কলকাতায় সল্টলেকের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টটা চাঁদের নরম রূপোলি আলোয় ভাসছে।
রাত তিনটে।
হলের ওপাশে মাস্টার বেডরুমে ঘুমিয়ে অাছেন অনীক সেনের স্ত্রী। পাশের ঘরে অনীকের দুই ছোট্ট মেয়েও হয়ত পাড়ি দিয়েছে কোনও মিস্টি স্বপ্নের দেশে।
চোখে ঘুম নেই একমাত্র অনীকের।
অনীকের স্ত্রী, তার দুই ছোট্ট মেয়ে ও পাড়া প্রতিবেশী জানে তাদের বাবা একজন পরিশ্রমী সিভিল কনট্রাক্টর। চুপচাপ নিজের কাজ করে, ব্রিজ বানায় অার গ্রামের হাইওয়ে সার্ভে করে। বাচ্চারা ঘুণাক্ষরেও জানে না, রাতে ঘুমানোর অাগে তারা যাকে আদর করে, সে আসলে রক্তমাংসের একটা ফাঁপা খোলস মাত্র। সাপের খোলস।
আসল অনীক সেন থাকে হলওয়ের শেষ প্রান্তে, ওই সাউন্ডপ্রুফ স্টাডি রুমটার ভেতর।
এই শেষ রাতে কেন অনীকের চোখে ঘুম নেই?
কেনই বা সে তার ভারী মেহগনি ডেস্কের সামনে বসে আছে?
একটা ঝকঝকে সাদা আন্ডারশার্ট আর ফিটিং স্ল্যাক্সে সুগঠিত অনীককে সিনেমার নায়কের মত দেখায়।
দেওয়ালে লাগানো মিউট করা টেলিভিশনের হালকা আলো এসে পড়েছে তার চশমার কাঁচে। নিউজে ছত্তিশগড় পুলিশের দণ্ডকারণ্য ফরেস্ট ব্লাইন্ডলি চিরুনি তল্লাশি করার ফুটেজ একটানা দেখিয়ে যাচ্ছে। লাল রঙের বোল্ড হরফে হেডলাইন ফ্ল্যাশ করছে: রেড করিডোর স্নাইপারের ষষ্ঠ শিকার। চরম আতঙ্কে দেশ।
দেখতে দেখতে অনীকের শান্ত মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
ও ঠিক এটাই চেয়েছিল।
নিজের হাত দুটোর দিকে তাকাল সে। ডেস্কের ওপর একটা মখমলের ম্যাটে তার কাস্টম .338 লাপুয়া ম্যাগনামের খোলা বোল্ট ক্যারিয়ার গ্রুপটা রাখা। স্টিলটা বরফের মতো ঠান্ডা, নিখুঁত অার ভারী। একটা মাইক্রোফাইবার ক্লথ আর হাই-গ্রেড সলভেন্টের বোতল তুলে নিল সে। খুব সন্তর্পণে পোড়া বারুদের মাইক্রোস্কোপিক অবশিষ্টাংশগুলো মুছে পরিষ্কার করতে লাগল।
বেশিরভাগ সিরিয়াল কিলার কোনো ট্রমা, রাগ বা সেক্সুয়াল ডেভিয়েন্স থেকে কাজ করে। ওদের দেখে করুণা হয় অনীকের। ওরা আসলে পশুর মতো, নোংরা বায়োলজিক্যাল তাড়নায় ছুটে বেড়ায়।
অনীক সেন খুন করে অঙ্কের হিসেবে। সে খুন করে কারণ এক হাজার মিটার দূর থেকে ট্রিগার টিপে একটা জলজ্যান্ত মানুষের সুইচ অফ হয়ে যাওয়া দেখার মধ্যেই লুকিয়ে অাছে ঈশ্বর হওয়ার সবচেয়ে কাছের অনুভূতি।
অনীক ঈশ্বর হতে চায়।
কে না হতে চায়?
কিন্তু তুমি এখনও ঈশ্বর হতে পারোনি, অনীক।
মাথার খুলির ভেতর থেকে সেই গলাটা বলে উঠল। শব্দটা কান দিয়ে ঢোকেনি, এর জন্ম তার মস্তিষ্কের একদম গভীর, অন্ধকার কেন্দ্রে। গলাটা ভয়ংকর ঠান্ডা, মেটালিক, এবং তাতে একটা অমোঘ কর্তৃত্ব অাছে।
অনীক সেন এটাকে বলে দ্য ইনস্ট্রাকশন।
এই নির্দেশ যখন তখন অাসে না। কিন্তু যখন তা অাসে, তার অমোঘ কর্তৃত্ব অস্বীকার করার কোনও উপায় থাকে না অনীকের কাছে।
রাইফেলের বোল্টের ওপর হাতটা থেমে গেল। চোখ বন্ধ করে চামড়ার চেয়ারে হেলান দিল অনীক।
ফাঁকা ঘরের মধ্যে ফিসফিস করে বলে উঠল অনীক, জার্নালিস্টের শুটটা একদম পারফেক্ট ছিল।
নিজের ভেতরের অন্ধকারটার কাছে নিজের কাজটাকে জাস্টিফাই করার একটা ব্যগ্রতা ঝরে পড়ল ওর গলায়, আটশো চল্লিশ মিটার। ফোর নটসের ক্রসউইন্ড। লোকটা স্পট ডেড। এর ফলে যে প্যানিকটা তৈরি হয়েছে… জাস্ট ম্যাগনিফিসেন্ট। কখনও এত ভাল লাগেনি অামার।
প্যানিকটা একটা বাইপ্রোডাক্ট মাত্র, ইনস্ট্রাকশন জবাব দিল।
সেই গলায় একটা বরফশীতল, ক্লিনিক্যাল হতাশা।
সেই অন্ধকার থেকে অাসা গলাটা বলে চলল, মিডিয়ার এই নয়েজটা একটা ডিস্ট্র্যাকশন। তুমি জার্নালিস্টটাকে বেছে নিয়েছিলে কারণ লোকটা সহজ টার্গেট ছিল। অন্ধ ভেড়ার মতো ট্রি-লাইনের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। তুমি বড্ড বেশি আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ছ, অনীক। তুমি লোকাল পুলিশের অজ্ঞতার ওপর রিলাই করছ। এটা কিন্তু ঠিক নয়।
অনীকের চোখদুটো খুলে গেল। শান্ত মুখোশটা খসে পড়ল।
বেরিয়ে এল বিরক্তির ঝলক।
অনীক বলল, আমি আনটাচেবল। আমি কোনো ব্রাস ফেলে অাসি না। কোনো ফুটপ্রিন্ট রাখি না। স্টেট পুলিশ টেররিস্ট ভূত খুঁজছে, কারণ ন্যারেটিভটা আমিই অর্কেস্ট্রেট করেছি।
তুমি কিচ্ছু অর্কেস্ট্রেট করোনি, মাথার ভেতরে সেই অদৃশ্য গলা মৃদু ব্যঙ্গের সুরে বলল, এটা করেছে ওই মেয়েটা। ও তোমাকে স্রেফ নিজের কাজে লাগিয়েছে। তুমি বোকার মত ওর ফাঁদে পা দিয়েছো।
অনীকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ডেস্কের নিচের ড্রয়ারটা খুলে একটা সস্তা, আনট্রেসেবল বার্নার ফোন বের করল সে। স্ক্রিনে একটা সিঙ্গেল, এনক্রিপ্টেড টেক্সট মেসেজ ওয়েট করছে, মাত্র এক ঘণ্টা অাগে ঢুকেছে।
সেখানে মল্লিকা লিখেছে, ওরা তোমাকেই খুঁজছে। ট্র্যাপ ক্লোজ হচ্ছে। স্টে কোয়ায়েট।
অনীকের মুখের হাসিটা মুছে গেল। এখন অনীককে কেউ দেখলে ভয় পাবে।
কী ভাবছে অনীক?
মল্লিকা ব্রিলিয়ান্ট, সুন্দরী, এবং চূড়ান্ত করাপ্টেড। মেয়েটা নিজেকে ওর হ্যান্ডলার মনে করে। ও ভাবে, অনীকের ভেতরের অন্ধকারটাকে খাবার জুগিয়ে আর সেন্ট্রাল মিনিস্ট্রি-তে নিজের পজিশন ইউজ করে পুলিশকে মিসডিরেক্ট করে, ও রেড করিডোর স্নাইপারকে কন্ট্রোল করছে। ও সেনকে প্রোফাইল করেছে, ক্যাটেগরাইজ করেছে, অার বিশ্বাস করে যে ওর সাইকোলজিকাল ম্যানিপুলেশনই অনীক সেনকে সেফ রেখেছে।
মেয়েটা বোঝেই না যে, সে অনীকের ইকুয়েশনে আর পাঁচটা ভ্যারিয়েবলের মতোই ও একটা ভ্যারিয়েবল মাত্র।
মল্লিকা ভাবছে লালবাজারের ডিটেকটিভরা খুব বড় থ্রেট? অার সেই ভয় ও অনীক সেনকে দেখাতে চাইছে?
ভারী স্টিলের বোল্টটা তুলে নিয়ে রাইফেলের রিসিভারে স্লাইড করতে করতে অনীক বিড়বিড় করে কিছু বলল।
একটা মেকানিক্যাল অাওয়াজ হল।
খুট।
মল্লিকা চায় তেলেঙ্গানায় বোর্ড ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত আমি একটা ভীতু পশুর মতো শহরে লুকিয়ে থাকি? ফের বিড়বিড় করে বলে উঠল অনীক।
কিন্তু তুমি কি লুকিয়ে থাকবে, অনীক? ইনস্ট্রাকশন জিজ্ঞেস করল, একটা চারকোল স্যুট পরা মেয়েকে তুমি তোমার ঈশ্বরত্বের শর্ত ঠিক করতে দেবে? ও একজন ব্যুরোক্র্যাট। ও ফাইল নিয়ে খেলে। আর তুমি খেলো জীবন আর মৃত্যু নিয়ে। ওইটুকু একটা পুঁচকে মেয়ে এখন তোমাকে নিয়ে খেলতে চায়।
কোনও প্রশ্নই নেই লুকিয়ে থাকার। আমি লুকোব না, অনীকের বিড়বিড়ানি এখন একটা কর্কশ ফিসফিসানিতে পরিণত হয়েছে।
দিনের বেলার সেই শান্তশিষ্ট, ভদ্র, সদা-হাস্যমুখ কন্ট্রাক্টর পুরোপুরি উধাও, তার জায়গায় শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকা এক হিংস্র শিকারি।
এই অনীক সেই সকালের অনীক নয়। এটা অন্য কেউ।
মাথার ভেতরের ইনস্ট্রাকশন কম্যান্ড দিল, কী ভাবছ অনীক? কাজে করে দেখাতে হবে। দলমা হিলস, সারান্ডা, ছত্তিশগড়… এগুলো সব স্ট্যাটিক এনভায়রনমেন্ট ছিল। ভিকটিমরা ছিল একা, অরক্ষিত। ওটাকে হান্ট বলে না, অনীক। ওটা টার্গেট প্র্যাকটিস। তোমাকে গেমটা এলিভেট করতে হবে। তোমাকে প্রমাণ করতে হবে যে কড়া পাহারায় থাকলেও তোমার ক্রসহেয়ার থেকে কেউ সুরক্ষিত নয়। তোমাকে প্রমাণ করতে হবে, এমন কিলার দেশ কখনও অাগে দেখেনি।
ঠিক, ঠিক, বিড়বিড় করে মাথা নাড়ল অনীক।
মিউট করা টেলিভিশনের দিকে চোখ চলে গেল।
নিউজটা এখন শিফট করে অন্ধ্রপ্রদেশের আরাকু ভ্যালির একটা সেগমেন্টে চলে গেছে। ইস্টার্ন ঘাটসের ওই অঞ্চলটা কুয়াশাচ্ছন্ন, চরম দুর্গম, ঘন কফি বাগান আর খাড়া, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তার জন্য বিখ্যাত। এটা একজন স্নাইপারের জন্য একটা লজিস্টিক্যাল নাইটমেয়ার—ভারী কুয়াশা থার্মাল অপটিক্সকে বোকা বানায়, আর প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা ব্যারোমেট্রিক প্রেসার বুলেটের ট্র্যাজেক্টরিকে চূড়ান্ত আনপ্রেডিক্টেবল করে তোলে।
তার ওপর, সম্প্রতি পরপর খুনের কারণে আরাকু ভ্যালি এখন প্যারামিলিটারি পেট্রোলে গিজগিজ করছে। জায়গাটা হাইলি গার্ডেড, আনপ্রেডিক্টেবল, আর সাংঘাতিক ডেঞ্জারাস।
আরাকু, মাথার ভেতর কেউ ফিসফিস করে উঠল।
অওারাকু – শব্দটা মনের ভেতর সাপের মতো এঁকেবেঁকে ঢুকে গেল। সেই অদৃশ্য গলা বলে চলল, ওই কুয়াশা। ওই উচ্চতা। আর্মড গার্ডস। ওখানে গিয়ে হান্ট করো, অনীক। ওরা যেখানে তোমাকে খুঁজছে, ঠিক সেখানে গিয়েই শিকার করো। ওদের বুঝিয়ে দাও যে ওদের বর্মটা আসলে কাগজের তৈরি।
অনীক সেনের শিরদাঁড়া বেয়ে খাঁটি অ্যাড্রেনালিনের একটা রোমাঞ্চকর স্রোত বয়ে গেল। বড় হয়ে গেল চোখের মণি।
ঠিক এই চ্যালেঞ্জটাই তো সে খুঁজছিল। একটা মিলিটারাইজড জোনে ইনফিলট্রেট করা, ভারী পাহাড়ি কুয়াশার মধ্যে ইম্পসিবল ব্যালিস্টিকস ক্যালকুলেট করে একটা হাই-ভ্যালু টার্গেটকে ড্রপ করা, আর ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া।
এটা যদি সে সাকসেসফুলি করতে পারে, তাহলে সে ধরাছোঁয়ার একদম বাইরে চলে যাবে।
বার্নার ফোনটা হাতে তুলে নিল সে। মল্লিকার ওয়ার্নিংয়ের কোনো রিপ্লাই দিল না। বদলে মেসেজটা ডিলিট করে দিল, ব্যাটারিটা খুলল, আর সস্তা প্লাস্টিকের সিম কার্ডটা ভেঙে দু-টুকরো করে দিল।
তার আর মল্লিকার প্রোটেকশনের দরকার নেই। তেলেঙ্গানায় ওর ওই মিসডিরেকশনেরও কোনো প্রয়োজন নেই।
অনীক সেন সমস্ত সুতো কেটে দিচ্ছে।
উঠে দাঁড়িয়ে স্টাডি রুমের কোণায় একটা লক করা বায়োমেট্রিক সেফের দিকে এগিয়ে গিয়ে স্ক্যানারের ওপর বুড়ো আঙুলটা চাপল সে।
ভারী স্টিলের দরজাটা খুলে যেতেই ভেতরে সারি সারি কাস্টম-টুলড .338 লাপুয়া ম্যাগনাম অ্যামিউনিশন, হাই-গ্রেড থার্মাল স্কোপ, আর মিলিটারি-গ্রেড ঘিলি স্যুট চোখে পড়ল।
সেফের একদম নীচে, প্রোটেক্টিভ ফোমের মধ্যে খুব সুন্দরভাবে প্যাক করা আছে চারটে ক্লেমোর মাইনস (M18A1)। ওই একই ডার্ক ওয়েব সাপ্লায়ারের কাছ থেকে জোগাড় করা, যে তাকে রাইফেলের পার্টস সাপ্লাই করেছিল। আরাকুর মতো একটা মিলিটারাইজড জোনে গেলে সে শুধু স্টিলথ বা লুকিয়ে থাকার ওপর রিলাই করবে না। সে আস্ত জঙ্গলটাকেই একটা দুর্গে পরিণত করবে।
অনীক নিজের ট্যাকটিক্যাল ব্যাগ প্যাক করতে শুরু করল। তার নড়াচড়া ভীষণ নিখুঁত এবং সেখানে ভয়ের কোনো লেশমাত্র নেই। যে সিভিল কন্ট্রাক্টর দিনের বেলায় ব্রিজ বানায়, সে এখন পৃথিবীটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সল্টলেকের ওই শান্ত অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর, অনীক এবার পুরোপুরি মল্লিকার অায়ত্তের বাইরে চলে যাওয়া একটি কিলিং মেশিনে পরিণত হয়ে গেল।
লেখাটি ভালো লাগলো?
এই থ্রিলার মাল্টিভার্সকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং লেখায় বাড়তি অক্সিজেন জোগাতে চাইলে সাপোর্ট করতে পারেন।
কীভাবে সাপোর্ট করবেন? →