মৃত্যুর হুমকি মতিলাল মিস্ত্রীর কাছে নতুন কিছু নয়।
একজন দক্ষ তদন্তকারীর কেরিয়ারে এমন চিঠি অন্তত একবার আসেই। এমন অনেক চিঠি পেয়েছেন মতিলাল এর অাগে এবং আজও তিনি বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন।
এই চিঠিগুলো আসলে একটা ভালো রিমাইন্ডার যে, জীবনে একটা জিনিসই ধ্রুব, তা হল, মৃত্যু।
মৃত্যুর থেকে চিরসত্য কি অার কিছু জীবনে?
গলায় ফাঁস লেগে দম অাটকে নরকে যাওয়ার আগে করুণাপ্রসাদ হয়তো জানতেন না যে তাঁর মৃত্যুটা হবে বিশ্বজুড়ে চর্চা করার মতো এক বীভৎস নাটক। পাবলো পিকাসোর কোনো কিউবিস্ট পেন্টিং-এর মতো তাঁর নিথর মুখটা বিকৃত হয়ে ছিল আতঙ্কে।
মতিলাল উঠে গিয়ে জানলার ধারে দাঁড়ালেন, বৃষ্টিটা ফের টিপটিপানিতে ফিরে গেছে।
দোতলার জানলা থেকে দেখতে পেলেন বিক্রমের কাওয়াসাকি ঢুকছে। কালো রেইনকোটে ঢাকা বিক্রম গেট দিয়ে ঢুকেই সজনে গাছটার নীচে দাঁড়াল, মুখ তুলে তাকিয়ে একবার হাত নাড়ল জানলায় দাঁড়ানো মতিলালের দিকে।
মতিলালও হাত নাড়লেন, মুচকি হাসলেন। ছেলেটার দেখার চোখ অাছে। এক্স-কম্যান্ডো হওয়ার এই এক বাড়তি সুবিধে।
যে কোনও কেসে বিক্রম ও তার জিনিয়াস হ্যাকার বন্ধু পিজি সঙ্গে থাকলে অনেক স্বস্তি বোধ করেন মতিলাল। তিনি তাঁর বিকর্কিত পুলিশি অতীতটা অাপাতত ভুলে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চান।
কবজি উল্টে ঘড়ি দেখলেন মতিলাল। সকাল নটা বাজতে একটু দেরি অাছে। ভালই হল, রাঘব ও দেবাশিস অাসার অাগে বিক্রমের সঙ্গে কিছু জরুরি কথা সেরে নেওয়া যেতে পারে।
দরজা খুলেই রেখেছিলেন মতিলাল। বিক্রম ঢুকতে ঢুকতে বলল, রেনকোটটা বাইরেই থাক?
মতিলাল হাঁ হাঁ করে উঠলেন, না হে ভায়া। ভেতরে নিয়ে চলে এসো। অামাদের এই ফ্ল্যাটে সব ধরনের চোর অাছে। বেরিয়ে অার রেনকোট পাবে না।
বিক্রম মজার গলায় বলল, সে কী কথা? বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা।
তা হলেই বোঝো। মতিলাল দরজা বন্ধ করে, গলা নামিয়ে বললেন, অামার ঠিক ওপরেই রয়েছে একটি কাপল, এই ধরো তোমাদের বয়সী হবে। চল্লিশের কোঠায়। মহিলার স্বভাব হল বাইরে চটি জুতো থাকলেই তা চুরি করে নিয়ে চলে যাওয়া। একে তো পুরনো ফ্ল্যাট, তার ওপর নীচে ভোজপুরী দারোয়ান বসে থাকে, সেজন্য কেউ অার গা করে সিসিটিভি লাগায়নি। অামি প্রথম চুপিচুপি বাইরে একটি লাগাই, ও বাইরে একটা পুরনো জুতো ছেড়ে রেখে দিই।
তারপর? চোর ধরা পড়ল? বিক্রমের গলা শুনে বোঝা গেল ব্যাপারটাতে বেশ মজা পাচ্ছে।
মতিলাল খুক খুক করে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাসলেন, একেবারে হাতেনাতে। অামি সিসিটিভি ফুটেজটি মহিলার হোয়্যাটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিতেই সে একেবারে যা তা কাণ্ড। অামার এখানে এসে জুতো তো ফেরত দিলই, সেই সঙ্গে হাতে, পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল, যাচ্ছেতাই কাণ্ড। বারবার বলল, দাদা, অার করব না। কাউকে বলবেন না। মাঝখান থেকে অামিই অপ্রস্তুতে পড়ে গেলাম।
বিক্রম বলল, এটা তো একধরনের মানসিক রোগ। তাই না মতিবাবু?
অবশ্যই। ক্লেপটোম্যানিয়া বা ক্লেপটোফিলিয়া। নানা কারণে হয়। তবে ভাল চিকিৎসা অাছে। ফেলে রাখাটা ঠিক নয়।
বিক্রম সোফায় বসতে বসতে বলল, কিন্তু করুণাপ্রসাদের মৃত্যুর তদন্ত এভাবে জলে ফেলে দিলে তো মহা ঝামেলায় পড়ে যাব অামরা। খুনটাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখালে অামরা তদন্তটা করব কী করে?
সেটাই তো সমস্যা ভায়া। তোমার হাত-পা বেঁধে দিয়ে জলে ফেলে দিলে সাঁতার কাটবে কী করে? তাই না? মতিলাল মাথা নাড়লেন, একটা উপায় বের করতে হবে।
বিক্রম হাসল, উপায় একটা অাছে।
মতিলাল খুক খুক করে হাসলেন, ছবিগুলো বাজারে ছেড়ে দেওয়া তো?
এগজ্যাক্টলি। বিক্রম সোফায় হেলান দিয়ে বলল, কথায় অাছে, যস্মিন দেশে যদাচার। ছবি একেবার বেরিয়ে গেলে, অাপনার ওপর সব বিধিনিষেধ উঠে যাবে। অামি নিশ্চিত, করুণার ছেলে সুদেবপ্রসাদ যখন প্রথম মৃতদেহ অাবিষ্কার করে, তখন ও কিছু ছবি ওর মোবাইলে তুলে রেখেছে। ওর নাম্বারটা শুধু অামাকে দিন। বাকি কাজ পিজি করবে। তাছাড়া অামার বডি ক্যামের ছবিগুলো অামি অলরেডি পিজিকে পাঠিয়ে দিয়েছি। তবে মোবাইলে তোলা হলে ছবিগুলো বেশি ভাল হবে।
মতিলাল ঘাড় নাড়লেন, ভেরি গুড। তাহলে এটা অামাদের তিনজনের মধ্যেই থাক।
অফকোর্স। বিক্রম সায় দিয়ে বলল, অাজ রাতের ব্রেকিং নিউজেই খবরটা অাসতে দিন। কাল থেকে অল ক্লিয়ার সিগনাল পেয়ে যাবেন। সব কটাকে ধরে ধরে জেরা করা যাবে।
তুমি কি কিছু প্ল্যান ছকেছো?
মতিবাবু, অাপনি একজন এক্সপার্ট মার্ডার ডিটেকটিভ। অামি অাপনার অাদেশের অপেক্ষায় অাছি। বিক্রম মজার গলায় বলল।
ইয়ার্কি ছাড়ো ভায়া। এই মার্ডারটার সঙ্গে অামার একটা পার্সোনাল যোগ অাছে। তাই অামি চাই, তুমি লিড করো। অামাকে দুটো অ্যাসিস্ট্যান্ট দেওয়া হয়েছে। রাঘব অার দেবাশিস। একটু পরেই ওরা অাসবে। ওদেরকে অাপাতত বাইরের লোকেদের প্রাথমিক জেরা অার নজরদারির কাজে লাগিয়ে দিচ্ছি। তারপর কেস যেমন এগোয়, সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কি, ঠিক অাছে তো? মতিলাল কথা শেষ করে বিক্রমের দিকে তাকালেন।
বিক্রম মাথা নাড়ল, পারফেক্ট। ফ্যামিলির সবার সঙ্গে অামরা দুজন কথা বলব। কিছু একটা ক্লু পাওয়া যাবে না, এ তো হতে পারে না। তবে তার অাগে অাজ রাতে খবরটা টিভি চ্যানেলগুলোয় অাসতে দিন। অামি পিজিকে সুদেবের নাম্বার পাঠিয়ে দিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিডব্যাক পেয়ে যাব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মতিলালের সেই পুরনো ফ্ল্যাটের অস্থায়ী ওয়ার রুমে দেবাশিস আর রাঘব এসে হাজির হল।
দেবাশিস একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল, স্যার, ফরেনসিক চিফ তো কোনো আঙুলের ছাপ পাননি। আর ডিএনএ স্যাম্পলের রিপোর্টের জন্য মুম্বাইয়ের ওপর ভরসা করতে হবে। সেখানকার ইন-চার্জ অাবার খুব একটা ফ্রেন্ডলি লোক নন।
মতিলাল খুকখুক করে হাসলেন, ওসব সরকারি ল্যাবের ভরসা ছেড়ে দাও দেবাশিস। আমাদের পুরনো কায়দাতেই এগোতে হবে। লেগওয়ার্ক, সন্দেহভাজনদের ওপর নজর রাখা, ডটগুলো কানেক্ট করা আর প্যাটার্ন খোঁজা।
মতিলাল এবার রাঘবের দিকে ফিরলেন। রাঘব দেখতে একটু শান্তশিষ্ট হলেও কাজে ও দারুণ স্মার্ট।
রাঘব বলতে শুরু করল, স্যার, খুনের আধ ঘণ্টা আগে যে নায়িকা করুণার ঘরে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে প্রাইমারিলি কথা বলেছি। আমি ওঁকে বললাম যে করুণার টাকার ব্যাগ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই তদন্ত চলছে। উনি জানালেন, আড়াইটে নাগাদ উনি ভেতরে ঢুকেছিলেন, কিন্তু দশ মিনিট পরেই ওঁর ফোনে একটা কল আসে। এক পুরুষকণ্ঠ ওঁকে জানায় যে ওঁর মায়ের হার্ট অ্যাটাক করেছে। উনি তখন তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান।
মতিলাল নিচু গলায় বললেন, আসলে ওঁর মায়ের কোনো হার্ট অ্যাটাক হয়নি, তাই তো?
রাঘব মাথা নাড়ল, ঠিক স্যার। একদমই না। নায়িকাকে ঘর থেকে সরানোর জন্যই ওটা ছিল একটা ফেক কল। খুনি সম্ভবত পৌনে দুটো থেকে তিনটের মধ্যে ভেতরে ঢুকেছিল।
তার মানে খুনি একা ছিল না। এটা টিম-ওয়ার্ক, পাশে বসা বিক্রম প্রথমবার কথা বলল। ওর কণ্ঠস্বর ঠান্ডা আর ধারালো।
রাঘব বিক্রমের দিকে তাকিয়ে যোগ করল, ইয়েস স্যার, এছাড়া ওই একই সময়ের অাশেপাশে অফিসের পেছনের গেটের সিসিটিভি ফুটেজে এক রহস্যময়ী নারীকে দেখা গেছে। পরনে কালো বোরখা। ঠিক আড়াইটে থেকে তিনটের মধ্যে সে ওই তল্লাটেই ঘোরাফেরা করছিল। ওই সময় ঝাড়ুদাররা খেতে গিয়েছিল আর গেটটাও খোলা ছিল।
মতিলাল একটা শিস দিলেন। মাথা নেড়ে বললেন, বাঃ, বোরখা পরা এক রহস্যময় নারী। অ্যাঙ্গেলটা ভালো। কিন্তু করুণার মতো শক্তিশালী লোক, যে কিনা মরার সময়ও শারীরিকভাবে উত্তেজিত ছিল, সে কি স্রেফ একজন মহিলার হাতে ওভাবে খুন হবে? এটা ঠিক কীসের ইঙ্গিত?
বিক্রম বলল, অামার ধারণা, একাধিক লোক, যার মধ্যে নারী ও পুরুষ সবই রয়েছে, করুণা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
মতিলাল জানলার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এবিষয়ে অার কোনও সন্দেহ নেই। করুণার অনেক বিচিত্র ফেটিশ ছিল। হয়তো ও অন্তর্বাস শুঁকছিল তখন খুনি পেছন থেকে অ্যাটাক করেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমাদের হাত-পা বাঁধা। আমরা ওপেনলি ইনভেস্টিগেট করতে পারছি না। লোকে জানে এটা হার্ট অ্যাটাক। আমরা নায়িকাকে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না ওই অন্তর্বাসটা ওঁর কি না।
হঠাৎ মতিলালের মনে পড়ল ভোরের সেই ট্যাক্সির কথা। কে অার ওইসব ফালতু থ্রেটের কথা মনে রাখে?
তিনি টেবিলের ওপর সেই প্লাস্টিকের কন্টেইনারে রাখা লাল কালির চিঠিটা রাখলেন। আমাকে আজ সকালে একটি প্রেমপত্র দেওয়া হয়েছে। এই দেখো সেই চিঠি।
দেবাশিস আর রাঘব চমকে উঠল। বিক্রম উঠে এসে চিঠিটার দিকে ঝুঁকে তাকাল। ওর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল। মুখ তুলে বলল, মতিবাবু, ট্যাকসিটার নম্বর পাননি?
না ভায়া। বৃষ্টিতে নম্বরটা দেখা যায়নি, মতিলাল উত্তর দিলেন, তবে আমি দেখছি। বালিগঞ্জ থেকে সুইনহো লেন, এই রুটের সব সিসিটিভি আমার কবজায় চলে আসবে বিকেলের মধ্যে। দেবাশিস তুমি ব্যাপারটা দেখো। ট্র্যাফিক সেকশনের সঙ্গে কথা বলো। ট্যাকসিটা অার যাবে কোথায়?
মতিলাল একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, জান রাঘব, একটা ইংরেজি প্রবাদ আছে, Every ass loves to hear himself bray। এর মানে অনেক গভীর। করুণার শেষ নেশা ছিল ব্যাকডোর পেনিট্রেশন। আমার মনে হয় ওই নায়িকা বেরিয়ে যাওয়ার পর করুণার খুব ঘনিষ্ঠ কেউ ঘরে ঢুকেছিল। করুণা হয়তো তার সাথেই কোনো বিকৃত খেলায় মেতেছিল, কিন্তু কাজ শেষ করতে পারেনি। কারণ সে সামনে এমন কিছু দেখেছিল যা তাকে পাথর বানিয়ে দিয়েছিল। খুনিকে দেখার আগেই কি সে অন্য কাউকে দেখেছিল? এই থিওরি অনুযায়ী করুণার পার্টনারও মার্ডার সাসপেক্টের তালিকায় থাকে।
মতিলাল বড় করে নিঃশ্বাস নিলেন, বিক্রমের দিকে তাকিয়ে বললেন, করুণাপ্রসাদের মত পাওয়ারফুল অথচ লম্পট লোক যখন খুন হয়, সেই খুন কিছুতেই একটা ওপেন অ্যান্ড শাট কেস হতে পারে না। ও ছিল গভীর জলের মাছ। ফলে অাপাতত নেক্সট সাতদিন অামরা এখানে ঠিক সকাল নটায় মিট করব। অাজকের প্রধান কাজ ট্যাক্সিটাকে খুঁজে বের করা। ঝাড়ুদারদের সঙ্গে কথা বলা। দেবাশিস, রাঘব, তোমরা দুজন বেরিয়ে পড়ো। এর মধ্যে যদি প্রয়োজন হয় ফোন করে নেবে। তবে তোমরা সাবধানে থেকো। মনে রেখো, কেউ আমাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছে।
যাওয়ার সময় রাঘব আর দেবাশিস চিন্তিত মুখে বিদায় নিল।
বিক্রম দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মতিলালের দিকে তাকিয়ে বলল, মতিবাবু, সাবধানে থাকবেন। আপনি এখন একা। বোঝাই যাচ্ছে, খুনীরা বেশ মরিয়া এবং যে কোনও ভাবেই হোক, ওরা অামাদের মুভমেন্টের খবর পেয়ে যাচ্ছে।
মতিলাল হাসলেন, ভায়া, আমি সামান্য রাজমিস্ত্রীর ছেলে। অামাদের জীবনের অার দাম কী? আমরা জন্ম থেকেই বেপরোয়া। আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখার মতো কেউ নেই, তাই আমরাও কারও তোয়াক্কা করি না।
লেখাটি ভালো লাগলো?
এই থ্রিলার মাল্টিভার্সকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাতে চাইলে সাপোর্ট করতে পারেন।
কীভাবে সাপোর্ট করবেন? →