়ে ট্রাকিয়া (শ্বাসনালী) গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
  • লিগেচার মার্কস (Ligature marks): গলার দাগগুলো খুব আবছা। মনে হচ্ছে প্রথমে ওড়না বা ওই জাতীয় নরম কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল, পরে খুনি সরাসরি হাত দিয়ে শ্বাসরোধ করেছে।
  • টাইম অফ ডেথ (Time of Death): ৯ এবং ১০ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি রাত ১২টা থেকে ৩টের মধ্যে।
  • ধস্তাধস্তি: একদম নগণ্য। কবজিতে সামান্য কালশিটে আছে, যা দেখে মনে হয় হাত চেপে ধরা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ লড়াইয়ের কোনও চিহ্ন নেই।

বিক্রম রিপোর্টটা রেখে বলল, তার মানে খুনি চন্দ্রলেখার পরিচিত কেউ, যাকে উনি প্রথম দিকে থ্রেট মনে করেননি। অথবা কিলার সংখ্যায় একের বেশি ছিল।

রাঘব বলল, স্যার, টাইম অফ ডেথ বলছে বিপ্লব তখন সোনাগাছিতে ছিল। ওর অ্যালিবাই তো সলিড।

অ্যালিবাই সলিড মানেই ও নির্দোষ নয় রাঘব, মতিলালের গলায় কাঠিন্য। 

বিক্রম বলল, মার্ডারটা ও নিজে করেনি ঠিকই, কিন্তু পুরো ঘটনার ব্লু-প্রিন্ট ওর মাথাতেও থাকতে পারে। হয়তো দরজা ওই খুলে দিয়েছিল। কারণ, কোনও ফাের্সড এন্ট্রির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

ঠিক এই সময় রিপোর্টের শেষ অংশটা মতিলালের চোখ টানল। ওটাই আসল বম্ব-শেল

প্রেগন্যান্সি কনফার্মড। গর্ভে প্রায় পাঁচ মাসের ভ্রূণ।

পাঁচ মাস? রাঘব আঁতকে উঠল। একজন বিধবা মহিলা, তাঁর এই বয়সে…

মতিলাল বললেন, পাঁচ মাস বলে সে কোনও সাতে-পাঁচে থাকবে না এমন তো ভাবার কোনও কারণ নেই। 

বিক্রম মাথা নাড়ল, বাবার পরিচয় জানাটা খুব জরুরি। ওটা ডিএনএ থেকেই জানাও যাবে। কিন্তু তার অ‍াগে তো সাসপেক্টকে অ‍ামাদের হাতে চাই। কি মতিবাবু, ঠিক বলেছি তো?

মতিলাল গম্ভীর হয়ে বললেন, ঠিক দিকেই হাঁটছ ভায়া। তবে ম্যানুয়াল স্ট্র্যাঙ্গুলেশন একটা খুব ইন্টিমেট আর ব্রুটাল খুনের পদ্ধতি। দুই মেয়ের মার্ডার ছিল প্রফেশনাল হিট। কিন্তু চন্দ্রলেখার খুনটা বড্ড ব্যক্তিগত। আক্রোশ আর রাগের বহিঃপ্রকাশ পরিষ্কার। এটাই অ‍ামাকে ভাবাচ্ছে।

বিক্রম বলল, কে ছিল ওই সন্তানের বাবা? সে কি চাইছিল না বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসুক? 

মতিলাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কেসটা বড্ড মেসি হয়ে গেল ভায়া। কিলার কোনও প্রফেশনাল নয়, অন্তত চন্দ্রলেখার ক্ষেত্রে তো বটেই। খুনী খুবই পরিচিত কেউ, যে ওর খুব কাছে পৌঁছতে পারত।

বিক্রম টেবিল থেকে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

তারপর ঘুরে এসে বসে বলল, আমাদের হাতে এখন তিনটে বড় কাজ। প্রথম, সেই ডাক্তার বিশ্বাসের পরিবারকে খুঁজে বের করা। দ্বিতীয়, ওড়িশার সেই শঙ্কর মহারাজ। আর সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট—কুড়ি বছর আগেকার জগনের অটোপসি রিপোর্ট। ভট্টাচার্য প্যালেসের ডার্ক হিস্ট্রির চাবিকাঠি হয়ত ওখানেই লুকানো আছে।

মতিলাল বললেন, রাঘব অ‍ার শেখর, দুজনেই ভাল করে শুনে নিয়েছ। এবার কাজ ভাগাভাগি করে নাও। দুটো অ‍ালাদা টিম করো। ও হ্যাঁ, অ‍ার‍ও একটা ব্যাপার। জগনের অটোপসি যে ডাক্তার করেছিল, তাকেও খুঁজে বের করো। 

বিক্রম মাথা ঝাঁকাল, ঠিক, ঠিক। ওটা খুব জরুরি। সেই ডাক্তার ভদ্রলোকও বেঁচে থাকলে হয়।

মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন, খারাপ বলোনি ভায়া। এখন বোঝা যাচ্ছে অ‍ামাদের কতগুলো কমন মিস-কনসেপশন অ‍াছে। যেমন শিক্ষিত লোক মানেই সেই মানুষটা ভাল হবে। এমন হয় না। এই ধরো চন্দ্রলেখার বাবা, জয়ন্তর কথা। বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার। সেই সময় কলকাতার এক নম্বর ডিফেন্স ল-ইয়ার। কিন্তু তার কাজগুলো দেখো। কী কী করেছে? এখন একটাই প্রশ্ন, ওর সঙ্গে সেই সময় অ‍ার কে কে ছিল?

বাইরে কুয়াশাটা সরে গিয়ে শীতের রোদের তেজ বাড়ছে, সেই অ‍ালোর কিছুটা যেন এসে পড়েছে ইনভেস্টিগেশনের ঘন অন্ধকারের ওপর। কিন্তু রহস্যের জট খুলছে কই?

লেখাটি ভালো লাগলো?

এই থ্রিলার মাল্টিভার্সকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাতে চাইলে সাপোর্ট করতে পারেন।

কীভাবে সাপোর্ট করবেন? →

Leave a Comment