চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরেও মল্লিকার দামি পারফিউমের হালকা গন্ধটা তখনও স্টাডি রুমে ভাসছে। মতিলাল মিস্ত্রীর ১৮ ডিগ্রি টেম্পারেচারে সেট করা বরফঠাণ্ডা স্যাংচুয়ারির স্টেরাইল, ওজোন-মেশানো বাতাসের সাথে গন্ধটা বড্ড বেমানান।
যে ফাঁকা সেগুন কাঠের চেয়ারটায় মল্লিকা বসেছিল, সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন মতিলাল, মুচকি হেসে উঠলেন।
যে কাগজের কাপের গরম জলটুকু ছোঁয়নি মল্লিকা, সেটা তুলে নিয়ে জানলার ধারের ফার্ন গাছে চুপচাপ ঢেলে দিলেন তিনি।
মেয়েটা হাইলি ইন্টেলিজেন্ট, ঘরের দিকে পিঠ করেই মতিলাল বললেন, এবং হাইলি কম্প্রোমাইজড।
কিন্তু ব্যাপারটা কী মতিবাবু? ও একটা পলিটিকাল ফেয়ারি টেল ফাঁদছে কেন? ওর কী স্বার্থ রয়েছে? বিক্রমের গলাটা নিচু, চিন্তিত শোনাল।
দুটো সম্ভাবনা রয়েছে ভায়া, খুকখুক করে সিগনেচার হাসিটা হাসলেন মতিলাল, এক, ইন্টারনাল পলিটিক্স। সেটা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। কিন্তু দু নম্বরটা ডেঞ্জারাস হতে পারে – মল্লিকার সঙ্গে কোনওভাবে খুনীর যোগাযোগ ঘটে গেছে।
পিজি বলল, এতটা ঝুঁকি নেবে মেয়েটা?
মতিলাল বললেন, ঠিক। এটা নিয়ারলি ইম্পসিবল। ফলে অাপাতত ওকে নিয়ে বোধহয় অতটা ভাবার দরকার নেই। কী বলো, ব্রাদার? বিক্রমের দিকে তাকালেন মতিলাল।
টেবিলে ছ’জন ভিকটিমের হার্ডকপি অটোপ্সি ফটোগুলো সাজিয়ে দিয়ে বিক্রম বলল, মল্লিকাকে নিয়ে এখনই অতটা না ভাবলেও খুনীকে নিয়ে ভাবার অনেক কারণ রয়েছে। অামার দৃঢ় বিশ্বাস, খুনী একাকী ও ভ্রাম্যমান। ঘনঘন জায়গা বদলাচ্ছে সব ঘেঁটে দেওয়ার জন্য। অার মল্লিকা যেটা অামাদের খাওয়াতে চাইছে, সেই এক্সট্রিমিস্ট সেলগুলো এতখানি সার্জিকাল ডিসিপ্লিনের সাথে অপারেট করে না।
জার্নালিস্টের এক্সিট উন্ডের ভয়ংকর ছবিটায় আঙুল টোকা দিয়ে বিক্রম বলে চলল, ইনসার্জেন্টরা ম্যাক্সিমাম ক্যাজুয়ালটি চায়। তারা একে-৪৭ চুরি করে, কাস্টম বোল্ট-অ্যাকশন রাইফেল নয়। একটা স্নাইপার রাইফেল হলো স্ক্যালপেল, আর একটা ইনসার্জেন্সির দরকার হয় হাতুড়ি। মল্লিকার প্রোফাইলটা একটা ডেলিবারেট ফিকশন, যাতে আমরা তেলেঙ্গানায় ওর ওই এক্স-মিলিটারি সাসপেক্টের দিকে ঘুরে যাই।
রিয়েল শুটারকে প্রোটেক্ট করার জন্য ছাড়া অার কী কারণ থাকতে পারে, উবুন্টু টার্মিনালের ক্যাসকেডিং কোড থেকে চোখ না সরিয়েই পিজি যোগ করল, মেয়েটা একটা শিল্ড। কিন্তু ও এখানে এসে একটা মিস্টেক করে ফেলেছে। ও যে কারণেই অামাদের মিসগাইড করার চেষ্টা করুক, মল্লিকা ধরা পড়ে গেছে শুরুতেই।
টেবিলের দিকে ঘুরলেন মতিলাল।
চিন্তিত গলায় বললেন, তাহলে তো মেয়েটার ওপর শুরু থেকেই কড়া নজরদারি রাখতে হয়। তবে তার অাগে চলো ওর গল্পটাকে প্রকৃত তথ্য দিয়ে যাচাই করা যাক।
ঠিক, অটোপ্সি ফাইলগুলোর ওপর ঝুঁকল বিক্রম।
রিটায়ার্ড প্যারা কম্যান্ডো সুবেদার মেজর রাওয়ের ফাইলটা প্রথম টেনে নিল এক্স-কম্যান্ডো।
টিস্যু মার্জিনগুলো দেখুন, ছোট, একদম নিখুঁত গোলাকার এন্ট্রি উন্ডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বিক্রম বলল, নো কি-হোলিং। এক কিলোমিটারের বেশি ট্র্যাভেল করার পরও ইমপ্যাক্টের সময় বুলেটটা পারফেক্টলি স্টেবিলাইজড ছিল। এর জন্য ব্যারেলের একটা হাইলি স্পেসিফিক টুইস্ট রেট দরকার, যেটা ফ্ললেসলি মেশিনড।
এবার এক্সিট উন্ডের ছবিটা তুলল বিক্রম। বলল, আর এটা হলো হাইড্রোস্ট্যাটিক শক। একটা ২৫০-গ্রেইনের .338 লাপুয়া ম্যাগনামের মতো হেভি-গ্রেইন প্রজেক্টাইল যখন সেকেন্ডে প্রায় তিন হাজার ফুট বেগে মানুষের শরীরে হিট করে, তখন সেটা শুধু টিস্যুকে ভেদ করে যায় না। বুলেটটা তার সামনে একটা সুপারসনিক প্রেসার ওয়েভ পুশ করে। ভিকটিমের ভেতরে একটা টেম্পোরারি ক্যাভিটি তৈরি করে, অর্গানগুলোকে তাদের ইলাস্টিক লিমিটের বাইরে স্ট্রেচ করে দেয়। ভেতর থেকে পাঁজরের হাড়গুলোকে টুকরো টুকরো করে ছিটকে বের করে দেয়।
ভেরি গুড বিক্রম ভাই, ভেরি গুড। বিক্রমের অ্যানালিসিসের তারিফ করে উঠলেন মতিলাল। বললেন, এত দূর থেকে কাইনেটিক এনার্জি এতটা নিখুঁতভাবে ডেলিভার করার জন্য সাংঘাতিক ক্যালকুলেশন দরকার।
ঠিক। অামি এটাই বলতে চাই। এর জন্য ম্যাথমেটিকাল পারফেকশন দরকার, বিক্রম মাথা নেড়ে বলল, শুটারকে বুলেট ড্রপ ফ্যাক্টর করতে হয়। উইন্ড স্পিড আর ডিরেকশন ক্যালকুলেট করার জন্য মিরেজ রিড করতে হয়। ব্যারোমেট্রিক প্রেসার, হিউমিডিটি, আর কোরিওলিস এফেক্ট—অর্থাৎ বুলেটটা যখন ফ্লাইটে আছে, তখন তার নীচে পৃথিবীর রোটেশন—এসব মেজার করতে হয়। আইডিওলজি আর অ্যাড্রেনালিনে মত্ত কোনো টেররিস্টের পক্ষে এই শট নেওয়া ইমপসিবল। এমন খুনী অামরা অাগে দেখিনি মতিবাবু। একা থাকে, বরফের থেকেও ঠাণ্ডা মাথা অার তার থেকেও বড় কথা হল, অসীম ধৈর্য।
এই নিখুঁত দক্ষতার জন্য প্র্যাকটিস দরকার, কি বোর্ড থেকে পিজি চোখ না তুলে কথাটা বলায় বোঝা গেল ও বিক্রমের যুক্তি মন দিয়ে শুনছিল।
একবার মতিলালের দিকে তাকিয়ে পিজির দিকে ঘুরল বিক্রম। বলল, মিলিটারিতে আমাদের একটা স্ট্রিক্ট রুল আছে। ট্রাস্ট ইওর গিয়ার, বাট ভেরিফাই ইওর জিরো। একজন স্নাইপার হুট করে আরাকু ভ্যালি বা দলমা হিলে ঢুকে কোল্ড শটে এক হাজার মিটারের নিশানা লাগাতে পারে না। ট্রানজিটে স্কোপে বাম্প লাগা, অলটিটিউড চেঞ্জ, টেম্পারেচার শিফট—এসব ক্রস হেয়ারকে অফ করে দেয়। ব্যারেলের ট্রু পয়েন্ট অফ ইমপ্যাক্টের সাথে অপটিক অ্যালাইন করার জন্য তাকে অবশ্যই প্র্যাকটিস শট নিতে হবে।
মতিলালের ব্রেন ফাস্ট ফরোয়ার্ডে ছুটতে শুরু করল, লজিকগুলো ভল্টের গিয়ারের মতো খটখট করে মিলে যাচ্ছে।
মতিলাল বললেন, প্রশ্নটাতো সেটাই ভায়া। প্র্যাকটিসের সময় একটা .338 লাপুয়া ম্যাগনাম প্রায় ওয়ান হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্সটি ডেসিবেলের নয়েজ সিগনেচার জেনারেট করে। অনেকটা বজ্রপাতের মতো শোনায়। দশ মাইল রেডিয়াসের মধ্যে সবকটা ফরেস্ট রেঞ্জারকে অ্যালার্ট হয়ে যাবে। তাহলে?
একদম ঠিক জায়গায় হিট করেছেন মতিবাবু। বিক্রম বলল, ওর একটা বিশেষ ধরনের অকৌস্টিক ডেড-জোন দরকার। একটা গভীর র্যাভিন বা গিরিখাত। একটা পরিত্যক্ত স্টোন কোয়ারি। অথবা এমন একটা খাড়া খাদ, যার চারদিকে হাই, ডেন্স রক ফেস আছে, যা রাইফে্লর শকওয়েভকে ট্র্যাপ করে অ্যাবসর্ব করে নেবে। ও কোথায় প্র্যাকটিস করে সেটা যদি আমরা খুঁজে পাই, তাহলে মাটিতে পড়ে থাকা ব্রাস আর ওর মেকানিক্যাল ফিঙ্গারপ্রিন্টটাও পেয়ে যাব।
কোণার ডেস্কের ব্লু গ্লো-টার দিকে ঘুরলেন মতিলাল। বললেন, ভাই পিজি ফিজিক্যাল প্যারামিটারগুলো তো শুনলে। এবার এগুলোকে ট্রান্সলেট করো।
অলরেডি কম্পাইলিং, পিজি বলল। মেকানিক্যাল কিবোর্ডের ওপর মারাত্মক স্পিডে তার আঙুলগুলো উড়ছে। সে শুধু টাইপ করছে না, যেন ডেটা অর্কেস্ট্রেট করছে।
একটা ডিসেন্ট্রালাইজড ক্রলার লঞ্চ করল সে, যেটা পাবলিক পোর্টালগুলোকে বাইপাস করে সরাসরি ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন (ISRO)-এর র টপোলজিকাল ডেটাবেসে ট্যাপ করল। পিজি বলল, লেয়ার ওয়ান, আমি ছটা রাজ্যের রেড করিডোর সুইপ করছি। যে কোনো উপত্যকা, যার খাড়াই দুশো ফুটের কম, সেগুলোকে ফিল্টার আউট করে দিচ্ছি।
দেওয়ালের ম্যাসিভ মনিটরে হাজার হাজার স্কোয়ার কিলোমিটারের ফ্ল্যাট ফরেস্ট ব্ল্যাকনেসের মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে গেল। পড়ে রইল শুধু এবড়োখেবড়ো, গ্লোয়িং গ্রিন রিজ আর গভীর উপত্যকাগুলো।
এবার অাসা যাক লেয়ার টুতে। অকৌস্টিক ব্যাফলিং, পিজি বলার পর একটা সাউন্ড ডিসিপেশন অ্যালগরিদম অ্যাপ্লাই করল, ওয়াইড ভ্যালিগুলোকে ইরেজ করে দিল, যেখানে ক্যানোপির ওপর দিয়ে ইকো ট্র্যাভেল করতে পারে। সে শুধু ন্যারোয়েস্ট, ডিপেস্ট গ্রানাইট আর ব্যাসল্ট গর্জগুলোকে আইসোলেট করল—যেগুলো ন্যাচারাল সাইলেন্সার।
টপোগ্রাফিক্যাল মার্কারগুলো হাজার থেকে কমে পঞ্চাশের নীচে নেমে এল।
এবার লেয়ার থ্রি: আইসোলেশন, ফিসফিস করে বলল পিজি।
সে রিজিওনাল হিট ম্যাপ, মোবাইল নেটওয়ার্ক হ্যান্ডশেক লগস, আর ট্রাইবাল সেটেলমেন্ট কোঅর্ডিনেটস ওভারলে করল। হিউম্যান অ্যাক্টিভিটির দশ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা যে কোনো গর্জ ডিলিট করে দিল সে।
মার্কার ড্রপ করে বারোটাতে এসে দাঁড়াল।
ছ’টা স্টেট জুড়ে বারোটা পোটেনশিয়াল অকৌস্টিক ডেড-জোনস রয়েছে যেখানে ওই খুনীর পদচিহ্ন রয়েছে, মতিলাল বললেন, কিন্তু এতগুলোকে সার্চ করাটা নিয়ার টু ইম্পসিবল ভায়া।
অাহা, হতাশ হচ্ছেন কেন মতিবাবু, পিজির ওপর অাস্থা রাখুন। বিক্রম মজার গলায় বলল।
হুইচ ব্রিংস আস টু লেয়ার ফোর, পিজির মজার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বলল, ডিজিটাল ইন্টারসেকশন। ওই খুনীর স্পেশালাইজড ম্যাচ-গ্রেড অ্যামিউনিশন দরকার। এই রিজিয়নে হেভি-গ্রেইন অ্যামো বায়ারদের যে ডার্ক ওয়েব ফিনান্সিয়াল স্ক্র্যাপ আমি করেছিলাম, তার সাথে এই বারোটা ডেড-জোনের জিওগ্রাফিক্যাল কোঅর্ডিনেটগুলো ক্রস-রেফারেন্স করছি। এবার এই সার্চের অাসল মজাটা পাওয়া যাবে।
পিজি ঝড়ের বেগে কিছু একটা টা্ইপ করল যার ফলে উবুন্টু টার্মিনাল ব্রুট-ফোর্স ক্রস-রেফারেন্স এক্সিকিউট করল। স্ক্রিন জুড়ে এনক্রিপ্টেড আলফানিউমেরিক হ্যাশ ঝাপসা হয়ে গেল।
বিক্রম ও মতিলাল বুঝলেন যে পিজি খুঁজছে সেই মাইক্রো-টিয়ার বা সামান্যতম ছেঁড়া সুতো—একটা ড্রপড ভিপিএন (VPN) পিং, একটা স্লপি ক্রিপ্টো-টাম্বলার রাউটিং, অথবা ওই বারোটা ফিজিক্যাল লোকেশনের কাছাকাছি পড়া একটা সিঙ্গেল ডিজিটাল শ্যাডো।
এই ছায়ার অাড়াল থেকেই খুঁজে বের করা যাবে খুনী ঠিক কোথায় ঘাপটি মেরে, সবার চোখর অাড়ালে তার প্র্যাকটিস চালাত।
সার্ভারের হালকা গুঞ্জন ছাড়া মতিলালের স্টাডি রুম একদম নিস্তব্ধ।
বিক্রম ভাবছিল গত রাতে মতিলালের ফোন থেকে শুরু করে অাজকের সকালে মল্লিকার অাগমণ পর্যন্ত পরপর ঘটনাগুলোর কথা।
হঠাৎ, বিক্রমের ঘোর ভেঙ টার্মিনালটা বেজে উঠল। একবার নয়, দু’বার।
বিরাট দেওয়াল-জোড়া মনিটরটা মাঝখান থেকে পরিস্কার দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেল। দুটো সম্পূর্ণ অালাদা ডেটা প্রোফাইল চকচকে লাল রঙের টেক্সটে দেখা যাচ্ছে।
পিজি এবার টাইপ করা থামাল। নাকের ওপর চশমাটা ঠেলে তুলে এই জোড়া ফলাফলের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
উই হ্যাভ আ কমপ্লিকেশন মতিবাবু, পিজির গলাটা যেন একটু ভারাক্রান্ত শোনাল।
স্ক্রিনের দিকে এগিয়ে গেল বিক্রম। দুটো হিটস?
দুটো অালাদা সাসপেক্ট প্রোফাইলস, ডেটা উইন্ডোগুলো বড় করতে করতে পিজি মাথা নাড়ল। ডার্ক ওয়েব ক্রলার .338 লাপুয়া ম্যাগনাম অ্যামিউনিশনের দুজন সেপারেট, হাইলি এনক্রিপ্টেড ক্রেতা খুঁজে পেয়েছে। আর দুজনেরই ডিজিটাল শ্যাডো একটা অকৌস্টিক ডেড-জোনের সাথে ইন্টারসেক্ট করছে।
বিক্রমের গলায় চিন্তার সুর, কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
স্ক্রিনের বাঁদিকের অংশটায় তাকালেন মতিলাল।
প্রোফাইল – এ।
পিজি বলল, সাসপেক্ট এ-র অার্থিক লেনদেনের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তেলেঙ্গানার নাল্লামালা ফরেস্টের কাছে পিং করছে। আমি প্রক্সি বাইপাস করেছি। ক্রেতা একজন এক্স-মিলিটারি কনট্রাক্টর, অবৈধ কাজকর্মের অভিযোগে কাজ চলে যায়। পয়সাওলা লোক, অস্ত্রশস্ত্র কেনার ঝোঁক রয়েছে, জঙ্গলের একদম ধারে একটা প্রাইভেট কম্পাউন্ড অপারেট করে।
মল্লিকার সাসপেক্ট, বিক্রমের চোখ সরু হয়ে গেল। বিক্রম গলা নামিয়ে বলল, এই কি সেই সো কলড এক্সট্রিমিস্ট, যার দিকে ও অ্যাগ্রেসিভলি আমাদের পুশ করছিল?
আর প্রোফাইল বি? স্ক্রিনের ডানদিকের অংশটায় তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন মতিলাল।
সাসপেক্ট বি সম্পর্কে কিছুই জানা যাচ্ছে না। একটা ভূতের মতই তার অস্তিত্ব, পিজির গলার স্বরে যেন হতাশার একটা ঝিলিক খেলে গেল।
কেন বলতো? লোকটাকে কি ট্রেস করা যাচ্ছে না? বিক্রমের গলাতেও সামান্য উৎকণ্ঠা টের পেলেন মতিলাল। তাঁর ভুরূ কুঁচকে গেল।
সত্যি, এমন অদ্ভুত কেস তাঁর পঁচিশ বছরের কেরিয়ারে কখনও পাননি তিনি।
পিজি বলল, এই লোকটার আইপি অ্যাড্রেসটা মিলিটারি-গ্রেড প্রক্সি লেয়ারের নীচে লুকিয়ে রয়েছে। কিন্তু ফিজিক্যাল অ্যাঙ্কর পয়েন্ট—এটা ওদের ভিপিএন-এ মোমেন্টারি স্লিপের ফলে একটা ট্রেস জেনারেট করেছে—ওদের ছত্তিশগড়ের দণ্ডকারণ্য ফরেস্টের একদম গভীরে একটা ম্যাসিভ, পরিত্যক্ত মাইকা কোয়ারির কাছে দেখাচ্ছে। রাইট হোয়্যার দ্য জার্নালিস্ট ওয়াজ কিল্ড। অর্থাৎ লোকটা যেখানে প্র্যাকটিস করত, তার কাছাকাছি সাংবাদিক গুলমোহর কোনওভাবে পৌঁছে গিয়েছিল।
অথবা তাকে টোপ দেখিয়ে সেখানে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? বিক্রম বলল।
মতিলাল মাথা নাড়তে নাড়তে স্প্লিট স্ক্রিনটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, ওয়েল অ্যাসিউমড, বিক্রম ভাই। কিলার একটা ল্যাবিরিন্থ বা গোলকধাঁধা তৈরি করেছে, আর প্রোফাইলার হিসেবে মল্লিকা অামাদের হাতে এমন একটা ম্যাপ ধরিয়ে দিয়েছে যা অামাদের সোজাসুজি অন্য একটা খাদের দিকে লিড করছে।
বিক্রম বলল, মল্লিকা চায় আমরা তেলেঙ্গানায় যাই। কিন্তু কেন?
এবার মতিলালের সেই বিখ্যাত সিগনেচার খুকখুকে হাসিটা শোনা গেল, মল্লিকা একটা প্রোফাইল তৈরি করেছে আমাদের এটা কনভিন্স করার জন্য যে, ওই এক্স-মিলিটারি কনট্রাক্টরই আমাদের স্নাইপার। ও লোকটাকে বলির পাঁঠা হিসেবে অফার করছে।
পিজি হাসল, কিন্তু ও অামাদেরও এত পাঁঠা ভাবল কী করে?
মতিলাল বললেন, ওটা মেয়েটির বয়সের দোষ। একটা বয়সে মানুষ ভাবে, সে যা ভাবছে, বাকিরাও তাই ভাববে।
তার মানে অাসল খুনী ছত্তিশগড়েই অপারেট করছে, পরিত্যক্ত কোয়ারির কোঅর্ডিনেটগুলোর দিকে তাকিয়ে বিক্রম বলল।
তবে সেকেন্ড সাসপেক্টের দিকেও নজর রাখতে হবে, মতিলাল বললন, দ্যাখো ব্রাদার, আমরা তেলেঙ্গানার কম্পাউন্ডটাকে একেবারে ইগনোর করতে পারি না। মল্লিকা যদি ওই এক্স-মিলিটারি কনট্রাক্টরকে ফ্রেম করে থাকে, তবে ওটা একটা লুজ এন্ড। আমাদের দেখতে হবে ও ঠিক কী ফাঁদ পেতে রেখেছে। পিজি, তুমি ছত্তিশগড়ের ওই ঘোস্ট আইপি-র পেছনে লেগে থাকো। প্রক্সি লেয়ারগুলোকে ভেদ করে একমাত্র তুমিই ওর অাসল পরিচয় বের করতে পারবে।
পিজি অাড়মোড়া ভাঙল, বলল, সে তো হল। কিন্তু গোঁপটা লাগাতেই ভুলে গেলাম? মেয়েটা কী ভাবল কে জানে?
মতিলাল দুহাত ছড়িয়ে বলল, নো গোঁপ, নো হােপ। ছেলেরা যবে দাড়ি গোঁপ কামাতে শুরু করল, তখন ফ্রান্সে একটি মেয়ে কী বলেছিল জানো? বলেছিল, ইস, চুমু খাওয়ার মজাটাই চলে গেল।
বিক্রম বলল, সেজন্যই কি অাপনি গোঁপ কামান না মতিবাবু?
মতিলাল মুচকি হাসলেন, সেটা তো একটা কারণ বটেই। তাছাড়াও একটা কারণ রয়েছে। ওই কথাটা তো নিশ্চয়ই শুনেছো – শিকারী বেড়ালের গোঁপ দেখলেই চেনা যায়।
মনিটর থেকে মুখ ফিরিয়ে পিজি বলল, অামাদের এখানে শিকার অাপাতত দুজন।
বিক্রম বলল, ঠিক, তবে দ্রুত একটাকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা কর, যাতে ওই সোসিওপ্যাথ কিলারের বিরুদ্ধে অামরা ব্যবস্থা নিতে পারি।
পিজি টাইপ করতে করতে বলল, হবে বৎস, হবে। শুধু একটু ধৈর্য ধরো।
লেখাটি ভালো লাগলো?
এই থ্রিলার মাল্টিভার্সকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাতে চাইলে সাপোর্ট করতে পারেন।
কীভাবে সাপোর্ট করবেন? →