অনলাইন স্টোর গোয়েন্দা বিক্রম, চিফ ডিটেকটিভ মতিলাল মিস্ত্রী ও জিনিয়াস হ্যাকার পিজির যাবতীয় বড়দের ক্রাইম থ্রিলার এখন পাওয়া যাচ্ছে Notion Book Store -এ। বইগুলো দেখুন →

অফলাইন স্টোর কলেজ স্ট্রিটে সমস্ত বই এখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। বুক ফ্রেন্ড। ৮/১/বি শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, (মিত্র ঘোষের গলি, কফি হাউসের ঠিক পাশে)। ফোন - ৮৭৭৭৪২১১৪২

৬. লাশে চাবুকের দাগ | বিষকন্যা রহস্য

সন্ধ্যা ৬.৩০

বাঁচার জন্য এই অ‍ামোদগেঁড়ে শহরের চাই নিত্যনতুন নখড়া। রোজ খুন-জখম-মারামারি হলে, অ‍ার সেই খুনটা যদি হয় চন্দ্রলেখার মত সুন্দরী গৃহবধূ, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তার ওপর চন্দ্রলেখার দুই মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে ঠিক এক মাসের মধ্যে। 

পাড়ার রকে রকে, চায়ের দোকানে এখন গসিপের ব্যান্ড বাজছে। 

কলকাতার সব পাড়াতেই একটি দুটি ঘনাদা ঠিকই পাওয়া যাবে খুঁজলে। তাদের সব বিষয়ে থিওরি অ‍াছে। এই খুন নিয়েও চলছে কাটাছেঁড়া।

সবমিলিয়ে শহরটা এখন ফুটন্ত কড়াই। 

চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে একই পরিবারের তিনজন শেষ—তাও আবার ভট্টাচার্য প্যালেসের মতো হাই-প্রোফাইল অন্দরমহলে। 

খবরের কাগজগুলো নিজেদের মতো প্যারালাল ইনভেস্টিগেশন শুরু করে দিয়েছে। 

শোনা যাচ্ছে, কলকাতার নামী এক সংবাদপত্র নাকি তলায় তলায় একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি-কেও হায়ার করেছে।

কলকাতার ইতিহাসে বোধহয় এই প্রথম।

মতিলাল আর বিক্রম তাঁর সরকারি বাংলোর বারান্দায় বসে ছিলেন। সারাটা দিন অনেক ধকল গেছে। 

শীতের সন্ধ্যায় বাইরের কুয়াশা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে ঢেকে ফেলছে রাস্তার অ‍ালোগুলোকে। 

বিক্রম মুচকি হেসে বলল, মতিবাবু, প্রেস তো আপনার রক্ত চাইছে। ওরা প্রচার করছে যে পুলিশ একদম অন্ধকারে।

মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন, ওরা তো কোনওকালেই অ‍ামাকে পছন্দ করে না ভায়া। কারণ অ‍ামি ওদের ফটোগ্রাফারদের ক্রাইম সিনে ঢুকতে দিই না। তার ওপর অ‍ামাকে ওরা কালো চামড়ার দলিত অফিসার ভাবে, যার উচ্চবর্ণের কালচার সম্পর্কে কোনও আইডিয়াই নেই। তাছাড়া অ‍ামার মাথায় বুদ্ধির বদলে রয়েছে ইট, কাঠ, বালি ও সিমেন্ট। কিন্তু একটা ব্যাপারে অ‍ামি বেশ মজা পাচ্ছি। 

কী বলুনতো? 

অ‍ারে সব কাগজে তোমাকে নিয়ে যে অ‍ালাদা খবর করেছে, সেটা দেখোনি? অ‍ামার সঙ্গে তোমার ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে, চিফ ডিটেকটিভের পাশে এই মিস্ট্রি ম্যানটি কে? তাহলে কি কেন্দ্রীয় এজেন্সিও যুক্ত হয়েছে?

বিক্রম মাথার পেছনে দুটো হাত রেখে ডেক-চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, অ‍ামার একটা মস্ত বড় সুবিধে কী বলুন তো?

কী ভায়া?

অ‍ামি খবরের কাগজ পড়িনা। কোনও সোস্যাল মিডিয়ায় অ‍ামার অ্যাকাউন্ট নেই। অ‍ামার কাজের সঙ্গে যা যা জড়িত, তার বাইরে অন্য কোনও ব্যাপার অ‍ামার জগতে এগজিস্টই করে না।

মতিলাল বললেন, এটা খুব ভাল। তা তোমার শাগরেদটির খবর কী?

বিক্রম হাসল, অ‍ামার তো দুটি শাগরেদ, কোনটির খবর চাইছেন?

দুটিরই। মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন।

বিক্রম সোজা হয়ে বসে বলল, কাজিন শমী তো অ‍ামেদাবাদে ম্যানেজমেন্ট পড়ছে অ‍ার রোজ রাতে ফোন করে এখানকার অ‍াপডেট চাইছে। পারলে ওখান থেকেই একটা প্যারালাল ইনভেস্টিগেশন চালাতে চায় অ‍ার কী। অ‍ার বিষ্ণু থাপা এখন এখানেই অ‍াছে। রোজ সকালে ক্যারাটে, কুংফু, কিক-বক্সিংয়ের প্র্যাকটিসে ওই এখন অ‍ামার সঙ্গী। তাছাড়া অ‍ামার দুটি পোষ্য ডোবারম্যান অ‍াবার ‍বিষ্ণুকে ছাড়া থাকতে চায় না। এই কেসটা না মেটা পর্যন্ত বিষ্ণুকে কলকাতাতেই থাকতে বলেছি।

মতিলাল চোখ কুঁচকে বললেন, এই গোর্খা ছেলেটি কিন্তু ভারি ইন্টেরেস্টিং। তোমার কাজিম শমী, বন্ধু পিজি অ‍ার অ‍ামি ছাড়া তোমার এত বড় ভক্ত বোধহয় অ‍ার কেউ নেই ভূভারতে। 

বিক্রম বলল, অ‍ামি কম্যান্ডো ট্রেনিং সেন্টারে থাকার সময়েও ও ছিল অ‍ামার এক নম্বর চ্যালা। যাকে অ‍াপনারা বলেন, ছায়াসঙ্গী। ছাড়ার পর, একদিন দেখি ফোন করেছে, বলল, স্যার অ‍াপনার ডিটেকটিভ এজেন্সিতে জয়েন করতে চাই। বললাম, বেশ তো, চলে এসো। অ‍ামাদের দুজনের একটাই মিল – তিনকূলে কেউ নেই। অনেক বলার পর এখন স্যার বলাটা বন্ধ করেছি। অ‍ামাকে বলে – ভাইয়া। 

মতিলাল খুখখুকিয়ে হাসলেন, অ‍ামি বলি ভায়া, বিষ্ণু বলে ভাইয়া। তুমি হলে গিয়ে অ‍াসল নাইয়া। নৌকার হাল তোমার হাতে। এবার যা পড়বে অ‍ামাদের পাতে, চেটেপুটে খেয়ে নেব একসাথে।

বিক্রম মুচকি হেসে সোজা হয়ে বসল। বলল, এখন বলুন, আপনার ইন্টেলিজেন্ট গেস কী বলছে? এই বিশাল প্রপার্টিই কি মোটিভ? এই ফ্যামিলির সবাই তো শেষ। তাহলে এতবড় প্রপার্টি ইনহেরিট করবে কে?

দ্যাখো ভায়া, প্রপার্টি একটা মোটিভ হতেই পারে। আবার নাও হতে পারে, মতিলাল অন্যমনস্কভাবে বললেন। কাল সকালে ওদের ফ্যামিলি ল ইয়ারের সাথে অ‍াপয়েন্টমেন্ট অ‍াছে। দেখা যাক সেখান থেকে কী বেরোয়। তবে …, মতিলাল মাথা নাড়লেন, ব্যাপারটা অত সহজ নয় মনে হচ্ছে।

বিক্রম উঠতে উঠতে বলল, ঠিক। ব্যাপারটা অত সহজ নয়। ওই সন্ন্যাসীটির একটা ভূমিকা থেকে থাকতে‍ও পারে। বড় মেয়ে চন্দ্রজার সঙ্গে ওরা কী কথা বলেছিল? বিপ্লবকে দেখে যতটা মিনমিনে মনে হচ্ছে, সেটা ও নাও হতে পারে।

মতিলাল মাথা নাড়লেন, গ্রেট মেন থিঙ্ক অ্যালাইক। একই ভাবনা অ‍ামারও মাথায় ঘুরছে। তা, তুমি কি উঠলে নাকি?

বিক্রম অ‍াড়মোড়া ভেঙে বলল, অ‍াজকের মত। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট কি অ‍াজ রাতে পাওয়ার সম্ভাবনা অ‍াছে?

পেলে তোমাকে ফোন করছি।

ভেরি গুড। কাল দেখা হচ্ছে। 

কিছুক্ষণ পর বিক্রমের বুলেটের অ‍াওয়াজ পাওয়া গেল। ধীরে ধীরে গম্ভীর অ‍াওয়াজটা মিলিয়ে গেল ঘন কুয়াশার ভেতর।

বিক্রম চলে যাওয়ার পর বাবুর্চি একরাম এসে দাঁড়াল, খানা লাগাব সাব?

মুখ তুলে অন্যমনস্কভাবে তাকালেন মতিলাল, তিনি ডুবে গেছিলেন অপারেশন চন্দ্রবংশের ভেতর। ভাবছিলেন, ভট্টাচার্য ফ্যামিলির ইতিহাসটা জানতে হবে সবার অ‍াগে। হয়ত ওর ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে সব রহস্যের সমাধান।

হঠাৎ তাঁর মনে হল, একরাম কিছু বলেছে। বললেন, রাতে কী বানালে মিঞা?

একরাম বলল, হালকা রেখেছি সাব। লাচ্চা পরোটা, শিক কাবাব, পনির মশালা, মাটন টিক্কা অ‍ার সুজির বরফি। 

মতিলাল অ‍াড়মোড়া ভেঙে উঠলেন, নাঃ, শুনেই খিদেটা চনমন করে উঠল। 

তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বিক্রম ভায়া তো এসব খায় না। নইলে এখান থেকেই ডিনারটা সেরে যেতে পারত। কীসব শাকপাতা, ফলমূল, সুপ খেয়ে থাকে। ছ্যা, ছ্যা। চলো একরাম, খানা লাগাও।   

 ডিনারের পর মতিলাল তাঁর প্রিয় ম্যাথমেটিক্স বইটি নিয়ে বসলেন। সুদেব মিত্রের এডিট করা—Quasiconformal Mappings, Riemann Surfaces, and Teichmuller Spaces। 

নিজে ম্যাথমেটিক্সে গোল্ড মেডেল পেয়েছেন বলে নয়, বরাবরই গণিত অ‍ার লজিকের ভেতরেই তিনি জীবনের সব জটিলতার সমাধান খোঁজেন।

ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশে রাঘব। 

বলল, স্যার, চন্দ্রলেখার পোস্টমর্টেম সবে শেষ হয়েছে। ডঃ সেন ফোন করেছিলেন।

মতিলাল বললেন, বলো, কী বললেন ডঃ সেন।

ফোনের ওপার থেকে রাঘবের গলাটা কিছুটা কাঁপা শোনাল, স্যার, একটা খবর অ‍াছে। ডক্টর সেন যা বললেন, তা শুনে অ‍ামি নিজেও শকড।

মতিলাল বইটা বন্ধ করলেন, বলো রাঘব।

চন্দ্রলেখা দেবী পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলেন স্যার।

মতিলাল চমকালেন না। বরং তাঁর মনে পড়ে গেল সেই ভট্টাচার্য প্যালেসে দেখা সেই সুন্দরী, শীতল হেডমিস্ট্রেসকে। অনুভূতির তীক্ষ্ণতা মিথ্যা কথা বলে না। তিনি আগেই কিছু একটা আঁচ করেছিলেন।

রাঘব থামল না।

পরে যা বলল তা অ‍ারও মারাত্মক। বলল, স্যার, অ‍ারও একটা ব্যাপার অ‍াছে। ওঁর শরীরে, বিশেষ করে কোমর, পেট আর পিঠের ওপরের দিকে অনেকগুলো পুরনো আর অদ্ভুত দাগ পাওয়া গেছে। ডক্টর বললেন, দাগগুলো দেখে মনে হচ্ছে ওনাকে নিয়মিত চাবুক মারা হত। হুইপিং মার্কস

মতিলাল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন, অ‍াই সি। শি ওয়াজ এ স্যাডোম্যাসোকিস্ট (Sadomasochist)। বিপ্লবকে ভাল করে গ্রিল করতে হবে রাঘব, বুঝলে? ওই ছেলেটা অনেক কিছু জানে। ভট্টচার্য বাড়ির অ‍াশেপাশে লোক লেগে গেছে তো?

রাঘব বলল, একদম স্যার। অ‍ামি অ‍ার শেখরও মাঝেমাঝে যাচ্ছি। তবে পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা সব হিসেব উলটে পালটে দিচ্ছে।

কথাটা বলে রাঘব ওপাশে চুপ করে রইল। একজন অভিজ্ঞ ডিটেকটিভের কাছেও ক্রাইমের হিউম্যান সাইকোলজির এইসব ডার্ক দিকগুলো হজম করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মতিলাল বললেন, খেলা জমে উঠেছে ভায়া। বিক্রম ঠিকই বলেছিল, কবরের ভেতর থেকে পুরনো ইতিহাস বেরিয়ে আসবে। ঠিক অ‍াছে, কাল সকালে অফিসে দেখা হচ্ছে।

ইয়েস স্যার, রাঘব ফোনটা রাখল।

মতিলাল জানলার দিকে তাকালেন। বাইরের অন্ধকারের সঙ্গে ঘন কুয়াশা যোগ হয়ে অ‍ার কিছু দেখা যাচ্ছে না। 

পাঁচ মাসের সন্তান সম্ভবা এক মা, যে স্বেচ্ছায় নিয়মিত চাবুক খেত, কারণ সে যন্ত্রনা পেতে চাইত—তার রহস্যময় জীবনের পরিণতিটা এমন নৃশংস কেন হল? তার দুই মেয়ে, দুটি ফুটফুটে তরুণীকেই বা মারা হল কেন?

চন্দ্রলেখার সেই তথাকথিত ভাই বিপ্লব কি স্রেফ একজন সাবমিসিভ ক্রীতদাস, নাকি সে এই ডার্ক গেমের মেইন প্লেয়ার?

অ‍ার সেই রহস্যময় সন্ন্যাসী? বড় মেয়ে চন্দ্রজার সঙ্গে সেই সন্ন্যাসী ও এক প্রৌড়া দেখা করার পর থেকেই তো যত গণ্ডগোলের সূত্রপাত?

Leave a Comment