দেওয়াল-জোড়া মনিটরে লাল মার্কারটা দপদপ করছে। বিশ্বাসঘাতকতার একটা ডিজিটাল সংকেত যেন অালো ফেলছে খোদ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ওপর।
কনকনে ঠান্ডা সার্ভার রুমে হাত গুটিয়ে বসে নেই পিজি। মেকানিকাল কি বোর্ডে ওর অাঙুল উড়ছে ঝড়ের গতিতে।
নিস্তব্ধতাটা একটা ধনুকের ছিলার মতো টানটান।
বিক্রমের চোখ স্ক্রিনের ওপর স্থির। এক্স-কম্যান্ডোর মস্তিষ্ক অলরেডি ক্যালকুলেট করতে শুরু করেছিল, কত দ্রুত সে হেডকোয়ার্টার্সের চারতলায় ব্রীচ করে সার্ভার রুমটা সিকিওর করতে পারবে। কিন্তু তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, কোথাও একটা খটকা লাগছে মতিবাবু।
মতিলাল মিস্ত্রী মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক।
তিনি খুব শান্তভাবে নিজের গরম জলের গ্লাসটা তুলে নিয়ে মেপে এক চুমুক খেয়ে বললেন, একমত। ব্যাপারটা এত সহজ নয়। তারপর বললেন, এটা একটা জবরদস্ত ফ্যান্টম, পিজি ভাই। একটা ছায়া।
মতিলালের গলায় কোনো প্যানিক বা আতঙ্কের লেশমাত্র নেই।
কিবোর্ডের ওপর ভাসমান আঙুলগুলো থামিয়ে পিজি বলল, কিন্তু মতিবাবু, এই ট্রেসটা একদম সলিড। ডেটা প্যাকেটটা সিআইডি সার্ভার র্যাকের একটা সিকিওর আইপি থেকেই বেরিয়েছে। ভেতরে বসে কেউ একজন এই সিরিয়াল স্নাইপারের লজিস্টিকস সামলাচ্ছে, এই যুক্তিটা ঠিক অামিও মানতে পারছি না।
ঠিক বলেছো ভায়া, ডিজিটাল এই অসঙ্গতির ওপর নিজের কোল্ড আর মেকানিক্যাল লজিকটা প্রয়োগ করে মতিলাল বললেন, অামাদের নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার ভীষণ পুরোনো। ওটা পাথরের তৈরি একটা দুর্গ হতে পারে, কিন্তু ওর ডিজিটাল দেওয়ালগুলো কাগজের তৈরি। মল্লিকা বা ওই ভূতটা যদি সিকিওরভাবে স্নাইপারের অ্যামিউনিশন কিনতে চাইত, তবে তারা এমন কোনো সরকারি আইপি ব্যবহার করত না যা প্রতিটি কিস্ট্রোক লগ করে রাখে। তারা একটা নির্দিষ্ট কারণেই প্রক্সিটা লালবাজারের মধ্যে দিয়ে রাউট করেছে।
যাতে কোনও প্রমাণ না থাকে, কথাটা বলার সময় বিক্রমের চোখদুটো সরু হয়ে গেল। বলল, তার মানে ওরা অামাদের প্যারালাইজ করে দিতে চাইছে একেবারেই শুরুতে।
এক্স্যাক্টলি, বিক্রমের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন মতিলাল, মল্লিকা খুব ভালো করেই জানে যে আমি কাউকে বিশ্বাস করি না। ও জানে, আমার নিজের হেডকোয়ার্টার্সের ভেতর কোনো পিং পেলে আমি সাথে সাথে পুরো বিল্ডিং লক-ডাউন করে দেব। আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা আমি নিজের অফিসারদের জেরা করব, সিআইডি সার্ভার তছনছ করে ঘরের ইঁদুর খুঁজব।
পিজির বলে উঠল, আর সেই সুযোগে মেয়েটা ব্যাকগ্রাউন্ডে আসল প্রমাণগুলো নিশ্চিন্তে মুছে ফেলবে। এটা একটা ডিজিটাল রেড হেরিং। একটা আয়নার কারসাজি মাত্র।
নিজের জ্যাকেটের বোতাম আটকাতে আটকাতে মতিলাল বললেন, মল্লিকা রূপোর থালায় সাজিয়ে তেলেঙ্গানার ক্যাপ্টেন অর্জুন বর্মাকে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে। ও সাইকোলজিকাল প্রোফাইলটার ওপর বড্ড বেশি জোর দিচ্ছিল। ও চায় বর্মাকে নিয়ে ও যখন ডিল করবে, তখন আমরা যেন কলকাতায় নিজেদের লেজ কামড়ে গোল গোল ঘুরি। কিন্তু আমরা ওকে সেই সুযোগটা দিচ্ছি না। আমরা তেলেঙ্গানাতেই যাচ্ছি। গিয়ে দেখা দরকার, আমাদের প্রোফাইলার ঠিক কী ধরনের ফাঁদ পেতে রেখেছে। পিজি ভাই, প্লিজ অামাদের জন্য কাছাকাছি ফ্লাইটের দুটো টিকিটের ব্যবস্থা করো।
একটু পরেই পিজি বলল, ডান। অাপনারা এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়ে যান। অামি কিছু পেলে সঙ্গে সঙ্গে জানাব।
ঠিক তিন মিনিটের ভেতর মতিলালের গ্যারেজ থেকে কালো এসইউভিটা রওনা হয়ে গেল বিমানবন্দরের দিকে।
রাতের অন্ধকার নামতেই মতিলাল আর বিক্রম প্রায় তিনশো মাইল দক্ষিণে, নাল্লামালা ফরেস্টের এবড়োখেবড়ো প্রান্তরে এসে দাঁড়াল।
তেলেঙ্গানার গরমটা একটা শুকনো, দমবন্ধ করা কম্বলের মতো। ক্যাপ্টেন অর্জুন বর্মার কম্পাউন্ডটা ভুলে যাওয়া মেঠো রাস্তার শেষে একদম একলা দাঁড়িয়ে আছে।
চারদিকে ঘন সেগুন গাছ আর উঁচু, ইলেকট্রিক তারের বেড়া। ছড়ানো একতলা কংক্রিটের বাড়িটার ভেতরে কোনো আলো জ্বলছে না। শুধুমাত্র ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
মেইন গেটের কাছে বসে পড়ল বিক্রম। ওর পরনে কালো ট্যাকটিকাল গিয়ার, অন্ধকারের সাথে পুরোপুরি মিশে গেছে। নিজের ভেস্ট থেকে একটা স্পেশালাইজড ভোল্টমিটার বের করে তারের বেড়ায় ঠেকাল সে।
এনক্রিপ্টেড কমসের মধ্যে দিয়ে বিক্রম ফিসফিস করে বলল, কারেন্ট নেই মতিবাবু। কেউ একজন রাস্তার ধারের জাংশন বক্স থেকে মেইনলাইন পাওয়ার বাইপাস করে দিয়েছে। বর্মার সিকিউরিটি গ্রিড এখন পুরোপুরি ব্লাইন্ড।
কয়েক পা পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন মতিলাল।
চাঁদের আলোয় তাঁর সিল্যুয়েটটা তীক্ষ্ণ দেখাচ্ছে। মতিলাল বললেন, বর্মা একজন প্রাক্তন প্যারা কম্যান্ডো। কারেন্ট চলে গেলে ও অন্ধকারে চুপ করে বসে থাকার লোক নয়। অস্ত্র হাতে পুরো পেরিমিটার সার্চ করার কথা। সামথিং ইজ রং।
কম্পাউন্ডের ঘুটঘুটে কালো জানলাগুলো স্ক্যান করতে করতে বিক্রম বলল, ও সার্চ করছে না। কোনো মুভমেন্ট নেই। কাঁচে কোনো থার্মাল ব্লুমও ধরা পড়ছে না।
সাইলেন্সার লাগানো কমপ্যাক্ট সাইডআর্মটা বের করল বিক্রম। ওর মুভমেন্টে একটা ভয়ংকর মসৃণতা। কোনো শব্দ না করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দশ ফুটের গেটটা টপকে গেল সে।
ওপাশের মাটিতে নিঃশব্দে ল্যান্ড করে ভারী লোহার বারটা খুলে দিল। গেটটা ঠিক ততটাই ফাঁক করল, যতটা দিয়ে মতিলাল গলে ভেতরে আসতে পারেন।
সদর দরজার দিকে এগোল তারা।
সলিড স্টিলের দরজা, যে কোনো আক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু হাতলের দিকে হাত বাড়াতেই বিক্রম দেখল, ডেডবোল্টের চারপাশে গভীর, তাজা আঁচড়ের দাগ।
গ্লাভস পরা হাত দিয়ে দাগগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে বিক্রম বিড়বিড় করল, প্রফেশনাল ব্রীচ। হাইড্রোলিক স্প্রেডার ইউজ করেছে। কোনো আওয়াজ হয়নি, এবং কাজটা খুব দ্রুত হয়েছে।
দরজাটা ঠেলে খুলল বিক্রম। গন্ধটা সাথে সাথে ধাক্কা মারল নাকে।
রক্ত থেকে আসা সেই চেনা, ভারী তামার গন্ধের সাথে পোড়া কর্ডাইট আর তার সঙ্গে একটা কড়া রাসায়নিক গন্ধ মিশে আছে।
বিক্রম লিড নিল। তার সাইডআর্মের নল দিয়ে অন্ধকার হলওয়েটা সুইপ করতে করতে একটা নিখুঁত ট্যাকটিকাল গ্লাইডে এগোল।
পেছনে মতিলাল। তাঁর চোখ ফরেনসিকের নিখুঁত দৃষ্টি দিয়ে চারপাশটা প্রসেস করছে। মেঝেতে কোনো গুলির খোল পড়ে নেই। পলেস্তারায় কোনো বুলেটের গর্তও নেই। যে-ই এই বাড়িতে ঢুকে থাক, সে কোনো গোলাগুলিতে জড়ায়নি।
মাস্টার স্টাডির ভারী কাঠের ডবল দরজার সামনে পৌঁছল তারা। চৌকাঠের নিচ দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলোর একটা রেখা বেরিয়ে আসছে।
লাথি মেরে দরজাটা খুলল বিক্রম, নিজের অস্ত্রটা প্রথমে বাঁদিকে, তারপর ডানদিকে ট্র্যাক করল।
ঘরে কোনো শত্রু নেই। কিন্তু ঘরটা ফাঁকাও নয়।
স্কাইলাইট দিয়ে আসা চাঁদের ফ্যাকাশে আলোয় দেখা যাচ্ছে, স্টাডি রুমের ঠিক মাঝখানে ঝুলছে ক্যাপ্টেন অর্জুন বর্মার মৃতদেহ।
ছাদের একটা ভারী লোহার কড়িকাঠ থেকে মোটা নাইলনের দড়িতে ঝুলছেন তিনি।
পরনে একটা ইস্ত্রি করা মিলিটারি ড্রেস ইউনিফর্ম, কিন্তু তাতে কোনো মেডেল বা ব্যাজ নেই, সব খুলে নেওয়া হয়েছে। ওর মাথাটা একপাশে তীব্রভাবে ঝুঁকে আছে, যেন তিনি কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
মুখটা বেগুনি এবং ফুলে গেছে।
ওর ঝুলন্ত বুটজুতোর ঠিক নিচেই পড়ে আছে একটা উলটে যাওয়া সেগুন কাঠের টুল।
ভারী মেহগনি ডেস্কের ওপর একটা ব্যাটারি-চালিত রিডিং ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে একটা নিখুঁতভাবে সাজানো কাগজের স্তূপ। কাগজের পাশেই রাখা একটা ভিনটেজ, ম্যানুয়াল টাইপরাইটার।
নিজের অস্ত্রটা তুলে রেখে ঘরের কোণগুলো সিকিওর করার পর ডেস্কের দিকে এগোল বিক্রম। মতিলাল খুব শান্তভাবে ঝুলন্ত বডিটার দিকে এগিয়ে গেলেন, তাঁর মুখটা এই মুহূর্তে একটা আবেগহীন মুখোশ। কিন্তু তাতেও যেন সামান্য বেদনার ছায়া।
ডেস্কের ওপর টাইপ করা ডকুমেন্টটার দিকে তাকাল বিক্রম।
আমিই রেড করিডোর স্নাইপার, চিঠিটা এইভাবেই শুরু হয়েছে। টাইপরাইটারের ভারী কি-গুলোর চাপে কালি কাগজের অনেক গভীরে বসে গেছে। লেখা আছে, রাষ্ট্র আমার সম্মান কেড়ে নিয়েছিল, তাই আমি এর নাগরিকদের কেড়ে নিয়েছি। জঙ্গলের আত্মারা রক্ত চেয়েছিল। আমি আমার শিকার শেষ করেছি। আমি আমার নিজের শর্তেই এই পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত একজন সৈনিক হিসেবে থেকে যেতে চাই।
মতিলালের দিকে মুখ তুলে বিক্রম বলল, একদম ফুল কনফেশন। টাইপ করা, কালিতে সাইন করা।
লোকটা মল্লিকার সাইকোলজিকাল প্রোফাইলের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। একজন অপমানিত সৈনিক সিস্টেমের ওপর বদলা নিচ্ছে, আর শেষে নিজের অপরাধবোধেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
বর্মার ঝুলন্ত বুটের কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মতিলাল। তিনি সুইসাইড নোটটার দিকে তাকালেন না। তিনি দড়িটার দিকে তাকিয়ে আছেন।
ভায়া, কেসটা একদম পারফেক্টলি র্যাপ-আপ করা হয়েছে, মতিলাল খুব নরম গলায় বললেন। তাঁর গলাটা স্টাডি রুমের পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হলো।
তিনি একটু দম নিয়ে বললেন, মিডিয়া আর সেন্ট্রাল মিনিস্ট্রির জন্য একটা নিখুঁত, অকাট্য উপসংহার। কিন্তু, ….
মতিলাল তাঁর কোল্ড, অ্যানালিটিকাল দৃষ্টি বিক্রমের দিকে ঘোরালেন। বললেন, অামি এটাকে মিসডিরেকশনের একটা মাস্টারপিস বলতে পারতাম। কিন্তু শিল্পী তার ক্যানভাসে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে ভায়া।
কথা শেষ করে খুকখুক করে তাঁর সিগনেচার হাসিটা পেশ করলেন মতিলাল।
