বিকেল ৪.০০
ভট্টাচার্য প্যালেস তো শুধুমাত্র একটি সুবিশাল অট্টালিকা নয়; ওটা একটা ফেলে আসা সময়ের স্মৃতিস্তম্ভ।
সব প্যালেসেরই দেওয়ালে গাঁথা থাকে অনেক নিষিদ্ধ গাথা।
নিস্তব্ধতা আর গোপনীয়তায় মোড়া সেইসব কাহিনী কদাচিৎ বাইরে বেরিয়ে অাসে।
যতবারই বিক্রম এই বাড়িতে পা রেখেছে, ওর মনে হয়েছে বাড়িটার প্রতিটি ঘর, যা কিনা একটা সময় লোকলস্করে গমগম করত, সেখানে এখন থমথম করছে দমবন্ধ গোপনীয়তা। দেওয়ালের প্রতিটি ইঁট-কাঠ-পাথরের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে এমন অনেক কথা যা প্রকাশ্যে বলা যায় না। বন্ধ ঘরের ভেতরে কার যেন গলা পাওয়া যাচ্ছে, কেউ যেন ফিসফিস করে কথা বলছে।
শীতের দুপুরের রোদ দ্রুত পড়ে অাসছে। এই শূন্য প্যালেসের ধ্বংসাবশেষের ছায়া থেকে মাথা তুলছে হাড়হিম করা ঠাণ্ডা।
প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ল পুলিশের টাস্ক ফোর্স, রাঘব ও শেখরের নেতৃত্বে।
মতিলাল গলা তুলে বললেন, একটা কোণও যেন বাদ না যায়।
তারপর বিক্রমের কাঁধে হাত রেখে বললেন, চলো ভায়া এবার অাসল কাজটা সেরে ফেলা যাক।
ভজনলালকে পাওয়া গেল রান্নাঘরে। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর। নিবিষ্ট মনে রূপোর বাসন পালিশ করছিল—যেগুলো এই সব বাসনপত্র বহু বছর ব্যবহার করা হয়নি।
ভজনের চোখমুখে এমন একটা ভাব রয়েছে যাতে ওকে বয়সের থেকেও বেশি পুরনো দেখায়, ওর মুখে বলিরেখার ম্যাপ যে কোনও মানচিত্রকেও লজ্জা দেবে।
আমাদের দেখে ও অবাক হলো না, শুধু ক্লান্তিতে চোখ বুজল একবার, তারপর বলল, অাসুন বাবু।
ভজন কাকা, বিক্রম ওর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গলাটা খুব শান্ত। আপনার সাথে একটু কথা আছে। এই বাড়িটা সম্পর্কে… যা যা ঘটেছে এখানে। ভয় পাবেন না। মন খুলে বলুন।
ভজনলাল একটা রুপোর চামচ নামিয়ে রেখে ধুতিতে হাত মুছল।
ওর ঘোলাটে চোখে নেমে এল গভীর বিষণ্ণতা।
ক্লান্ত গলায় বলল, জানি বাবু। এই বাড়িতে বিপদ ফিরে এসেছে। চিরকাল এটাই হয়। কমদিন তো হল না এখানে। তবে যার যা পাওয়ার সে তো এই জীবনেই পেয়ে যায় তাই না?
গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা ছোট বসার ঘরে ভজনের দুপাশে বসল মতিলাল ও বিক্রম।
ধুলোমাখা সোফায় বসার পর বিক্রম প্রশ্ন করল, কত বছর এখানে কাজ করছেন আপনি?
ভজনলালের দৃষ্টি দেওয়ালে টাঙানো একটি ম্লান পোট্রেটের দিকে চলে গেল, এক জীবন কেটে গেল বাবু। মেমসাহেব জন্মানোর আগেই আমি এই বাড়িতে এসেছি। বড় কর্তার বাবা তখনও বেঁচে ছিলেন। ওই যে ছবিতে তিনি অামার দিকে তাকিয়ে যেন কিছু বলতে চাইছেন। আমি মেমসাহেব চন্দ্রলেখাকে এই বাড়িতেই জন্মাতে দেখেছি।
বিক্রম আর মতিলাল মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। এই লোকটা জ্যান্ত ইতিহাস। সবকিছুর মূল জট হয়তো এর কাছেই খুলতে পারে।
বিক্রম জিজ্ঞেস করল, অাপনি একাই এসেছিলেন?
হ্যাঁ, শুরুতে একাই। পরে, বছর দশেক বাদে ভাইপো জগনকে এখানে নিয়ে অাসি। কথা শেষ করে বেশ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভজন। তারপর মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। ধুতির খুঁট দিয়ে চোখ মুছল একবার।
বিক্রমের চোখ তখন ভজনলালের ওপর স্থির, আপনার ভাইপোও এখানে ছিল? সে কবে এখানে এসেছিল?
ভজনলালের কাঁধ দুটো সামান্য ঝুলে পড়ল, জগন… আহ, জগন। খুব শান্ত ছেলে ছিল। যখন ওর বছর দশেক বয়স, তখন ওকে নিয়ে আসি। বাড়ির ভারি কাজগুলোতে ও আমাকে সাহায্য করত।
তারপর? মতিলাল জিজ্ঞেস করলেন।
তারপর…, ভজনলাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, জগনকে এখান থেকে অার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি বাবু। ওর মৃত্যুর জন্য এখন নিজেকেই দোষী মনে হয়।
কিন্তু জগন মারা গেল কীভাবে? ওর মৃত্যুটা হল কী করে? বিক্রমের গলা এখন আরও নিচু।
বৃদ্ধের শরীরে একটা কাঁপুনি খেলে গেল, খুব খারাপ সময় ছিল সেটা বাবু। পুরো বাড়িতে একটা কালো অন্ধকার নেমে এসেছিল। সবাই বলল ও… ও গলায় দড়ি দিয়েছে।
ভাইপোর মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে ভজনের গলার স্বর এতটাই নেমে গেল যে প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না।
মতিলাল সহানুভূতির সুরে বললেন, একটা সুস্থ, স্বাভাবিক ছেলে, হঠাৎ মারা যাবে কেন, ভজন? কী হয়েছিল ওর?
জানি না বাবু। ভজন বড় করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, অামি তো এখানে ছিলাম না। দেশে তখন জমি-জমা নিয়ে একটা মামলা চলছিল, অামাকে দেশে যেতে হয়েছিল। সেখানে টেলিগ্রাম যায়। অামি ছুটে এসে শুনি, সব শেষ। ও নাকি গলায় দড়ি দিয়ে সুইসাইড করেছে। ছেলেটার মুখটা পর্যন্ত দেখতে পারিনি। অার তার ঠিক পরেই মেমসাহেবকেও এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেকদিন এখানে ছিলেন না চন্দ্রলেখা মেমসাহেব। তা প্রায় মাস ছয়েক তো হবেই।
বিক্রম অার মতিলাল মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। জগনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে কিশোরী চন্দ্রলেখার মাস ছয়েকের অন্তর্ধানের সম্পর্কটা ঠিক কী হতে পারে?
বিক্রম বলল, কোথায় গিয়েছিলেন মেমসাহেব? সেটা কী জানো?
ভজন মাথা নাড়ল, না বাবু। সে কথা কী করে জানব? শুনলাম মেমসাহেব নেই। তবে মেমসাহেবের শরীর খুব ভালো ছিল না। ডাক্তার বাবু রেগুলার চেক অাপ করতে অাসতেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়ত বলতে পারতেন।
মতিলাল বললেন, কোন ডাক্তার বাবু? নাম কী?
ভজন বলল, বড়কর্তার মুখে দু-একবার শুনেছি – শাশ্বত বাবু। ভারি ভাল মানুষ ছিলেন। অামার একবার পায়ে টান ধরেছিল, উনি দেখলেন অামি পা টেনে টেনে চলছি, নিজেই ওষুধ দিয়েছিলেন। অার…
বিক্রম বলল, অার কী?
ভজনলাল কান্নায় ভেঙে পড়ল। দুদিক থেকে ওর কাঁধে হাত রাখল বিক্রম ও মতিলাল। ওকে একটু সামলানোর সময় দিলেন।
ভজন বলল, ডাক্তারবাবু বলেছিলেন, জগনকে দেশে পাঠিয়ে দাও ভজন। ওকে অার এখানে রেখো না।
তুমি জানতে চাওনি, কেন? বিক্রম জিজ্ঞেস করল।
করেছিলাম, ভজন থেমে থেমে বলল, ডাক্তারবাবু বললেন, তোমার ভাইপোর মাথা খুব ভালো। ওকে পড়াশোনা থেকে ছাড়িয়ে এনে খুব ভুল করেছো। দেশে পাঠিয়ে দাও, ওর লেখাপড়ার খরচ অামি দেবো। তাই পরে যখন শুনলাম গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে উনি মারা গেছেন, সারারাত ঘুমোতে পারিনি। কী থেকে যে কী হয়ে গেল বাবু।
বেশ কিছুক্ষণ নীচু গলায় বিক্রমের সঙ্গে অালোচনা করতে লাগলেন মতিলাল। পরপর দুটো অানন্যাচারাল ডেথের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সঙ্গে কিশোরী চন্দ্রলেখার রহস্যময় অসুস্থতা ও ছ-মাসের জন্য অন্তর্ধান। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, এখনকার খুনগুলোর সঙ্গে অতীতের কী সম্পর্ক?
বিরাট হলঘরে থমথম করছে নিস্তব্ধতা। শুধু ওপরের ঘরগুলোতে ভারি বুটের শব্দ। ফার্নিচার সরানোর অাওয়াজ। গোটা বাড়ি জুড়ে তল্লাশি চলছে জোরকদমে।
বিক্রম বলল, মেমসাহেবের ঠিক কী হয়েছিল, কখনও জানতে চাওনি ডাক্তারবাবুর কাছে?
ভজনলাল মুখ সরিয়ে নিল, না বাবু, অামরা ছোটখাটো মানুষ। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়ে অামাদের কী লাভ বলুন? শুধু এটুকু জানতাম, মেমসাহেব ভাল ছিলেন না। খুব অসুস্থ ছিলেন। দোতলার ঘরে থাকতেন। কয়েকমাস নিচে নামেননি। বড় কর্তা কাউকে ওঁর কাছে যেতে দিতেন না। বলতেন, ওঁর নাকি শুধু বিশ্রামের দরকার। একমাত্র ডাক্তার বাবু, মেমসাহেবের বাবা, মা ছাড়া অার কারও তখন ওপরে ওঠাই নিষেধ ছিল। একমাত্র জগন…
জগন কী করেছিল? মতিলালের গলায় কৌতুহল।
ও একবার লুকিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল ওপরে। ছেলেমানুষ তো, তাছাড়া মেমসাহেব ওকে চিরকাল কাজে, অকাজে ডেকে পাঠাতেন। বিশেষ করে দুপুরে, যখন সাহেব অাদালতে চলে যেতেন, মেমসাহেবের মা ঘুমিয়ে পড়তেন, তখন ওরা দুজন লুডো খেলত বলে শুনেছি। তাও সেটা লুকিয়ে। বড় সাহেব জানতে পারলে চামড়া তুলে নেবেন। অামি অার তারক জানতাম। তবে তারক অামাকে বারবার বলত, জগনকে ওই মেয়েটার কাছে পাঠাবে না ভজন। মেয়েটার ভাবগতিক অামার ভাল ঠেকে না। তাছাড়া এই বয়সটাও গণ্ডগোলের। ঘি অার অাগুন কাছাকাছি রাখলে অাগুন লাগতে কতক্ষণ?
বিক্রম বলল, তা তুমি জগনকে বারণ করোনি কখনও?
করেছি বাবু। কিন্তু ও তো মেমসাহেবের থেকে বয়সে ছোট ছিল, অার খুব সরল প্রকৃতির ছেলেমানুষ ছিল জগন। বললেই তর্ক জুড়ত, তবে পরের দিকে ওর মধ্যে একটা বদল অাসে।
কীরকম? মতিলাল জিজ্ঞেস করলেন।
ভজন থেমে থেমে বলল, জগন খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছিল। অামার মনে হতে লাগল ও অনেক কিছু অামার কাছে লুকিয়ে যাচ্ছে। তারপর একদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে দেখি, পাশে ও নেই। অামি উঠিনি, জেগে শুয়েছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখি ও ফিরে এল। পাশে শুয়ে পড়ল। তারওপর কিছুক্ষণ পর দেখলাম ও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এর ঠিক দুদিন পর কারও ওপরে যাওয়া নিষেধ হয়ে গেল। অামরা শুনলাম, দিদিমণি অসুস্থ। তারপর তো ডাক্তারবাবু অাসা-যাওয়া করতে লাগলেন।
ডাক্তারবাবু ছাড়া, অার কেউ? বিক্রমের প্রশ্ন।
না বাবু। শুধু ডাক্তারবাবু আসতেন। ডাক্তার শাশ্বত বিশ্বাস। রোজই আসতেন প্রায়। এভাবে চলেছিল প্রায় মাস পাঁচ-ছয়। শেষদিকে দু-একবার এসেছিলেন এই পরিবারের কূলগুরু শঙ্কর মহারাজ। তিনি অবশ্য ওপরে যেতেন না। বসতেন, বড় কর্তা জয়ন্তবাবুর পড়ার ঘরেই।
মতিলাল অার বিক্রম মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। মতিলাল গলা নামিয়ে বিক্রমকে বললেন, বুঝলে ভায়া, কেসটা কিচাইন হয়ে অাছে। শুরুটা লুডো দিয়ে হলেও, পরে ওটা বিছানার ওপর জুডোয় বদলে গিয়েছিল।
ভজন যাতে না বোঝে সেজন্য বিক্রম বলল, শি ওয়াজ ক্রেজি অ্যান্ড মোস্ট প্রবাবলি সেক্স অ্যাডিক্ট, পারভার্ট। শি ইউজড জগন অ্যান্ড লেটার ডাম্পড হার অ্যাজ শি ডিড অফটেন।
মতিলাল মাথা নাড়লেন, কারেক্ট ইউ অার।
বিক্রম এবার ঘুরে বসল ভজনের দিকে, ভাইপোর মৃত্যুর সময় আপনি তাহলে ছিলেন না ভজন কাকা?
ভজনলালের মুখে এবার বিষণ্ণতার বদলে ঘৃণা আর রাগ ফুটে উঠল। থেমে থেমে বলল, বড় কর্তা… জয়ন্ত বাবু… আমাকে একটা কাগজ দেখিয়ে গ্রামে চলে যেতে বললেন। বললেন জমি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে দেশে, আমার থাকা দরকার। সব মিথ্যে বাবু। আসলে ওনারা চাইছিলেন আমি যাতে ওই সময় বাড়িতে না থাকি। জোর করে ছুটি দিয়ে আমায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বিহারে। এসে শুনলাম সব শেষ।
বিক্রম বলল, মতিবাবু ওকে কি অার দরকার অাছে?
মতিলাল মাথা নাড়লেন, না। ঠিক অাছে ভজন তুমি গিয়ে যেমন কাজ করছ, করো। পরে তোমার সঙ্গে অাবার কথা বলব।
ভজন ফের রান্নাঘরের দিকে চলে যাওয়ার পর, বিক্রম মতিলালকে বলল, ব্যারিস্টার জয়ন্ত নারায়ণ ভট্টাচার্য পুরো ন্যারেটিভ কন্ট্রোল করতেন সেই সময়। এই শংকর মহারাজ বা কুলগুরুকেও খুঁজে বের করা দরকার। যে নবীণ সন্ন্যাসী বড় মেয়ে চন্দ্রজার সঙ্গে দেখা করতে অাসত, সে কি কোনওভাবে শঙ্কর মহারাজের দূত?
সন্দেহ নেই, শংকর মহারাজ—এই ধাঁধার আরেকটা বড় টুকরো।
মতিলাল রাঘব আর শেখরকে ডেকে পাঠালেন, নির্দেশ দিলেন, এই শংকর মহারাজের খোঁজ চাই। ইন্টারসেপশন অন করে দাও। বিপ্লবের ফোনে অাড়ি পাতো। দেখো ও কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। পাশাপাশি ডাক্তার শাশ্বত বিশ্বাসের ফ্যামিলিতে কেউ বেঁচে আছে কি না সেটাও দেখা দরকার। যেহেতু জগন ও ডাক্তারের অানন্যাচারাল ডেথ হয়েছিল, ওদের পুরনো ফাইল থাকবেই। অটোপসি রিপোর্টও থাকবে। সব অামাদের চাই।
বিক্রম বলল, এক কথায়, অাপাতত এই তিন খুনের সূত্র ধরে অামরা কুড়ি বছর পেছনে ফিরে যাচ্ছি?
মতিলাল খুকখুক করে হেসে বললেন, নারী প্রকৃতি বলে একটা কথা অাছে ভায়া। এক নারী গড়ে, অারেক নারী ভাঙে। যার মধ্যে ডেসট্রাকশনের বীজ লুকিয়ে থাকে, একটা সময় সে নিজেও ডেসট্রয়েড হয়ে যায়। এটাই বোধহয় প্রকৃতির বিধান।
